আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বাড়তি ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা চায় বাংলাদেশ। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় এ নিয়ে আলোচনা চলছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের বাড়তি ঋণ পেতে সরকার একটি বড় অঙ্গীকারও করেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থে চলা প্রকল্প এখন থেকে আরও দ্রুত শেষ করা হবে। আলোচনা এখনো চলছে, চূড়ান্ত হতে কয়েক মাস লাগতে পারে।
সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সাত বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছরে আনা হবে। প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়াও ছোট হবে। এখন এতে লাগে প্রায় ১৮ মাস, সেটি নামিয়ে আনা হবে আট মাসে। এর মানে, টাকা ছাড়ের আগেই কাগজপত্রে যে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়, তা কমাতে চায় সরকার। বাংলাদেশে বিদেশি সহায়তার প্রকল্প দেরিতে শেষ হওয়া পুরোনো সমস্যা। মেয়াদ বাড়লে খরচ বাড়ে, আর সুফল পেতেও দেরি হয়। দাতারাও অনেক সময় এই ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নতুন সময়সীমা মানা গেলে একই টাকায় দ্রুত বেশি কাজ দেখানো সম্ভব হবে।
এই আলোচনা এমন সময়ে হচ্ছে, যখন অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে। আইএমএফ সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে বলেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.২ শতাংশে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। জ্বালানি সংকট, দুর্বল ব্যাংক খাত আর কম বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে টেনে ধরছে। এ অবস্থায় কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সরকারের জন্য বড় স্বস্তি হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের বাড়তি ঋণ বাজেট সহায়তা ও জরুরি সংস্কারে কাজে লাগতে পারে। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটেও ধীর প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ আর গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি বাড়ছে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষার টাকা যেন সত্যিকারের দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে পরামর্শও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
তবে এই অর্থ শর্ত ছাড়া আসে না। ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বাড়ানো আর সুশাসনের মতো বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীরা আগে থেকেই চাপ দিয়ে আসছে। প্রকল্পের মেয়াদ কমানোর অঙ্গীকার রক্ষা করাও সহজ হবে না। জমি অধিগ্রহণ, দরপত্রে দেরি আর দক্ষ জনবলের অভাবে অনেক প্রকল্প বছরের পর বছর আটকে থাকে। অঙ্গীকার কাগজে থেকে গেলে সামনের আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হবে। আবার সময়মতো কাজ শেষ হলে আরও অর্থ পাওয়ার পথ খুলতে পারে। তাই অঙ্গীকারের সঙ্গে বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
সাধারণ মানুষের জন্য প্রশ্নটা সরাসরি জীবনের সঙ্গে যুক্ত। এই অর্থ যদি বিদ্যুৎ, সড়ক, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষায় সময়মতো খরচ হয়, তবেই এর সুফল মিলবে। আর প্রকল্প ঝুলে থাকলে ঋণের বোঝা বাড়বে, কাজ বাড়বে না। বিশ্বব্যাংকের বাড়তি ঋণ নিয়ে আলোচনা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা বোঝা যাবে সামনের মাসগুলোতে। সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী পরীক্ষা: অর্থ জোগাড় করা এবং সেই অর্থে দ্রুত কাজ করে দেখানো। দুই কাজেই সাফল্য এলে লাভবান হবে সাধারণ মানুষ।












