ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়েও ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ৮১ বছর বয়সী লুলা ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হওয়ার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার মাত্র দুই দিন পরই দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন পরাজিত প্রার্থী ফ্লাভিও। দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
ব্রাজিলে ১৯৮৫ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী প্রথম দফায় হেরে দ্বিতীয় দফার ভোটে জয়ী হননি। সেই ইতিহাস বদলে দিয়েছেন লুলা। ৪ অক্টোবরের প্রথম দফার ভোটে তিনি ফ্লাভিওর চেয়ে ২০ লাখ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন। প্রথম দফায় বাদ পড়া প্রার্থীরাও সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন এবং তাঁদের সমর্থন গিয়েছিল ফ্লাভিওর পক্ষে। কিন্তু পরবর্তী তিন সপ্তাহে লুলা আরও প্রায় এক কোটি ভোট পান। প্রথম দফায় ভোট দিতে না যাওয়া কিংবা বাতিল ভোট দেওয়া অনেক ভোটার দ্বিতীয় দফায় তাঁকে সমর্থন করেন।
লুলার এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের কৌশল বদল
প্রথম দফার নির্বাচনী প্রচারে লুলার দল ছিল অনেকটাই পুরোনো ধারার। সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচারের দাগ ঢাকতে তিনি পানামা টুপি পরতেন। কিন্তু এতে ভোটারদের কাছে তাঁর বয়সের বিষয়টি আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর প্রচার ছিল সীমিত। প্রচারের বড় অংশজুড়ে ছিল তাঁর ছবি ছাপানো স্টিকার বিতরণ।

দ্বিতীয় দফার আগে সেই কৌশল পাল্টে যায়। লুলা টুপি পরা বন্ধ করেন এবং ইনস্টাগ্রামে নিজের ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন। তাঁর প্রচারে বড় ভূমিকা রাখেন কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোনেস। তিনি মিনাস জেরাইস রাজ্যে ‘লুলার বাহিনী’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল চালু করেন। মাত্র দুই সপ্তাহে এর সদস্যসংখ্যা এক কোটির বেশি হয়।
সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লুলার ছবি ও প্রচারবার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো নির্দিষ্ট কাজ দেওয়া হতো। এর ফলে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে তাঁর প্রচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
নির্বাচনের আগে বাড়তি সরকারি সুবিধা
লুলার জয়ের দ্বিতীয় কারণ ছিল নির্বাচনের আগে সরকারি সুবিধা ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ। তাঁর সরকার দেশের প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভাতার পরিমাণ ১৫ শতাংশ বাড়ায়। কর্মসপ্তাহ এক দিন কমানোর আইন পাস করাতেও কংগ্রেসের ওপর চাপ দেন তিনি, যদিও এতে বেতন কমানোর কথা ছিল না।
এ ছাড়া সপ্তাহান্তে গণপরিবহন বিনা মূল্যে চালু, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ মওকুফ এবং ১০ লাখ ব্যবসায়ীকে এক হাজার ডলার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন লুলা।
ব্রাজিলে নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীনদের নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার নজির রয়েছে। তবে এবার লুলার প্রতিশ্রুতিগুলোর আর্থিক পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব কর্মসূচির অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে তাঁর দল বিস্তারিত পরিকল্পনা দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছরের শেষ নাগাদ এসব সুবিধার ব্যয় দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
ফ্লাভিওর অতীত ও বিতর্কিত অবস্থান
লুলার জয়ের তৃতীয় কারণ ছিল ফ্লাভিও বলসোনারোকে ঘিরে বিতর্ক। দুই প্রার্থীর টেলিভিশন বিতর্কে তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড ও রিও ডি জেনিরোর সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে কথিত যোগাযোগের বিষয় সামনে আসে। এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ভাড়াটে খুন ও চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে।

