ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে থেকে আসা কম দামের পণ্যের পার্সেলে নতুন করে শুল্ক ও হ্যান্ডলিং ফি আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। নতুন দুই ইউরো হ্যান্ডলিং ফি যুক্ত হওয়ায় কম দামের প্রতিটি পার্সেলের ওপর নির্দিষ্ট শুল্ক-সংক্রান্ত খরচ দাঁড়িয়েছে পাঁচ ইউরো। এর বড় প্রভাব পড়তে পারে ইউরোপের সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। বিশেষ করে চীন থেকে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে এই খরচ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত রোববার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা পার্সেলে দুই ইউরো হ্যান্ডলিং ফি দিতে হবে। এর আগে জুলাইয়ে ১৫০ ইউরোর কম মূল্যের ছোট পার্সেলের ওপর তিন ইউরো চার্জ চালু করা হয়েছিল। ফলে দুই ধরনের ফি মিলিয়ে একটি পার্সেলের নির্দিষ্ট খরচ দাঁড়িয়েছে পাঁচ ইউরো।
নিয়ম অনুযায়ী, একই পার্সেলে একাধিক শ্রেণির পণ্য থাকলে প্রতিটি শ্রেণির জন্য আলাদা হ্যান্ডলিং ফি দিতে হবে। যেমন, একটি পার্সেলে তিন ধরনের পণ্য থাকলে পণ্যের সংখ্যা যতই হোক, হ্যান্ডলিং ফি হবে ছয় ইউরো।
চীনা পণ্যের ওপর বেশি প্রভাব
ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করা কম দামের পার্সেলের প্রায় ৯৩ শতাংশই চীন থেকে আসে। ফলে নতুন এই ফি চীনা পণ্যের ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বার্ষিক প্রায় ৫৯০ কোটি পার্সেল ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করে। প্রতিটি পার্সেলে তিন থেকে পাঁচ ইউরো করে নির্দিষ্ট চার্জ আরোপ করা হলে ইইউর বাজেটে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি ইউরো অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে। তবে পণ্যের শ্রেণিভেদে ফি যোগ হওয়ার নিয়মের কারণে কোনো কোনো পার্সেলের খরচ আরও বাড়বে।
এই ব্যবস্থাকে শুধু শুল্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, ক্রেতা পণ্য কেনার প্রক্রিয়া শেষ করার আগেই তার ওপর অতিরিক্ত খরচ চাপানো হচ্ছে। এতে সীমান্ত পেরিয়ে অনলাইনে পণ্য কেনাকাটার ব্যয় বাড়বে।
চাপ বাড়বে সাধারণ ক্রেতার ওপর
ইইউর দাবি, নতুন ফি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও বিক্রেতারা পরিশোধ করবে। তবে শেষ পর্যন্ত এই খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপানো হতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে ইউরোপীয় ভোক্তা সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, কিছু প্ল্যাটফর্ম কেনাকাটার শেষ পর্যায়ে পণ্যের দামের সঙ্গে অতিরিক্ত চার্জ যুক্ত করতে পারে।
অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্ম আলিএক্সপ্রেসও সতর্ক করেছে, নতুন ফি ইউরোপের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট আরও বাড়াতে পারে।
এর ফলে তিন ইউরোর কোনো ছোট পণ্য কিনতেও ক্রেতাকে পণ্যের মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ শুল্ক ও ফি হিসেবে দিতে হতে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যখন প্রতিবাদ চলছে, তখন নতুন এই চার্জ সাধারণ মানুষের অসন্তোষ আরও বাড়াতে পারে।
প্রতিযোগিতার বদলে সুরক্ষাবাদী নীতি
চীনের ই-কমার্স খাতের দ্রুত বিস্তার এবং দেশটির শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ইউরোপ নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ বাজারের দক্ষতা বাড়ানোর বদলে প্রশাসনিক বাধা আরোপের পথ বেছে নিচ্ছে—এমন সমালোচনা উঠেছে।
ইউরোপের কিছু ব্যবসায়ী প্রতিনিধির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধির কারণে উত্তর আমেরিকার বাজারে ইউরোপীয় ওয়াইনের দাম তিন বছর আগের তুলনায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এখন চীন থেকে পণ্য কেনার খরচ বাড়ায় ইউরোপের কিছু ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন। এতে শেষ পর্যন্ত মার্কিন কোম্পানিগুলোই সুবিধা পেতে পারে।
শুল্ক বাড়িয়ে ইউরোপের কাঠামোগত অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। চীনা পণ্যের কম দামের পেছনে শুধু কর ছাড় নয়, বরং শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সহযোগিতার পথেও অগ্রগতি
বাণিজ্যিক বাধার বিপরীতে চীন ও ইউরোপের মধ্যে সহযোগিতার কিছু ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। দুই পক্ষের বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক আলোচনায় একাধিক উদ্যোগের ফল পাওয়া গেছে। হাঙ্গেরিতে বিওয়াইডির কারখানায় শিগগিরই ব্যাপক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। চীন ও সুইজারল্যান্ডের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও হালনাগাদ হয়েছে। অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনের হাইব্রিড গাড়ি রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
ছোট পার্সেলের ওপর নতুন ফি ইইউর চলতি বছরের নেওয়া একাধিক বিধিনিষেধমূলক পদক্ষেপের একটি। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপের বাজারের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং চীন-ইউরোপ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।












