১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

ইশকুল (পর্ব-৩৭)

  • Sarakhon Report
  • ০৮:০০:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০২৪
  • 149

আর্কাদি গাইদার

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

যাদের ইচ্ছে হয় লড়াই করুক, কিন্তু আমার কী দায় পড়েছে। আমি তো জার্মানদের কাছে কিছু ধারি না, জার্মানও আমার কাছে ধারে না কিছু। আলেক্সেই আর আমি এ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। লম্বা লম্বা রাত যেন কাটতেই চায় না। ছারপোকার দৌরাখিতে ঘুমোনোর তো উপায় নেই। একমাত্তর সান্ত্বনা হল, গান গাওয়া কিংবা কথা বলা। মাঝে মাঝে মনে হত, প্রাণভরে কাঁদি আর নয় তো কারো গলা টিপে ভবলীলা সাঙ্গ করে দিই। কিন্তু কিছুই করতুম না, খালি স্থির হয়ে বসে গান ধরে দিতুম। পোড়া চোখের জলও শুকিয়ে গিয়েছিল। ভাবতুম, কারো উপর গায়ের ঝাল ঝাড়ি, কিন্তু সাধ্যি কী যে তা করি! কাজেই শেষ পর্যন্ত বলতুম, ইয়ার-দোন্ত ভাইসব, সাথী ভাইসব, এসো একটা গান গাই!’

সৈনিকটির মুখখানা লাল হয়ে ঘামে ভিজে উঠেছিল, আয়োডোফর্মের গন্ধ ঘন হয়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমশ। জানলাটা খুলে দিলুম। তরতাজা সন্ধে, উঠোনে জমা-করা খড় আর বেশি-পাকা চেরির সুবাস বয়ে হাওয়া এসে ভরিয়ে দিল ঘর।

জানলার ধারে উঠে বসে শার্সি’র গায়ে এক আঙুলে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে সৈনিকটির কথা আমি শুনছিলুম একমনে। কথাগুলো আমার বুকটার মধ্যে যেন শুকনো খরখরে ধূলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল, আর সেই ধুলো ক্রমশ জমতে-জমতে পুরু হয়ে যুদ্ধ, যুদ্ধের পবিত্র তাৎপর্য’ আর তার বীরদের সম্বন্ধে আমার এতদিনের সাধের ধারণাকে দিচ্ছিল একেবারে চাপা দিয়ে। অথচ সেদিন পর্যন্ত ওই সব ধারণা আমার কাছে কেমন স্পষ্ট, কতখানি বোধগম্যই না ছিল। সৈনিকটির দিকে তাকিয়ে আমার কেমন ঘৃণা বোধ হল। উনি কোমর থেকে বেল্টটা খুলে ফেললেন, তারপর শার্টের ভেজা কলারের বোতাম খুলে বাঁধন আলগা করে দিলেন। বোঝা গেল, অল্প একটু নেশা হয়েছে ওঁর।

ফের উনি শুরু করলেন, ‘মৃত্যু কেউ চায় না, এটা ঠিক। কিন্তু মৃত্যুর জন্যেই যে যুদ্ধটা খারাপ লাগে তা নয়, খারাপ লাগে এর মধ্যে একটা অন্যায়ের বোধ মিশে আছে বলে। মৃত্যুর মধ্যে কিন্তু এই বোধটা নেই। প্রত্যেককেই মরতে হবে, আগে আর পরে এই যা তফাত। এ নিয়ে কিছু করার নেই, এ তো নিয়ম। কিন্তু লড়াই করতে হবে, এ নিয়ম কে চালু করল? আমি, আপনি, এ-ও-সে আমরা কেউ নয়, তবু কেউ নিশ্চয় নিয়মটা রজ করেছে। আচ্ছা, বইতে যেমন লেখে ঈশ্বর যদি সত্যিই তেমন সর্বশক্তিমান, চির-দয়াল, আর সর্বজ্ঞ হয়ে থাকেন, তবে তিনি সেই বেয়াদব লোকটাকে তো কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলতে পারতেন: ‘আমার এই কথাটার জবাব দে দিকি এই লক্ষ লক্ষ মানুষকে যুদ্ধে ঠেলে দিলি তুই কী জন্যে?

এতে ওদেরই বা লাভ কী, আর তোরই বা লাভ কোথায়? আচ্ছা, আসল ব্যাপারটা কী এখন খোলসা করে বল্ দেখি, যাতে সবাই জানতে পারে ওরা যুদ্ধ করছে কী জন্যে?’ ‘কিন্তু’, এই পর্যন্ত বলে সৈনিক হঠাৎ টলে উঠলেন, গ্লাসটাও তাঁর হাত থেকে প্রায় পড়ে যাবার মতো হল। পরে সামলে নিয়ে বললেন, ‘কিন্তু ঈশ্বর এই সব ঐহিক ব্যাপারে মাথা গলাতে চান না, এই তো? ঠিক আছে, আমরা অপেক্ষা করি। আমরা ধৈর্যশীল জাত। কিন্তু এটা ঠিক, যখন আমাদের ধৈর্য টলে যাবে তখন নিজেরাই আমরা গিয়ে জজ আর আসামীদের খুঁজে বের করব।’

