আজ ৪ নভেম্বর, জাতীয় সংবিধান দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান। এ বছর দিবসটির বয়স হলো ৫৪ বছর। সংবিধান কার্যকর হয় একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবসের প্রথম বার্ষিকীতে। অর্থাৎ গৃহীত হওয়া আর কার্যকর হওয়ার মাঝে ব্যবধান ছিল ৪২ দিন। জাতীয় সংবিধান দিবস তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধজয়ের এক বছরের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্র নিজের মৌলিক আইন লিখে ফেলেছিল।
সংবিধান রচনার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল। ওই দিন ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সভাপতি ছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। খসড়া নিয়ে কমিটি প্রায় ছয় মাস কাজ করে। পরে ওই বছরের ১২ অক্টোবর সংবিধান বিল গণপরিষদে উত্থাপিত হয়। বিলের ওপর গণপরিষদে একাধিক দিন আলোচনা চলে। সদস্যরা বিভিন্ন ধারা নিয়ে নিজেদের মত তুলে ধরেন, কেউ কেউ আপত্তিও জানান। সব আলোচনার শেষে ৪ নভেম্বর তা সংবিধান হিসেবে গৃহীত হয়। এভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভাতেই দেশের সংবিধান চূড়ান্ত রূপ পায়।
সংবিধানের প্রস্তাবনায় ফিরে গেলে দেখা যায়, শুরুতেই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বলা আছে। এরপর আছে মুক্তিযুদ্ধের কথা, যার মধ্য দিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ সংবিধানের ভিত্তিই হলো স্বাধীনতা সংগ্রাম। যাঁরা যুদ্ধ করেছেন এবং যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের ওপরই রাষ্ট্রের এই কাঠামো দাঁড়িয়েছে। প্রস্তাবনা পড়লে বোঝা যায়, নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন কী ছিল। জাতীয় সংবিধান দিবসে তাই শুধু একটি আইনের বই নয়, একটি রাষ্ট্রের জন্মকথাও স্মরণ করা হয়।
সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ এর কেন্দ্রীয় কথাগুলো বলে দেয়। সেখানে লেখা আছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। সংবিধান জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ আইন। এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন থাকলে, যতটুকু অসামঞ্জস্য ততটুকু বাতিল হয়ে যায়। সরকার, সংসদ ও আদালত সবার কাজের সীমা এই সংবিধানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নাগরিকের অধিকারের প্রশ্নেও শেষ ভরসা এই দলিল। তাই কোনো আইন বা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শেষ পর্যন্ত সংবিধানের কাছেই ফিরে যেতে হয়। এই কারণেই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ধাপে সংবিধানকে মানা জরুরি বলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের জন্য এই দিনের অর্থ তাই বহুমুখী। একদিকে এটি ইতিহাসের স্মরণ, যেখানে ৫৪ বছর আগের সেই দিনটি ফিরে আসে। অন্যদিকে নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে ভাবার সুযোগ। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাইলে এই দিনে সংবিধান পড়ে দেখতে পারেন। নিজের দেশের সর্বোচ্চ আইন কী বলে, তা জানা প্রতিটি নাগরিকেরই কাজে লাগে। এই দলিল সাধারণ পাঠকের পক্ষেও পড়ে বোঝা সম্ভব। অনেকে ধরে নেন, সংবিধান শুধু আইনজীবী আর বিচারকদের বিষয়। বাস্তবে এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্যই লেখা। সরকারের আইন-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে সংবিধানের পূর্ণ পাঠ পাওয়া যায়। প্রস্তাবনা আর ৭ অনুচ্ছেদ দিয়ে শুরু করলে পুরো দলিলের মূল সুরটা সহজে ধরা পড়ে। জাতীয় সংবিধান দিবস সেই জানার তাগিদটাই নতুন করে সামনে আনে।












