ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম এবার রূপ নিয়েছে আতঙ্ক ও সহিংসতার সময়ে। জলপাই বাগানে কাজ করতে গিয়ে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হচ্ছেন ফিলিস্তিনি কৃষকেরা। কোথাও গাছ পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কৃষকদের মারধর ও গুলি করা হচ্ছে। প্রাণভয়ে অনেক পরিবার নিজেদের জমিতে জলপাই সংগ্রহ করতেও যেতে পারছে না।
গত ৭ অক্টোবর জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পশ্চিম তীরের বুরকা এলাকার কাছে ৪৪ বছর বয়সী আলী আল-বাজারিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মরত কর্মকর্তা ছিলেন। তবে হামলার সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না।
আলীর স্বজন ইলহাম আল-বাজারি জানান, পরিবারের সদস্যরা জলপাই সংগ্রহ করছিলেন। এ সময় কালো পোশাক পরা, লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত একদল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী সেখানে হাজির হয়। তারা ইলহামের স্বামীকে পায়ে গুলি করে এবং তাঁর কিশোর বয়সী এক ভাতিজাকে মারধর করে। ভাতিজাকে বাঁচাতে গিয়ে ইলহাম নিজেও হামলার শিকার হন। এতে তাঁর হাত ভেঙে যায়।
স্বজনদের রক্ষা করতে এগিয়ে এসে পিঠে গুলিবিদ্ধ হন আলী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনারা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও আহত আলীর জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডাকার অনুমতি দেননি। পরে তাঁর মৃত্যু হয়।

জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে শত শত হামলা
ফিলিস্তিনিদের জন্য জলপাই সংগ্রহ শুধু কৃষিকাজ নয়, এটি পারিবারিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ। প্রতিবছর অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে এই মৌসুম। কয়েক প্রজন্মের মানুষ একসঙ্গে বাগানে গিয়ে জলপাই সংগ্রহ করেন। খোলা আগুনে কফি তৈরি করে চলে কাজ।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, জলপাই সংগ্রহ থেকে পাওয়া আয়ের ওপর নির্ভরশীল প্রায় এক লাখ পরিবার। ফলে এই মৌসুমে হামলা ও বাধার কারণে তাদের জীবনযাত্রা এবং আয় দুটিই হুমকির মুখে পড়েছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিন, জাতিসংঘ এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত অক্টোবরেই সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা শত শত হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় জলপাইগাছ পুড়িয়ে দেওয়া, কৃষকদের গুলি করা এবং নারী-পুরুষ ও শিশুদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে।
গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। ধ্বংস করা হয়েছে জলপাইগাছ ও কৃষিজমি।
পশ্চিম তীরের খিরবেত আবু ফালাহ, তুরমুস আয়্যা এবং দেইর আবু মাশাল—এই তিনটি গ্রামে গত মাসে হামলার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন সাংবাদিকেরা। এসব ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি থাকলেও বসতি স্থাপনকারীদের দিয়ে ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অর্ধেক জমিতে ফসল সংগ্রহ অনিশ্চিত

ফিলিস্তিনের কৃষি মন্ত্রণালয়ের জলপাই বিভাগপ্রধান রামেজ ওবেইদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এ বছর প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে কৃষকদের প্রবেশ সম্ভব হবে না।
জালুদ গ্রামের পরিস্থিতি আরও কঠিন। গ্রামটির চারপাশের পাহাড়ে ২০২৩ সালের পর থেকে নতুন নতুন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অবৈধ ঘাঁটি গড়ে উঠেছে। ফলে কৃষকেরা নিজেদের বাগানে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
গ্রামের মেয়র রায়েদ আল-নাসের জানান, তাঁর বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে বসতি স্থাপনকারীরা কৃষি সরঞ্জাম চুরি করেছে। একই ধরনের ঘটনা ঘটছে অন্য কৃষকদের সঙ্গেও।
প্রাণহানির আশঙ্কায় অনেক পরিবার গাছের জলপাই না তুলেই রেখে দিচ্ছে। স্থানীয় মেয়রের ভাষায়, এটি এখন আর জলপাই সংগ্রহের মৌসুম নয়, বরং জলপাই চুরির মৌসুম।
পরিকল্পিতভাবে হামলার অভিযোগ
ফিলিস্তিনি কৃষকদের বর্ণনা অনুযায়ী, বসতি স্থাপনকারীদের হামলার একটি নির্দিষ্ট ধরন রয়েছে। পশ্চিম তীরের পাহাড়ি এলাকায় জলপাই বাগানের ওপরের অংশে তারা বিভিন্ন ঘাঁটি তৈরি করেছে। সেখান থেকে কৃষকদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুযোগ বুঝে নিচে নেমে আসে।
অনেক সময় কালো পোশাক ও মুখোশ পরে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তারা বাগানে ঢুকে পড়ে। কখনো সড়ক দিয়ে দ্রুত যানবাহনে এসে কৃষকদের ঘিরে ফেলে।
গত ১৬ অক্টোবর খিরবেত আবু ফালাহ গ্রামে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন বসতি স্থাপনকারী জলপাই সংগ্রহরত কৃষকদের ঘিরে ফেলে। পরে তারা সেখানে উপস্থিত এক জ্যেষ্ঠ আলোকচিত্র সাংবাদিকের ওপরও হামলা চালায়।
নিজেদের রক্ষায় ফিলিস্তিনি কৃষকেরা আশপাশের পাহাড়ে পাহারার ব্যবস্থা করছেন। কেউ হামলাকারীদের আসতে দেখলে অন্যদের সতর্ক করেন। কারণ ইসরায়েলি আইনে ফিলিস্তিনি গ্রামবাসীদের অস্ত্র বহনের সুযোগ নেই। বসতি স্থাপনকারীদের দিকে পাথর ছুড়লেও কারাদণ্ডের মুখে পড়তে পারেন তাঁরা।

সেনাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
গত ১৯ অক্টোবর তুরমুস আয়্যা গ্রামে বসতি স্থাপনকারীরা একটি বাড়িতে হামলা চালায়। বাড়ির মালিকেরা তখন জলপাই সংগ্রহে বাইরে ছিলেন। হামলাকারীরা গাড়িতে আগুন দেয়, প্রতিবেশীর বাড়ির জানালা ভাঙে এবং একজন মার্কিন নাগরিককে মারধর করে হাসপাতালে পাঠায় বলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন।
ঘটনার পর ইসরায়েলি সেনারা সেখানে উপস্থিত ফিলিস্তিনিদের কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার হুমকি দিয়ে এলাকা ছেড়ে যেতে বলেন।
একই দিনে দেইর আবু মাশাল গ্রামে ৬০ বছর বয়সী কৃষক মাহমুদ রাবিয়া নিজের জলপাই বাগানে গিয়ে কয়েকজন বসতি স্থাপনকারীকে দেখতে পান। কিছুক্ষণের মধ্যে আরও কয়েকজন সেখানে যোগ দেন। পরে ইসরায়েলি সেনারা এসে বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে না দিয়ে কৃষক ও অন্যদের জমি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করেন।
এ সময় সেনারা সামরিক আদেশ দেখিয়ে এলাকাটি বন্ধ ঘোষণা করেন। একজন ফিলিস্তিনি কৃষককে আটক করা হয়। আরেকজনকে হাতের করাত রাখার অভিযোগে আটক করা হয়।
মাহমুদ রাবিয়া বলেন, তাঁর পূর্বপুরুষেরা এই জমিতে চাষ করেছেন। বিভিন্ন সংঘাত ও কঠিন সময়েও তিনি নিজের জলপাইগাছ থেকে ফসল সংগ্রহ করেছেন। এবারই প্রথম তাঁকে নিজের জমিতে কাজ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
বসতি সম্প্রসারণে বাড়ছে উত্তেজনা

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হলে পশ্চিম তীরেও বসতি স্থাপনকারীদের তৎপরতা বেড়েছে।
গত তিন বছরে সেখানে শতাধিক নতুন বসতি স্থাপনকারীদের ঘাঁটি গড়ে উঠেছে। এসব ঘাঁটির আশপাশের ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ হামলা ও ভয়ভীতির কারণে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন দেশটির সাবেক সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ শত শত বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের কেউ কেউ পরিস্থিতিকে জাতিগত উচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। কার্যালয়ের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান বলেছেন, ইহুদিদের মধ্যে অপরাধ সংঘটিত হলেও তা রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় হয় না। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আদালতে নেওয়া হয় এবং দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া হয়।
এদিকে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কয়েকটি ঘটনাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলেও আখ্যা দিয়েছেন তাঁরা।
জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শেষ হওয়ার পথে থাকলেও ফিলিস্তিনি কৃষকদের অনিশ্চয়তা কাটছে না। যে জমি থেকে বছরের পর বছর পরিবারগুলোর জীবিকা এসেছে, সেই জমিতেই এখন প্রাণ হারানোর ভয়ে যেতে পারছেন না তাঁরা।












