সৌদি আরবে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যাঁদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে উল্লেখ করেছে দেশটি। কিন্তু তিন দিন পেরিয়ে গেলেও তাঁদের পরিচয় আর জাতীয়তা নিশ্চিত করতে পারেনি জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট। কনস্যুলেট জেনারেলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কূটনৈতিক পত্র বা নোট ভারবাল পাঠানো হয়েছে। এখনো আনুষ্ঠানিক উত্তর আসেনি। সৌদিতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে এই অস্পষ্টতা প্রবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুজনের নাম জানিয়েছে নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত শেষে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত পায়। ইসলামি আইনের বিচারকের বিবেচনামূলক শাস্তি তাজির অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে রাজকীয় আদেশে তা কার্যকর হয়। তবে কবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বা কত দিন তাঁরা হেফাজতে ছিলেন, বিবৃতিতে তা বলা হয়নি। বাংলাদেশ সরকার মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সৌদি আরবের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাইবে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। পরিচয় নিশ্চিত হলে পরিবারকে খবর দেওয়া আর মরদেহ হস্তান্তরের প্রশ্নও সামনে আসবে।
বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তাদের আগে কিছুই জানানো হয়নি। এতে কনস্যুলার সম্পর্ক বিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন মানা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। দুই দেশই এই কনভেনশনের পক্ষ। কনভেনশনের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, বিদেশি নাগরিক আটক হলে তাঁকে দ্রুত কনস্যুলার সহায়তার অধিকারের কথা জানাতে হবে। আটক ব্যক্তি চাইলে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে খবর দিতে হবে। কনস্যুলেট আটক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করা আর আইনজীবী ঠিক করায় সহায়তা দিতে পারে। ৩৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুর খবর দ্রুত কনস্যুলেটকে জানানোর কথা আছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের আগাম খবর দেওয়ার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই।
সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। সেখানে লাখো বাংলাদেশি কাজ করেন। অনেকেই আরবি জানেন না, আইনি সহায়তা পাওয়ার পথও চেনেন না। আটক হলে দূতাবাস বা কনস্যুলেট খবরই পায় না, এমন অভিযোগ বহু পুরোনো। ফলে বিচার চলাকালে কোনো সহায়তা ছাড়াই অনেকে শাস্তির মুখে পড়েন। সৌদিতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড এর আগেও কার্যকর হয়েছে। প্রতিবারই পরিবার জানতে পেরেছে অনেক পরে। অনেক সময় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া প্রবাসীর পরিবার জানতেই পারে না তাদের স্বজন কোথায় আটক। বিচার কোন ভাষায় হয়েছে, আসামি অভিযোগ বুঝেছেন কি না, আইনজীবী ছিলেন কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। সৌদিতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আগেও একই প্রশ্ন উঠেছে। ইন্দোনেশিয়া আর ফিলিপাইনের মতো শ্রমিক পাঠানো দেশগুলো সৌদি আরবে নাগরিকদের আইনি সহায়তায় আলাদা তহবিল রাখে। প্রয়োজনে তারা রক্তপণ দিয়েও নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ সেই পর্যায়ের প্রস্তুতি এখনো নিতে পারেনি।
এখন দুটি কাজ জরুরি। প্রথমত, নিহত দুজনের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করে পরিবারকে জানানো। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশিদের তালিকা আর তাঁদের মামলার অবস্থা জানতে নিয়মিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ আইনি সহায়তা সেল থাকলে এমন পরিস্থিতি অনেকটা এড়ানো যেত। শ্রম কূটনীতির আলোচনায় কনস্যুলার নোটিশের বিষয়টি তোলার দাবিও উঠছে।












