ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ শহর লক্ষ্য করে একের পর এক হামলার ঘটনায় উপসাগরীয় অঞ্চলে বৃহত্তর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। গত রোববার দক্ষিণ সৌদি আরবজুড়ে হুতিদের ব্যাপক হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে। এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
খামিস মুশাইতে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আবহা, তায়েফ, নামাস ও জাজান শহরেও সতর্কতা জারি করা হয়। খামিস মুশাইতকে লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
রাজধানী রিয়াদেও একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। প্রাণঘাতী হামলার পর দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকা কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিত পরিসরে চালুর প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যেই নতুন করে হুমকি দিয়েছে হুতিরা। গোষ্ঠীটি বিমানবন্দরটিকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে। এর আগে চলতি মাসের ১০ তারিখের একটি হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই সংঘাত কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমানবন্দর ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, সৌদি নিরাপত্তা এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ।

কেন নতুন করে হামলা বাড়াচ্ছে হুতিরা
২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ফলে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের বড় ধরনের আন্তসীমান্ত হামলা অনেকটাই বন্ধ ছিল। কিন্তু ইয়েমেনের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধের কারণে সেই সমঝোতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
গত সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগর উপকূলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে কৌশলগত অবস্থান দখল করে হুতিরা। এরপর সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করে।
হুতিদের দাবি, সৌদি সামরিক অভিযান এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিধিনিষেধ আরোপের জবাবেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে আরও বড় কৌশল রয়েছে। সৌদি আরবের ইয়েমেন নীতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে রিয়াদকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করতে চায় গোষ্ঠীটি।
হুতিদের মূল লক্ষ্য কী
ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও উত্তরাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ সরকারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা হুতিদের প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর খুলে দেওয়া, বাইরের সামরিক চাপ কমানো এবং সৌদি আরবের কাছ থেকে রাজনৈতিক ছাড় আদায় করতে চায় তারা।
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থান হুতিদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি তাদের উপস্থিতি সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে চাপ সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়।
সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে সামরিকভাবে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা প্রদর্শনও তাদের কৌশলের অংশ। এ ক্ষেত্রে ইরানের সমর্থন তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ালেও ইয়েমেনে নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই গোষ্ঠীটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
ইরানের ভূমিকা কতটা

হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্রপ্রযুক্তি, সামরিক দক্ষতা ও অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে ইরান গোষ্ঠীটিকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ইয়েমেনের বিষয়ে ছাড় আদায় এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ওয়াশিংটনকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যও হামলাগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
তবে হুতিদের পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন গোষ্ঠী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নব্বইয়ের দশকে উত্তর ইয়েমেনে আন্দোলন হিসেবে তাদের উত্থান ঘটে। ২০১৪ সালে সানা দখলের পর তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি গড়ে তোলে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে দুর্বল করা এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বীকৃতি আদায় করাও তাদের লক্ষ্য।
বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার কৌশল
সৌদি আরবের প্রচলিত সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া কঠিন হওয়ায় হুতিরা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, পাইপলাইন ও জ্বালানি রপ্তানি টার্মিনাল দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এসব স্থাপনায় হামলা হলে বিমান চলাচল ব্যাহত হতে পারে, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জ্বালানি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
শনিবার হুতিরা ইয়ানবু ও রাবিগের আশপাশের স্থাপনাসহ বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন লক্ষ্য করে হামলার দাবি করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানালেও দাবিকৃত হামলাগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ নিশ্চিত হয়নি।
বাব আল-মান্দেব কেন গুরুত্বপূর্ণ
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে বাব আল-মান্দেব প্রণালি। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সুয়েজ খাল হয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় টার্মিনাল থেকে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের নিরাপত্তা তাৎপর্যপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব পশ্চিমাঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ও লোহিত সাগরের রপ্তানি পথের ওপর বেশি নির্ভর করছে। ফলে বাব আল-মান্দেবের কাছে হুতিদের সামরিক তৎপরতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুই প্রণালিতেই বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিকল্প জ্বালানি পরিবহনপথ সংকুচিত হতে পারে। এতে জাহাজের বিমা ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংঘাত থামানোর পথ কোথায়
সৌদি আরবের আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিমানবন্দর, শহর ও জ্বালানি স্থাপনা রক্ষা করা কঠিন। সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত হলেও ধ্বংসাবশেষের কারণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং বেসামরিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
সংঘাত কমাতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন। হুতিরা স্বীকৃতি, বন্দর ও বিমানবন্দরের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি করছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতে আন্তসীমান্ত হামলা ঠেকানোর নিশ্চয়তা চায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৃহত্তর সংঘাত আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। নতুন কোনো বড় হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি বা জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুতর ক্ষতি হলে সৌদি আরব আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ছড়িয়ে পড়লে অন্য দেশও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
হুতিদের কৌশল সামরিক চাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক ছাড় আদায় করা। কিন্তু এই কৌশল তাদের দাবি পূরণে সহায়তা করবে, নাকি পুরো অঞ্চলকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে—সেটিই এখন প্রধান প্রশ্ন।












