ভারত-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় স্কচ হুইস্কি আমদানিতে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ বাল্ক স্কচ হুইস্কির ক্ষেত্রে শুল্কছাড় কার্যকর না করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়েছে ভারতের বড় দেশি-বিদেশি মদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। পরিস্থিতি নিয়ে আগামী সোমবার কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে বড় কয়েকটি কোম্পানিকে জানিয়েছেন, বাল্ক আকারে আমদানি করা স্কচ হুইস্কি চুক্তির আওতায় শুল্ক কমানোর সুবিধা পাবে না। অথচ চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু স্কচ আমদানিতে শুল্ক ১৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭৫ শতাংশ করার কথা রয়েছে।
গত জুলাইয়ে কার্যকর হওয়া ঐতিহাসিক ভারত-যুক্তরাজ্য বাণিজ্য চুক্তিকে ঘিরে এটিই প্রথম বড় ধরনের বিরোধ।
বাল্ক স্কচ আমদানিই বিরোধের কেন্দ্রে
ভারতে যুক্তরাজ্য থেকে আমদানি করা স্কচ হুইস্কির প্রায় ৮০ শতাংশই আসে বাল্ক আকারে। দেশটিতে এসব হুইস্কি ব্যবহার করে বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পানীয় তৈরি করা হয়। ফলে আমদানির ওপর শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তকে ভারতের প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের মদশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
কিন্তু বাল্ক স্কচকে শুল্কছাড়ের বাইরে রাখার সরকারি অবস্থান দেশি-বিদেশি উৎপাদকদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এর আগে পেরনো রিকার্ড ও ডিয়াজিওর প্রতিনিধিত্বকারী ইন্টারন্যাশনাল স্পিরিটস অ্যান্ড ওয়াইনস অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (আইএসডব্লিউএআই) বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা, বাল্ক স্কচ আমদানিতে শুল্কছাড় না দিলে ভারত-যুক্তরাজ্য চুক্তির উদ্দেশ্যই বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দেশীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
এবার প্রতিবাদে যুক্ত হয়েছে ভারতের স্থানীয় মদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান অ্যালকোহলিক বেভারেজ কোম্পানিজ (সিআইএবিসি)।
গত ২৭ অক্টোবর ভারত সরকারকে পাঠানো এক গোপন চিঠিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, ভারতে উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের জন্য আমদানি করা বাল্ক স্কচ যদি কম শুল্কের সুবিধা না পায়, তাহলে বিদেশ থেকে তৈরি পানীয় আমদানিতে বাড়তি উৎসাহ তৈরি হতে পারে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতি ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের অধীনে স্থানীয় উৎপাদন শক্তিশালী করার লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। এ কারণে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক বিঘ্ন এড়াতে সরকারকে জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সিআইএবিসির সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ভারতের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত দুটি বড় প্রতিষ্ঠান রেডিকো খাইতান এবং অ্যালাইড ব্লেন্ডার্স অ্যান্ড ডিস্টিলারস। রেডিকো খাইতান ৮পিএম ব্র্যান্ডের এবং অ্যালাইড ব্লেন্ডার্স অফিসার্স চয়েস ব্র্যান্ডের উৎপাদক।
অ্যালাইড ব্লেন্ডার্স চলতি সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকাশিত এক উপস্থাপনায় নিজেদের অন্যতম বৃহৎ বাল্ক স্কচ আমদানিকারক হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি তাদের বিলাসবহুল পানীয়ের পণ্যের সম্ভার আরও সহজলভ্য করার সুযোগ তৈরি করবে।
সোমবার আলোচনায় বসছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা
চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দেশি-বিদেশি মদ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করবেন। বাল্ক স্কচ আমদানিতে শুল্কছাড়ের বিষয়টিই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে।
যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, তারা বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে কাজ করছে। স্কটিশ সরকারও বাল্ক স্কচের শুল্ক নির্ধারণ নিয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনা করেছে। তবে এ বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভারত-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সময় হুইস্কির আমদানি শুল্ক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের বিষয় ছিল। শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু স্কচ আমদানিতে শুল্ক অর্ধেক করার বিষয়ে সম্মত হয় ভারত।
তবে শুল্কছাড়ের আওতা নিয়ে নতুন বিরোধ দেশটির বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুরোনো উদ্বেগকেও সামনে এনেছে। ভারতে বিভিন্ন সময়ে আমদানি শুল্ক ও অতিরিক্ত কর দাবি নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের অবস্থান হলো, তাঁরা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
ভারত-যুক্তরাজ্য বাণিজ্য চুক্তির আওতায় স্কচ হুইস্কির শুল্ক কমানো নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছে দেশি-বিদেশি মদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। সোমবার বৈঠকে বসছে ভারত সরকার।












