যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে ইউএস স্টিলের মন ভ্যালি কারখানা আধুনিকায়নে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে জাপানের ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিপ্পন স্টিল। প্রায় ৯০ বছর ধরে ব্যবহৃত গরম ইস্পাত পাতলা করার যন্ত্রপাতি বদলে উন্নত প্রযুক্তির সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের যে পরিকল্পনা কোম্পানিটি নিয়েছে, তার অন্যতম বড় অংশ হবে এই প্রকল্প।
নিপ্পন স্টিলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউএস স্টিলের পরিচালনাধীন মন ভ্যালি কারখানায় নতুন সরঞ্জাম স্থাপনের মাধ্যমে উন্নতমানের ইস্পাত উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গাড়ি শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহারের উপযোগী উচ্চমানের ইস্পাত উৎপাদনে এই আধুনিকায়ন ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের আওতায় কারখানাটির হট-রোলিং বিভাগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্লাস্ট ফার্নেসে উৎপাদিত ইস্পাতের স্ল্যাব উত্তপ্ত করে রোলারের সাহায্যে পাতলা ইস্পাতে রূপান্তর করা হয় এই প্রক্রিয়ায়। মন ভ্যালির বর্তমান হট-রোলিং যন্ত্রপাতি প্রায় ৯০ বছর ধরে চালু রয়েছে। দীর্ঘ ব্যবহারে সেগুলোর কার্যক্ষমতা কমেছে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াও তুলনামূলক কম দক্ষ হয়ে পড়েছে।

নতুন সরঞ্জাম স্থাপনের পর ২০২৯ সালের দ্বিতীয়ার্ধে সেগুলো চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জাপানের প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কারখানায়
মন ভ্যালিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার পেছনে নিপ্পন স্টিলের নিজস্ব কারখানায় সাম্প্রতিক বিনিয়োগের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। চলতি বছরের আগস্টে জাপানের নাগোয়া কারখানায় নতুন প্রজন্মের হট-রোলিং স্থাপনা চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ইয়েন বা ১.৯১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে।
নাগোয়া কারখানায় ব্যবহৃত উন্নত প্রযুক্তি মন ভ্যালিতেও প্রয়োগ করতে চায় কোম্পানিটি। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কারখানায় উৎপাদিত ইস্পাতের গুণমান বাড়ানোর পাশাপাশি পুরোনো যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।
এর আগে জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইউএস স্টিল মন ভ্যালি কারখানায় সর্বোচ্চ ২.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। তবে শ্রমিকের মজুরি ও নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় এখন প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১১ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি

২০২৫ সালে ইউএস স্টিল অধিগ্রহণের সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে ২০২৮ সালের মধ্যে কোম্পানিটিতে ১১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নিপ্পন স্টিল। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ অনুমোদন করেছে। মন ভ্যালিতে পরিকল্পিত ৩ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হলে প্রতিশ্রুত মোট অর্থের অর্ধেকেরও বেশি বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ হয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাতবাজারে চাহিদা বাড়ার পরিস্থিতিও এই বিনিয়োগের পক্ষে কাজ করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আরোপ করা শুল্কের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ইস্পাতের চাহিদা বেড়েছে।
স্টিলবেঞ্চমার্কারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে হট-রোল্ড কয়েলের দাম অক্টোবরের মাঝামাঝি প্রতি মেট্রিক টন ১ হাজার ৩০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২২ সালের জুনের পর এই প্রথম দাম ওই পর্যায়ে পৌঁছায়। মহামারির পর চাহিদা বৃদ্ধির সময় সর্বশেষ এমন দাম দেখা গিয়েছিল।
বাজারের অনুকূল পরিস্থিতিতে ক্লিভল্যান্ড-ক্লিফসের মতো বড় মার্কিন ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফাও উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
মুনাফার পূর্বাভাস বাড়লেও অনিশ্চয়তা রয়েছে

নিপ্পন স্টিল ২০২৭ সালের মার্চে শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরে সমন্বিত নিট মুনাফা ২৯ হাজার কোটি ইয়েন হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই মুনাফা ১৭ গুণ বেশি। এর মধ্যে ইউএস স্টিলের অবদান ১৮ হাজার কোটি ইয়েন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ইস্পাতবাজারের বর্তমান ইতিবাচক পরিস্থিতি মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। নিপ্পন স্টিলের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা তাকাহিকো ইওয়াই বলেছেন, শুধু বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর না করে প্রতিষ্ঠানটিকে সমন্বিত কার্যক্রমের সুফল বাড়ানো এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনার মধ্যে মন ভ্যালি প্রকল্প তাই নিপ্পন স্টিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগের সাফল্য নির্ভর করবে আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং বাজারের অনুকূল পরিস্থিতিকে স্থায়ী ব্যবসায়িক ফলাফলে রূপান্তর করার ওপর।












