যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক লড়াই শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকার কারা পরিচালনা করবে, আইনসভায় কোন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে এবং গভর্নরের পদ কার হাতে যাবে—এসব প্রশ্নও এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ছয়টি অঙ্গরাজ্যে ক্ষমতার সমীকরণ বদলানোর সুযোগ দেখছে ডেমোক্র্যাটরা। দলটি এসব রাজ্যে সরকার ও আইনসভার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্য সরকারের হাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা রয়েছে। গর্ভপাতের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, করব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের অধিকারসংক্রান্ত আইন প্রণয়নে তাদের ভূমিকা সরাসরি। পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ এবং নির্বাচনের নিয়মকানুন তৈরির ক্ষেত্রেও অঙ্গরাজ্য সরকার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। ফলে শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নয়, অঙ্গরাজ্যগুলোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
অঙ্গরাজ্যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের লড়াই
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি দল যখন গভর্নরের পদ এবং অঙ্গরাজ্য আইনসভার উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন সেই অবস্থাকে বলা হয় ‘ট্রাইফেক্টা’। এই ব্যবস্থা থাকলে দলটি তুলনামূলক সহজে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারে।
বর্তমানে ২৩টি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের এমন নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের হাতে রয়েছে ১৬টি অঙ্গরাজ্য। এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক সমর্থনের বড় ঢেউ তৈরি হলে ডেমোক্র্যাটরা ছয়টি নতুন অঙ্গরাজ্যে ট্রাইফেক্টা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। একই সঙ্গে রিপাবলিকানদের কয়েকটি বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণও ভেঙে যেতে পারে।
এই সম্ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে উইসকনসিন। অঙ্গরাজ্যটির গ্রিনডেলে এক শনিবার সকালে প্রায় ৫০ জন ডেমোক্র্যাট সমর্থক বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাঁদের সামনে বক্তব্য দেন অঙ্গরাজ্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান বেন উইকলার। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে রিপাবলিকানদের আধিপত্যের অবসান ঘটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উইসকনসিনে পুরোনো নীতির পরিবর্তনের সুযোগ
উইসকনসিনে ২০১৯ সালে ডেমোক্র্যাট নেতা টনি এভার্স গভর্নর নির্বাচিত হলেও অঙ্গরাজ্যটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন এখনো তাঁর পূর্বসূরি রিপাবলিকান নেতা স্কট ওয়াকারের সময়কার।
ওয়াকার গভর্নর থাকাকালে রিপাবলিকানরা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদ এবং আইনসভার উভয় কক্ষ নিয়ন্ত্রণ করত। সেই সময় শ্রমিকদের অধিকারসংক্রান্ত আইনে বড় পরিবর্তন আনা হয়। বেসরকারি খাতের কর্মীদের ক্ষেত্রে যৌথ দর-কষাকষির সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রাখা হলেও ইউনিয়ন চাঁদা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়। সরকারি খাতের কর্মীদের যৌথ দর-কষাকষির অধিকারও ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়।
এ ছাড়া ঘণ্টাপ্রতি ন্যূনতম মজুরি ৭ ডলার ২৫ সেন্টের বেশি করার উদ্যোগে বাধা দেওয়া হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি ওবামাকেয়ারের আওতায় মেডিকেইড সম্প্রসারণেও সম্মতি দেয়নি ওয়াকার প্রশাসন।
ক্ষমতা ছাড়ার আগে ওয়াকার এমন কিছু আইন করেন, যার মাধ্যমে পরবর্তী গভর্নরের নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। ফলে এভার্স দায়িত্ব নেওয়ার পরও আগের সরকারের নীতির অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারেননি।
অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান ডেভিন রেমিকার মনে করেন, পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেলে এসব নীতির পরিবর্তন সম্ভব হবে। তাঁদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে গাঁজার বৈধতা, অঙ্গরাজ্যের আইনে গর্ভপাতের অধিকার সুরক্ষিত করা এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্কুল ভাউচার ব্যবস্থা বন্ধ করা।
নির্বাচনী মানচিত্রেও বদল এনেছে আদালত
উইসকনসিনে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা তৈরির পেছনে আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০২৩ সালে অঙ্গরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের নির্বাচনে উদারপন্থী বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এরপর আদালত অঙ্গরাজ্যের বিদ্যমান নির্বাচনী আসনের মানচিত্র বাতিল করে। নতুন মানচিত্র নিয়ে আদালতের আরও কঠোর সিদ্ধান্তের আশঙ্কায় রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা শেষ পর্যন্ত গভর্নর এভার্সের প্রস্তাবিত সীমানা অনুমোদন করেন।
নতুন নির্বাচনী মানচিত্রের প্রভাব ২০২৪ সালের নির্বাচনে দেখা যায়। এতে ডেমোক্র্যাটরা আইনসভায় উল্লেখযোগ্য আসন বাড়াতে সক্ষম হয়। এখন অঙ্গরাজ্যের নিম্নকক্ষে পাঁচটি এবং উচ্চকক্ষে মাত্র দুটি আসন নিজেদের দখলে আনতে পারলেই দলটি উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে।
ছয় অঙ্গরাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব
উইসকনসিনের পাশাপাশি অ্যারিজোনা, মিশিগান, মিনেসোটা, পেনসিলভানিয়া ও নেভাডাতেও ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য রয়েছে।
অ্যারিজোনায় ট্রাইফেক্টা প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনসভার উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। সেখানে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে দলটি এমন একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
অন্যদিকে মিশিগান, মিনেসোটা ও পেনসিলভানিয়ায় আইনসভার যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেই ডেমোক্র্যাটদের জন্য নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। নেভাডায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গভর্নর পদ ঘিরে।
এই ছয়টি অঙ্গরাজ্যের আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সব কটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্য হিসেবে পরিচিত। ফলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যদি আগের দুটি নির্বাচনের মতোই হাড্ডাহাড্ডি হয়, তাহলে এসব অঙ্গরাজ্যের সরকার ও আইনসভার নিয়ন্ত্রণ জাতীয় পর্যায়ের ক্ষমতার ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের আসনসংখ্যার পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের ফল শুধু ওয়াশিংটনের ক্ষমতার হিসাব নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমনীতি, গর্ভপাতের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কাঠামোর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।












