আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে আকাশের নিয়ন্ত্রণকে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ধ্বংস করা, সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া, সরবরাহব্যবস্থা অচল করে দেওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের চলাচল সীমিত করার ক্ষেত্রে আকাশশক্তির কার্যকারিতা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু শত্রুর সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারা আর তাকে রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা এক বিষয় নয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান এই পার্থক্যকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
কয়েক মাস ধরে ইরানের সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রভান্ডার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হাজার হাজার হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেও নিহত হয়েছেন। তারপরও ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে আছে এবং দেশটি তার উল্লেখযোগ্য আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতার কিছু অংশ ধরে রাখতে পেরেছে। কম খরচের ড্রোন, বিকেন্দ্রীভূত সামরিক কাঠামো কিংবা নেতৃত্বের বিকল্প ব্যবস্থা দিয়ে এই স্থায়িত্বের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। কিন্তু আরও মৌলিক একটি বিষয় রয়েছে: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকাশ ও দূরপাল্লার নৌ-অস্ত্রনির্ভর অভিযান দিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছে, যা কেবল বোমাবর্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।
এই সংঘাতের শিক্ষা তাই আকাশশক্তির অকার্যকারিতা নয়। বরং কোন পরিস্থিতিতে এই শক্তি নির্ণায়ক হয়ে ওঠে, আর কোন পরিস্থিতিতে তার সীমাবদ্ধতা প্রকট হয়—সেটি বোঝার প্রয়োজনীয়তা।
বোমাবর্ষণ ও রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের ব্যবধান

বিংশ শতাব্দীর বড় যুদ্ধগুলোতে আকাশের নিয়ন্ত্রণ মিত্রশক্তির বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু ব্যাপক বোমাবর্ষণ প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে নতি স্বীকার করাতে সব সময় সফল হয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির শহর, শিল্পকারখানা, পরিবহনব্যবস্থা ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েও মিত্রশক্তি দেশটিকে শুধু বোমাবর্ষণের মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। কোরীয় যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ব্যাপক বিমান হামলার মুখে উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ভিয়েতনামেও বিপুল পরিমাণ বোমা নিক্ষেপ করেও যুক্তরাষ্ট্র তার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল অর্জন করতে পারেনি।
একই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তান ও ইরাকেও দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দ্রুত আকাশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে স্থলবাহিনীকে সহায়তা করা, প্রতিপক্ষের ঘাঁটিতে হামলা চালানো এবং বড় সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সহজ হয়েছিল। কিন্তু এসব সামরিক সাফল্য শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।
ইউক্রেনের যুদ্ধও একই প্রশ্ন সামনে এনেছে। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের শহর, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও শিল্পাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে। তারপরও দেশটিকে পরাজিত করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অস্ত্র, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ইউক্রেনকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এতে দেশটির ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগ কমেনি, কিন্তু সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের ঘাটতি পূরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও বাইরের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। চীন ইরানের জ্বালানি রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে কাজ করেছে। বেইজিংয়ের কাছ থেকে সামরিক সহায়তাও পেয়েছে তেহরান। অন্যদিকে রাশিয়া গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ এবং নতুন সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েও কোনো দেশের অর্থনীতি কিংবা সামরিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা কঠিন হয়ে উঠছে।
অর্থাৎ, আধুনিক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালালেই তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায় না। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তার টিকে থাকার পথ তৈরি করতে পারে।
যেখানে আকাশশক্তি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়
তবে বোমাবর্ষণের সীমাবদ্ধতা থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ভুল হবে যে আকাশশক্তি সামরিকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে প্রতিপক্ষ কীভাবে যুদ্ধ করছে এবং তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী ধরনের সামরিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তার ওপর।