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

ইশকুল (পর্ব-৩৭)

০৮:০০:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০২৪

আর্কাদি গাইদার

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

যাদের ইচ্ছে হয় লড়াই করুক, কিন্তু আমার কী দায় পড়েছে। আমি তো জার্মানদের কাছে কিছু ধারি না, জার্মানও আমার কাছে ধারে না কিছু। আলেক্সেই আর আমি এ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। লম্বা লম্বা রাত যেন কাটতেই চায় না। ছারপোকার দৌরাখিতে ঘুমোনোর তো উপায় নেই। একমাত্তর সান্ত্বনা হল, গান গাওয়া কিংবা কথা বলা। মাঝে মাঝে মনে হত, প্রাণভরে কাঁদি আর নয় তো কারো গলা টিপে ভবলীলা সাঙ্গ করে দিই। কিন্তু কিছুই করতুম না, খালি স্থির হয়ে বসে গান ধরে দিতুম। পোড়া চোখের জলও শুকিয়ে গিয়েছিল। ভাবতুম, কারো উপর গায়ের ঝাল ঝাড়ি, কিন্তু সাধ্যি কী যে তা করি! কাজেই শেষ পর্যন্ত বলতুম, ইয়ার-দোন্ত ভাইসব, সাথী ভাইসব, এসো একটা গান গাই!’

সৈনিকটির মুখখানা লাল হয়ে ঘামে ভিজে উঠেছিল, আয়োডোফর্মের গন্ধ ঘন হয়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমশ। জানলাটা খুলে দিলুম। তরতাজা সন্ধে, উঠোনে জমা-করা খড় আর বেশি-পাকা চেরির সুবাস বয়ে হাওয়া এসে ভরিয়ে দিল ঘর।

জানলার ধারে উঠে বসে শার্সি’র গায়ে এক আঙুলে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে সৈনিকটির কথা আমি শুনছিলুম একমনে। কথাগুলো আমার বুকটার মধ্যে যেন শুকনো খরখরে ধূলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল, আর সেই ধুলো ক্রমশ জমতে-জমতে পুরু হয়ে যুদ্ধ, যুদ্ধের পবিত্র তাৎপর্য’ আর তার বীরদের সম্বন্ধে আমার এতদিনের সাধের ধারণাকে দিচ্ছিল একেবারে চাপা দিয়ে। অথচ সেদিন পর্যন্ত ওই সব ধারণা আমার কাছে কেমন স্পষ্ট, কতখানি বোধগম্যই না ছিল। সৈনিকটির দিকে তাকিয়ে আমার কেমন ঘৃণা বোধ হল। উনি কোমর থেকে বেল্টটা খুলে ফেললেন, তারপর শার্টের ভেজা কলারের বোতাম খুলে বাঁধন আলগা করে দিলেন। বোঝা গেল, অল্প একটু নেশা হয়েছে ওঁর।

ফের উনি শুরু করলেন, ‘মৃত্যু কেউ চায় না, এটা ঠিক। কিন্তু মৃত্যুর জন্যেই যে যুদ্ধটা খারাপ লাগে তা নয়, খারাপ লাগে এর মধ্যে একটা অন্যায়ের বোধ মিশে আছে বলে। মৃত্যুর মধ্যে কিন্তু এই বোধটা নেই। প্রত্যেককেই মরতে হবে, আগে আর পরে এই যা তফাত। এ নিয়ে কিছু করার নেই, এ তো নিয়ম। কিন্তু লড়াই করতে হবে, এ নিয়ম কে চালু করল? আমি, আপনি, এ-ও-সে আমরা কেউ নয়, তবু কেউ নিশ্চয় নিয়মটা রজ করেছে। আচ্ছা, বইতে যেমন লেখে ঈশ্বর যদি সত্যিই তেমন সর্বশক্তিমান, চির-দয়াল, আর সর্বজ্ঞ হয়ে থাকেন, তবে তিনি সেই বেয়াদব লোকটাকে তো কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলতে পারতেন: ‘আমার এই কথাটার জবাব দে দিকি এই লক্ষ লক্ষ মানুষকে যুদ্ধে ঠেলে দিলি তুই কী জন্যে?

এতে ওদেরই বা লাভ কী, আর তোরই বা লাভ কোথায়? আচ্ছা, আসল ব্যাপারটা কী এখন খোলসা করে বল্ দেখি, যাতে সবাই জানতে পারে ওরা যুদ্ধ করছে কী জন্যে?’ ‘কিন্তু’, এই পর্যন্ত বলে সৈনিক হঠাৎ টলে উঠলেন, গ্লাসটাও তাঁর হাত থেকে প্রায় পড়ে যাবার মতো হল। পরে সামলে নিয়ে বললেন, ‘কিন্তু ঈশ্বর এই সব ঐহিক ব্যাপারে মাথা গলাতে চান না, এই তো? ঠিক আছে, আমরা অপেক্ষা করি। আমরা ধৈর্যশীল জাত। কিন্তু এটা ঠিক, যখন আমাদের ধৈর্য টলে যাবে তখন নিজেরাই আমরা গিয়ে জজ আর আসামীদের খুঁজে বের করব।’