ছোট একটি দেশের ছোট রাজনৈতিক দল। কিন্তু তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় আলোচনা। নিউজিল্যান্ডের আসন্ন ৭ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে অপরচুনিটি পার্টি। দলটির ৩৮ বছর বয়সী নেত্রী কিউলে ওং এমন কিছু প্রস্তাব সামনে এনেছেন, যা শুধু নিউজিল্যান্ড নয়, উন্নত বিশ্বের অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করছে।
নির্বাচনে দলটি সংসদে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ৫ শতাংশ ভোটের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এই সীমা অতিক্রম করতে পারলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন ওং। বিশ্লেষকদের ধারণা, দুই প্রধান দল ন্যাশনাল ও লেবার—কোনোটিই এককভাবে সরকার গঠনের মতো অবস্থানে না থাকলে ছোট দলগুলোর সমর্থনই হয়ে উঠবে নির্ধারক। সে ক্ষেত্রে ওংয়ের দল সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পেতে পারে।
সবার জন্য সপ্তাহে ৩৭০ ডলারের আয়
ওংয়ের নির্বাচনী প্রচারের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতি হলো সর্বজনীন মৌলিক আয় চালু করা। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ডের প্রত্যেক নাগরিককে সপ্তাহে ৩৭০ নিউজিল্যান্ড ডলার করে দেওয়া হবে। বর্তমান বিনিময়মূল্য অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় ২১০ মার্কিন ডলার।
এই অর্থের মাধ্যমে প্রচলিত অধিকাংশ সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানো মধ্যবিত্ত কর্মীদের জন্যও এটি আর্থিক সুরক্ষা দেবে বলে মনে করেন ওং।
তবে এত বড় কর্মসূচির অর্থ আসবে কোথা থেকে? এ জন্য শহরাঞ্চলের জমির ওপর বার্ষিক ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। জমির বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে এই কর নির্ধারণ করা হবে।

ওংয়ের যুক্তি, জমির ওপর কর বসালে শুধু দাম বাড়বে—এই আশায় জমি কিনে রেখে দেওয়ার প্রবণতা কমবে। এতে আবাসন ব্যয়ের ওপর চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে জমিতে আটকে থাকা অর্থ অন্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
অকল্যান্ড শহরের কেন্দ্র থেকে ফেরিতে প্রায় ৪০ মিনিট দূরের একটি এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে তিনি এই প্রস্তাব তুলে ধরেন। সেখানে উপস্থিত অনেকেই ছিলেন সম্পদশালী বাড়ি ও জমির মালিক। তাঁদের সামনে এমন করের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা সহজ ছিল না। প্রশ্নের মুখে ওং স্বীকার করেন, নতুন করব্যবস্থা একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে চালু করার প্রয়োজন হতে পারে।
দুই প্রধান দলের বাইরে নতুন সমীকরণ
নিউজিল্যান্ডের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল পার্টি ও লেবার পার্টির মধ্যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে দুই দলের অবস্থানই চাপে পড়েছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও ন্যাশনাল পার্টির নেতা ক্রিস্টোফার লাকসনের সরকারের সময়ে অর্থনীতি কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অন্যদিকে ২০২৩ সালে জেসিন্ডা আরডার্নের কাছ থেকে লেবার পার্টির নেতৃত্ব নেওয়া ক্রিস হিপকিন্স এখনো তাঁর পূর্বসূরির মতো জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক আকর্ষণ তৈরি করতে পারেননি।
এ কারণে এবারের নির্বাচনে শুধু কোন দল বেশি ভোট পাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন নয়। বরং কোন ছোট দল কার সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠনে সহায়তা করবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
লেবার পার্টির সম্ভাব্য সহযোগী হিসেবে রয়েছে গ্রিন পার্টি ও মাওরি পার্টি। তবে তাদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অবস্থান মধ্যপন্থী ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে ন্যাশনাল পার্টির বর্তমান জোটসঙ্গীদের নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। একসময় উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতির পক্ষে থাকা অ্যাক্ট পার্টি এখন অনেক বেশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিতর্ককেন্দ্রিক রাজনীতিতে যুক্ত। আর নিউ জিল্যান্ড ফার্স্ট পার্টির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিভাজনমূলক জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির অভিযোগ রয়েছে।
দুই পক্ষের সঙ্গেই কাজ করতে চান ওং
এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ওং নিজেকে মধ্যপন্থী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে বাম বা ডান—দুই রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত তাঁর দল।

এ অবস্থানের কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারছে অপরচুনিটি পার্টি। গ্রিন পার্টির কিছু সম্পদশালী ভোটার ওংয়ের মধ্যে পরিবেশগত লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবসাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি দেখছেন। অন্যদিকে উদারনৈতিক অর্থনীতিতে বিশ্বাসীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে তাঁর রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও আমলাতন্ত্র কমানোর পরিকল্পনা।
বিশেষ করে আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে যাচাই করে যেসব সামাজিক ভাতা দেওয়া হয়, সেগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার ধারণা কিছু ভোটারের সমর্থন পাচ্ছে। সর্বজনীন মৌলিক আয়ের মাধ্যমে এই জটিলতা কমানো সম্ভব বলে মনে করেন ওং।
তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থাকা সাবেক লেবার নেত্রী হেলেন ক্লার্ক অপরচুনিটি পার্টিকে ব্যঙ্গ করে ‘সুযোগসন্ধানী দল’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দলটি নিজেদের মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচয় দিলেও এর রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতির স্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দুই প্রধান দলের রাজনীতিকদের কেউ কেউ আবার অভিযোগ করেছেন, অপরচুনিটি পার্টি আসলে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করছে। অর্থাৎ দলটি প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির সুবিধা করে দিতে পারে।
উইনস্টন পিটার্সের জন্য নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ওংয়ের সবচেয়ে কঠোর সমালোচকদের একজন হলেন নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নিউ জিল্যান্ড ফার্স্ট পার্টির নেতা উইনস্টন পিটার্স।

নিউজিল্যান্ডের রাজনীতিতে পিটার্স দীর্ঘদিন ধরে জোট সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তিনি অতীতে দুইবার লেবার নেতৃত্বাধীন এবং দুইবার ন্যাশনাল নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন দিয়েছেন। ফলে দুই রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গেই দর-কষাকষির অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
কিন্তু এবার সেই অবস্থানে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ওং।
চলতি মাসের শুরুতে একটি নির্বাচনী বিতর্কে দুজনকে একই মঞ্চে দেখা যায়। সেখানে ওংয়ের সঙ্গে পিটার্সের অস্বস্তিকর অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়। ফিজি থেকে শৈশবে নিউজিল্যান্ডে আসা ওংয়ের বাবা চীনা বংশোদ্ভূত। পিটার্সের বিরুদ্ধে অতীতে এশীয় বংশোদ্ভূত নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের নিয়ে বর্ণবাদী মন্তব্য করার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নিজেরও মাওরি বংশপরিচয় রয়েছে।
তবে ওংয়ের সঙ্গে পিটার্সের রাজনৈতিক বিরোধের পেছনে তাঁর জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে ক্ষমতার সমীকরণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এত দিন ছোট দলগুলোর মধ্যে সরকার গঠনের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানটি ছিল পিটার্সের। এবার সেই জায়গায় ভাগ বসাতে পারে অপরচুনিটি পার্টি।
নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনের ফল শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে ৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারলে ওংয়ের দল শুধু সংসদে প্রবেশই করবে না, সরকার গঠনের আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত জোট-সমীকরণে নতুন একটি শক্তির আবির্ভাব ঘটবে।