১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কুয়েতে ইরাকি বাহিনীকে পরাজিত করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে আকাশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ইরাকের বিমান প্রতিরক্ষা, সাঁজোয়া যান, সামরিক ঘাঁটি, যোগাযোগব্যবস্থা ও সরবরাহপথে ব্যাপক হামলা চালানো হয়। এর ফলে স্থলযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ইরাকি বাহিনীর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী স্থল অভিযান একশ ঘণ্টারও কম সময়ে নির্ণায়ক সাফল্য অর্জন করে।
১৯৯৯ সালে কসোভোতে ন্যাটোর অভিযান এবং ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বাহিনীর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় নেতৃত্বাধীন বিমান হামলাও আকাশশক্তির কার্যকারিতা দেখিয়েছিল। কসোভোতে দীর্ঘ বিমান অভিযানের পর সার্বীয় বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। লিবিয়ায় বেনগাজির দিকে অগ্রসর হওয়া সরকারি বাহিনীর ট্যাংক ও কামান ধ্বংস করা হয়, যা বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রায় সহায়তা করে।
এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কুয়েত দখল করে ধরে রাখতে ইরাককে বিপুলসংখ্যক স্থলসেনা ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করতে হয়েছিল। একইভাবে লিবিয়ায় গাদ্দাফির বাহিনীকে বিদ্রোহীদের দমন করতে ট্যাংক, কামান ও অন্যান্য দৃশ্যমান সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়েছিল। আকাশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এসব লক্ষ্য শনাক্ত করে ধ্বংস করা তুলনামূলক সহজ হয়েছিল।
অন্যদিকে, গেরিলাযুদ্ধ বা বিদ্রোহ দমনের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে সব সময় প্রকাশ্যে বড় সামরিক বাহিনী মোতায়েন করতে হয় না। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা অতর্কিত হামলা, বিস্ফোরক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে যাওয়ার কৌশল ব্যবহার করেছে। তাদের পরাজিত করতে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে জয় যথেষ্ট ছিল না। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ছিল আরও কঠিন কাজ।
ইরানকে পরাজিত করার জটিলতা
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানেও এই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। দুই দেশ দ্রুত আকাশের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ইরানের সামরিক সক্ষমতার সব অংশ প্রকাশ্যে অবস্থান করে না।
দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতার অংশ ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত রয়েছে। এসব স্থাপনা প্রচলিত বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের বাইরে থাকতে পারে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে হামলার পর দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান, স্থানান্তরযোগ্য সরঞ্জাম এবং বিজ্ঞানীদের অনেকেই আরও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
ইরানের শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্যও প্রকাশ্যে বড় সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার প্রয়োজন নেই। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের মাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম। ফলে আকাশ থেকে সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা গেলেও শাসনব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা কিংবা সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা আলাদা চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকে।
হরমুজ প্রণালির আশপাশেও একই সমস্যা রয়েছে। ইরান তার দীর্ঘ ও পাথুরে উপকূলের বিভিন্ন স্থানে ছোট নৌযান, নৌবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা এবং ড্রোনের অবস্থান লুকিয়ে রাখতে পারে। এসব লক্ষ্য সব সময় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ফলে আকাশে প্রায় নিরঙ্কুশ আধিপত্য থাকলেও সমুদ্রপথে হুমকি পুরোপুরি দূর করা কঠিন।
ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযানও একই বাস্তবতা দেখিয়েছে। প্রকাশ্যে অবস্থান করা তাদের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করা সম্ভব হলেও নিয়ন্ত্রিত উপকূলীয় অঞ্চলে লুকানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণব্যবস্থা বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি

ইরানের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের আকাশশক্তির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দীর্ঘস্থায়ী অভিযান বিপুল পরিমাণ উন্নত অস্ত্রভান্ডার ব্যবহার করেছে এবং অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ব্যয় বাড়িয়েছে। এত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও যদি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন অনিশ্চিত থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে এখানেই ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইরানে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফল অর্জনে ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশশক্তির মৌলিক দুর্বলতার প্রমাণ নয়। বরং এটি দেখায়, সামরিক সক্ষমতা দিয়ে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য এবং রাজনৈতিকভাবে কাম্য লক্ষ্য এক নয়।
রাশিয়া যদি পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে আক্রমণ চালায় কিংবা চীন তাইওয়ান দখলের চেষ্টা করে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। এসব ক্ষেত্রে আক্রমণকারীকে ভূখণ্ড দখল ও ধরে রাখতে বিপুলসংখ্যক নিয়মিত স্থলসেনা মোতায়েন করতে হবে। সেই বাহিনীকে দ্রুত শনাক্ত ও দুর্বল করার ক্ষেত্রে উন্নত আকাশশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কয়েকটি জরুরি কাজ রয়েছে। আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন ও উন্নত করা, বিমানঘাঁটি এবং নৌবহর রক্ষার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার উৎপাদন বাড়ানো এবং পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান ও সহায়ক উড়োজাহাজের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।
চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে আকাশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ইরানের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হবে। তবু সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে এই সক্ষমতা অপরিহার্য। প্রতিপক্ষ যদি বিশ্বাস করে যে আক্রমণ শুরু করলেই তার স্থলবাহিনী আকাশ থেকে ধ্বংসের মুখে পড়বে, তাহলে সেই হামলা শুরু করার আগেই তাকে নিরুৎসাহিত করা সম্ভব হতে পারে।
ইরানের যুদ্ধের মূল শিক্ষা তাই আকাশশক্তি পরিত্যাগ করা নয়, বরং তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। আকাশের নিয়ন্ত্রণ কোনো যুদ্ধেই সব সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু সঠিক সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে সম্ভাব্য বৃহৎ শক্তির সংঘাত প্রতিরোধে এটি এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারগুলোর একটি।












