ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে দেশটির বিমান চলাচল খাতসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন করে ৩৬টি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার ঘোষিত এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ইরানের বিমান সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির বিমান খাতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম পাওয়ার পথ বন্ধ করা।
সব ইরানি বিমান সংস্থাই নিষেধাজ্ঞার আওতায়
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা মাহান এয়ারকে আরও কঠোরভাবে চাপে ফেলার পাশাপাশি ইরানের অন্য সব বিমান সংস্থাকেও নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেওয়া হয়েছে।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ইরান গোপন কোম্পানি, পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান, বিদেশি মধ্যস্থতাকারী এবং ভিন্ন পথে পণ্য পাঠানোর কৌশল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বিমান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সংগ্রহ করছে। এসব নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও কাজাখস্তানে থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠান ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর কার্যক্রম চালাতে কিংবা মার্কিন প্রযুক্তি ও বিমান সংগ্রহে সহায়তা করেছে।
আকাশপথেও বাড়ছে বিধিনিষেধ
নতুন পদক্ষেপের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ইরান-সম্পর্কিত বিমান চলাচলের তিনটি অনুমোদন স্থগিত করেছে। এর ফলে ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার এবং মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন বা মার্কিন নির্মিত বাণিজ্যিক বিমান নিয়ে ইরানে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগের কিছু ছাড় আর কার্যকর থাকবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব পড়তে পারে দুবাই, দোহা ও ইস্তাম্বুল থেকে তেহরানের বিমান যোগাযোগে। এসব শহর ইরানের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও আর্থিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আগের কিছু ছাড়ের আওতায় বিমানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম, জ্বালানি ও জরুরি মেরামতের সুযোগও ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেসব সুবিধাও সংকুচিত হতে পারে।
মাহান এয়ারকে ঘিরে দীর্ঘদিনের মার্কিন চাপ
মাহান এয়ারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। ২০১১ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির ওপর প্রথম নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মাহান এয়ারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধেও একাধিকবার ব্যবস্থা নিয়েছে ওয়াশিংটন।
মঙ্গলবারের ঘোষণায় ইরানের ২৭টি বিমান সংস্থার পাশাপাশি তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি চলতি বছরের গ্রীষ্মে মাহান এয়ারকে অন্তত তিনটি বোয়িং ৭৭৭ বিমান সংগ্রহে সহায়তা করেছে।

বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকেও বিচ্ছিন্ন করার হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিমান সংস্থাগুলোকে বিমান সরবরাহ, পণ্য পরিবহন, আর্থিক সহায়তা কিংবা অন্যান্য পরিষেবা দেওয়া বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।
এর ফলে ইরানের বিমান খাতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, যাত্রী পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিমান খাতকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতির ওপর চলমান চাপকে আরও বিস্তৃত করছে। এর প্রভাব সাধারণ যাত্রী পরিবহন থেকে শুরু করে পণ্য সরবরাহ এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে।
হরমুজ ঘিরে চাপের মধ্যেই নতুন পদক্ষেপ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সপ্তম মাসে প্রবেশের সময় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরালো হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কমানো, দেশটির তেল রপ্তানি সীমিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবেশাধিকার সংকুচিত করার বৃহত্তর মার্কিন প্রচেষ্টারই অংশ হিসেবে নতুন বিমান নিষেধাজ্ঞাকে দেখা হচ্ছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বিমান খাতে প্রয়োজনীয় বিমান, যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি সংগ্রহেও তেহরানকে বাড়তি সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















