গ্রামের মানুষের ঘাড়ে ঋণের কিস্তির চাপ দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এখন ৪১ শতাংশ ঋণগ্রহীতা আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি কিস্তি শোধে খরচ করছেন। আগের জরিপে এই হার ছিল ২২ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর অবস্থা আরও কঠিন। তাদের ৭৯ শতাংশের আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি চলে যাচ্ছে কিস্তিতে। গত সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস ও আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএফপিআরআইয়ের এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের ঋণের বাজার এখন মূলত এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের হাতে। গ্রামে দেওয়া প্রতি চারটি ঋণের তিনটিই আসে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। ব্যাংকের উপস্থিতি সেখানে তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে কৃষিতে যাওয়া ঋণের অংশ কমছে। গ্রামের মোট ঋণে কৃষির ভাগ ২৫ শতাংশ থেকে নেমে ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মানুষ ঋণ নিচ্ছে বেশি, কিন্তু তার বড় অংশ ফসল বা খামারে যাচ্ছে না। সংসার চালানো, চিকিৎসা বা আগের ঋণ শোধেও অনেকে নতুন ঋণ নিচ্ছেন। এনজিও ঋণে সুদ ও সেবামূল্য ব্যাংকের চেয়ে বেশি পড়ে। ফলে একই অঙ্কের ঋণে গ্রামের মানুষকে বেশি টাকা ফেরত দিতে হয়।
কৃষিযন্ত্র কেনার ক্ষেত্রেও একই ছবি। গবেষণা বলছে, ট্রাক্টর বা কম্বাইন হারভেস্টারের মতো যন্ত্র কেনার টাকার মাত্র ২ থেকে ৭ শতাংশ আসে ব্যাংক থেকে। বাকি টাকা জোগাড় হয় আত্মীয়, এনজিও, বিক্রেতার কিস্তি বা মহাজনের কাছ থেকে। অথচ এসব যন্ত্রের মালিকদের আয় আসে মূলত ধান কাটার মৌসুমে। বছরের বাকি সময় আয় কম থাকে, কিন্তু কিস্তি দিতে হয় প্রতি মাসে। এই অমিলের কারণে অনেকে নগদ টাকার সংকটে পড়েন। তখন কিস্তি শোধ করতে আবার ধার করতে হয়। মৌসুমের সঙ্গে মিলিয়ে কিস্তির ব্যবস্থা না থাকায় এমন পরিবারে ঋণের কিস্তির চাপ আরও বাড়ে।
এই চিত্র দেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা কঠিন নয়। আয়ের বড় অংশ কিস্তিতে চলে গেলে খাবার, পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচে টান পড়ে। ঋণের কিস্তির চাপ বেশি হলে পরিবার সঞ্চয় করতে পারে না। ছোটখাটো বিপদেও তখন নতুন ঋণ নিতে হয়। এভাবে অনেক পরিবার ঋণের চক্রে আটকে যায়। দেশে খাদ্যপণ্যসহ নানা জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ আরও ভারী হয়ে উঠছে। কৃষিতে অর্থায়ন কমে গেলে উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নারীপ্রধান পরিবার ও দিনমজুর পরিবারগুলো এই চাপে সবচেয়ে বেশি ভোগে। তাদের হাতে বিকল্প আয়ের পথও কম থাকে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক। কৃষিসচিব মো. সেলিম খান, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের উপস্থিত ছিলেন। ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য কম খরচের ঋণ আর ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা নিয়েই মূল আলোচনা হয়। নীতিনির্ধারকেরা এই গবেষণা কীভাবে কাজে লাগান, সেদিকে এখন নজর থাকবে। কারণ গ্রামের পরিবারগুলোর ঋণের কিস্তির চাপ কমানো না গেলে দারিদ্র্য কমানোর অর্জনও ধরে রাখা কঠিন হবে।












