দেশের প্রথম পারমাণবিক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায়। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের এই ইউনিটের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে ‘বি-২’ ধাপের ফিজিক্স পরীক্ষাও। পরীক্ষার প্রতিবেদন গত বুধবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন সংস্থাটির চূড়ান্ত ছাড়পত্র পেলেই শুরু হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপ, যার নাম ‘সি-স্টেজ’ বা পাওয়ার স্টার্ট-আপ।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাসান শনিবার জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে পাওয়ার স্টার্ট-আপ শুরু করতে তাঁরা প্রস্তুত। তবে এটি পুরোপুরি বিএইআরএর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে সীমিত পরিসরে। পরীক্ষা সফল হলে ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়ানো হবে। প্রকল্পের প্রকৌশলীরা আশা করছেন, ইউনিটটি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় পৌঁছালে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া যাবে। তাঁদের হিসাবে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ গ্রিডে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট যুক্ত হতে পারে।
এর আগে ২১ অক্টোবর রাশিয়া থেকে আসা পারমাণবিক জ্বালানির নতুন চালান কড়া নিরাপত্তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছায়। প্রকল্প এলাকার দায়িত্বে থাকা রুহুল কুদ্দুস জানান, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং আগেই শেষ হয়েছে। একটি ত্রুটিপূর্ণ নিরাপত্তা ভালভের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন পিছিয়েছিল। ভালভটি ৩০ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, আর ১১ অক্টোবর শুরু হয় রিঅ্যাক্টর চালুর প্রাথমিক কাজ। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে রাশিয়া থেকে আরও আটটি ফ্লাইটে জ্বালানি আসার কথা রয়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটম ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ শেষ করতে চায়। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট সাতটি চালানে ১৬৩টি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি আসার কথা। প্রথম ইউনিটে নতুন করে জ্বালানি ভরার জন্য আরও ৪৮টি অ্যাসেম্বলি দুটি চালানে আসছে। রুহুল কুদ্দুস বলেছেন, বাকি পরীক্ষা ও প্রস্তুতি শেষ হলে নভেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যেতে পারে।
প্রকল্পের সময় ও ব্যয়ের হিসাব অবশ্য স্বস্তির নয়। মূল সময়সীমা ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর। সেটি দুই দফা বাড়িয়ে এখন করা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন। রাশিয়ার সঙ্গে মূল চুক্তিতে ইউরো বা ডলারে ব্যয় বাড়েনি। কিন্তু দেশের বাজারে ডলারের দাম বাড়ায় টাকার হিসাবে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বর্তমান আনুমানিক ব্যয় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট মিলিয়ে সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ পরিষ্কার। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিডে সংযোগ ঠিকমতো হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে নতুন একটি উৎস যুক্ত হবে। তবে সেই দিনটি কবে আসবে, তা এখন নির্ভর করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত আর বাকি পরীক্ষার সাফল্যের ওপর। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট নিয়ে তাই আগামী কয়েক সপ্তাহের খবর গুরুত্বপূর্ণ।
রূপপুর প্রকল্প পাবনার ঈশ্বরদীতে। দেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই পারমাণবিক বিদ্যুৎ এ ক্ষেত্রে নতুন বিকল্প হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের দেরি ও ব্যয়বৃদ্ধির প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।












