রাশিয়ায় কাজের কথা বলে নিয়ে যাওয়া ৩০ জন বাংলাদেশি তরুণকে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২০ জন ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। এসআরবির তদন্তে এ তথ্য উঠে এসেছে। ১৪ অক্টোবর এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তদন্তের ফল জানানো হয়। তদন্ত বলছে, শত্রুপক্ষের অবস্থান চিহ্নিত করতে এই তরুণদের প্রায় টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাচার নিয়ে এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সরকারি স্বীকৃতি।
তদন্তে দেখা গেছে, মাত্র তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁরা টানা ড্রোন হামলার মুখে পড়েন। অনেক পরিবার প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিল। তারা ভেবেছিল, এটাই সংসার ঘোরানোর সুযোগ। জুলাইয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, এই ৩০ জন ২৪ এপ্রিল বৈধ ছাড়পত্র নিয়েই রাশিয়ায় যান। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে। নিহতদের মরদেহ দেশে আনা যাবে কি না, সেটিও এখনো অনিশ্চিত। যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতদের শনাক্ত করা আর মরদেহ উদ্ধার করা কঠিন। পরিবারগুলো চায় অন্তত শেষবারের মতো স্বজনের মুখ দেখতে আর ধর্মীয় রীতিতে দাফন করতে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে যাওয়া কর্মীরা কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছালেন? চাকরির চুক্তিতে কী লেখা ছিল, নিয়োগকর্তা কারা, আর এজেন্সিগুলো কতটা জানত, তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। দক্ষিণ এশিয়া আর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে লোক নেওয়ার অভিযোগ গত দুই বছর ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আছে। নেপাল আর ভারতও তাদের নাগরিকদের ফেরাতে কূটনৈতিক চাপ দিয়েছে। বাংলাদেশ সে তুলনায় দেরিতে সক্রিয় হয়েছে বলে সমালোচনা আছে।
রাশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাচার এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও অনিশ্চয়তা। ফলে বিদেশে কাজের যেকোনো সুযোগ আঁকড়ে ধরতে চান তরুণেরা। দালাল চক্র সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাচ্ছে। নিহতদের মরদেহ ফেরত আনা, পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া আর বেঁচে থাকা ১০ জনকে নিরাপদে দেশে ফেরানো এখন সরকারের প্রথম কাজ। নিহতদের পরিবারগুলোর বেশির ভাগই গ্রামের নিম্নবিত্ত। অনেকে জমি বন্ধক রেখে বা সুদে টাকা নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এখন তাঁদের হাতে ছেলেও নেই, টাকাও নেই, ঋণের বোঝা আছে। রাশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাচার ঠেকাতে অন্তত তিনটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, রাশিয়াসহ যুদ্ধরত দেশে কর্মী পাঠানোর আগে নিয়োগকর্তার পরিচয় দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই। দ্বিতীয়ত, চুক্তিপত্র বাংলায় অনুবাদ করে কর্মীকে বুঝিয়ে দেওয়া। তৃতীয়ত, দায়ী এজেন্সির বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা। ২০১২ সালের মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে এমন অপরাধের কঠোর শাস্তির বিধান আছে।
এর পাশাপাশি জড়িত তিন এজেন্সির লাইসেন্স আর ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধরত দেশে কর্মী পাঠানোর আগে আলাদা যাচাই ব্যবস্থা থাকা উচিত। বিদেশে যাওয়ার আগে চুক্তিপত্র নিজে পড়া আর সরকারি তথ্যকেন্দ্রে যাচাই করার পরামর্শও দিচ্ছেন তাঁরা। ২০টি পরিবার যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, তা কোনো অর্থে পূরণ হবে না। কিন্তু দায় নির্ধারণ না হলে পরের দলটিও একই ফাঁদে পা দেবে।