প্রথম দফার নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পর রিওতে ফ্লাভিওর এক সহযোগীকে অপরাধী গোষ্ঠী ও মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
একটি টেলিভিশন বিতর্কে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত এক পুলিশ সদস্যের আইনজীবী হিসেবে ফ্লাভিওর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি অনেক ভোটারের কাছে নতুন ছিল। বিতর্কে লুলার একটি হাতের আঙুল না থাকা নিয়ে ফ্লাভিওর বিদ্রূপও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
কারখানায় কাজ করার সময় কিশোর বয়সে দুর্ঘটনায় একটি আঙুল হারিয়েছিলেন লুলা। জবাবে তিনি বলেন, তখন তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং রাতে কাজ করতেন। কাজ না করলে তাঁর খাবার জুটত না। এই বক্তব্যে দুই প্রার্থীর সামাজিক ও পারিবারিক পটভূমির পার্থক্য সামনে আসে। ফ্লাভিও রাজনীতিতে এসেছিলেন তাঁর বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর পরিচিতি ও প্রভাবের সুবাদে।
পরাজয়ের পর ব্রাজিল ছাড়লেন ফ্লাভিও
২৫ অক্টোবর নির্বাচনে ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন লুলা। ফ্লাভিও পান ৪৮ শতাংশ। তবে পরাজয় মেনে না নিয়ে তিনি নির্বাচন বাতিলের দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ, প্রতিকূল আবহাওয়া ও গণপরিবহন বিঘ্নের কারণে ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত তাঁর প্রচারের ক্ষতি করেছে।
কিন্তু নির্বাচনের পর ফ্লাভিওর নিজের আইনি পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সিনেটর হিসেবে তাঁর বিচারিক দায়মুক্তির মেয়াদ ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা। এর মধ্যে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছিল ফেডারেল পুলিশ। ফ্লাভিও ও ওই ব্যবসায়ী দুজনেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নির্বাচনের পরদিন সংশ্লিষ্ট মামলার দায়িত্বে থাকা সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক ফ্লাভিওর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন। পুলিশ জানায়, তাঁকে পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হলেও তিনি তা করেননি।
এর পরিবর্তে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেন ফ্লাভিও। পরে ইকুয়েডর হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে পৌঁছান তাঁরা। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগেই জানিয়েছিল, তাঁদের দেশটিতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
ফ্লাভিওর ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারোও ২০২৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। বাবার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তদবির করার অভিযোগে গত জুনে ব্রাজিলের একটি আদালত তাঁকে অনুপস্থিতিতে চার বছরের কারাদণ্ড দেন।
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে ফ্লাভিও নিজেকে ‘ব্রাজিলের নেতা’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানির শিকার হয়েছেন। বিদেশে অবস্থান করেও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নেতৃত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।

তবে আপাতত ফ্লাভিওর প্রতি ট্রাম্পের বিশেষ সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ২৬ অক্টোবর ব্রাজিলের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্রাম্প একে কারচুপির আরেকটি নির্বাচন বলে মনে হয়েছে উল্লেখ করলেও জানান, তিনি কোনো পক্ষ নেননি। একই সঙ্গে লুলার সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। ২৮ অক্টোবর ট্রাম্প বলেন, ব্রাজিলের ঘটনায় তিনি জড়াবেন না।
ডানপন্থীদের নেতৃত্বে পরিবর্তনের সুযোগ
ফ্লাভিওর ব্রাজিল ত্যাগ দেশটির ডানপন্থী রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে। জাইর বলসোনারো নিজেই ছেলেকে রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এর ফলে ডানপন্থী শিবিরের এমন কয়েকজন রাজনীতিক নেতৃত্বের সুযোগ পাননি, যাঁদের নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি হতে পারত।
জাইর এখন গৃহবন্দী, আর ফ্লাভিও দেশের বাইরে। এই পরিস্থিতিতে ব্রাজিলের ডানপন্থী রাজনীতিতে নেতৃত্ব ও কৌশল নতুন করে সাজানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নতুন মেয়াদে কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনে জয় পেলেও লুলার নতুন মেয়াদের শুরুটা সহজ হচ্ছে না। সংসদের দুই কক্ষেই ডানপন্থীদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জোট রয়েছে। ফলে আইন পাস ও সরকার পরিচালনায় তাঁকে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। সংবিধানগত সীমাবদ্ধতা এবং তাঁর বয়সের কারণে এই মেয়াদ শেষে আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও নেই। ফলে নতুন মেয়াদের শুরু থেকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। ব্রাজিলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই লুলার সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন। সরকারি ব্যয় বাড়ানোর নীতির কারণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকৃত সুদের হার অনেক বাড়িয়েছে। লুলার বর্তমান চার বছরের মেয়াদে সরকারি ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত ১০ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি বেড়েছে।

নির্বাচনে লুলার জয়ের খবর প্রকাশের পরপরই আর্থিক বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ব্রাজিলের মুদ্রা রিয়ালের দর এক দিনেই ৮ শতাংশ কমে যায়। গত ২৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি ছিল মুদ্রাটির সবচেয়ে বড় এক দিনের দরপতন। একই সময়ে সাও পাওলোর শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক ১৪ শতাংশ কমে যায়।
বিনিয়োগকারীরা এখন অর্থমন্ত্রী হিসেবে রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ কাউকে নয়, বরং অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারককে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় কমানোর একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনাও চান তাঁরা।
কিন্তু নির্বাচনের আগে লুলার দেওয়া বিপুল আর্থিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি এই প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান এবং সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রথম দফার নির্বাচনে পিছিয়ে পড়েও লুলা শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে এনেছেন। কিন্তু চতুর্থ ও শেষ মেয়াদকে সফল করতে তাঁকে শুধু রাজনৈতিক ভাগ্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিভক্ত সংসদে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।












