মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে আজ এক অদ্ভুত বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে। তারা প্রায় সবাই ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান চায়, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। যুদ্ধের চাপ যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—একই হুমকির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এই দেশগুলো অভিন্ন কৌশল গড়ে তুলতে পারছে না। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ—সবই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) নিজেদেরকে একটি নিরাপত্তাভিত্তিক আঞ্চলিক জোট হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু বাস্তবে সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ, ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং ইরানকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই পুরোপুরি এক ছিল না। বর্তমান যুদ্ধ সেই পুরোনো ফাটলগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কোথাও সম্পর্কের পুনর্মিলনের ছবি দেখা গেলেও পর্দার আড়ালে অবিশ্বাস ও প্রতিযোগিতা এখনো প্রবল।
এই বিভেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো প্রতিটি দেশের ঝুঁকি এক নয়। যেসব দেশ বিকল্প পাইপলাইন বা অন্য রপ্তানি পথ ব্যবহার করতে পারে, তাদের উদ্বেগের ধরন আলাদা। অন্যদিকে যেসব দেশের অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল, তাদের কাছে যুদ্ধের অবসানই প্রধান অগ্রাধিকার। ফলে কেউ ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে আগ্রহী, আবার কেউ দ্রুত উত্তেজনা কমিয়ে বাণিজ্যিক নৌপথ সচল রাখাকেই সবচেয়ে জরুরি মনে করছে।
সংকটের আরেকটি দিক হলো নিরাপত্তা নির্ভরতার প্রশ্ন। বহু বছর ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে নিজেদের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখেছে। কিন্তু বর্তমান সংঘাত তাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—ওয়াশিংটনের কৌশল কি সব সময় তাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ? যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের ফলে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি যখন সরাসরি তাদের ভূখণ্ডে এসে পড়ছে, তখন এই নির্ভরতার সীমাবদ্ধতাও সামনে চলে এসেছে।
একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর ভিন্নধর্মী কূটনৈতিক আচরণ ঐক্যের সংকটকে আরও প্রকট করেছে। কেউ মধ্যস্থতার পথ খুঁজেছে, কেউ সামরিক প্রতিরোধে জোর দিয়েছে, আবার কেউ দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর করেছে। এসব অবস্থান প্রমাণ করে যে জিসিসি একটি অভিন্ন কৌশলগত ব্লকের চেয়ে অনেক বেশি একটি শিথিল সমন্বয় কাঠামো, যেখানে জাতীয় স্বার্থই শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণের প্রধান চালিকাশক্তি।

তবে এই মতপার্থক্য কেবল বর্তমান যুদ্ধের ফল নয়। ইয়েমেন, সুদান কিংবা কাতারকে ঘিরে অতীতের বিরোধগুলো কখনো পুরোপুরি মীমাংসা হয়নি। ফলে নতুন সংকট দেখা দিলে সেই পুরোনো অবিশ্বাস আবারও ফিরে আসে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহও তত বাড়ে—কে কার সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করছে, কে নিজের নিরাপত্তার জন্য অন্যকে ঝুঁকিতে ফেলছে, কিংবা কে ইরানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক বজায় রাখছে যা প্রতিবেশীদের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে কূটনৈতিক উদ্যোগ। একটি বিভক্ত আঞ্চলিক জোট যুদ্ধ থামানোর মতো রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে না। বরং তারা সংঘাতের ফলাফল সামাল দেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়। যুদ্ধবিরতি, নৌপথের নিরাপত্তা কিংবা ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বয়ের অভাব তাদের অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
এর মধ্যেই আরেকটি পরিবর্তন লক্ষণীয়। উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে শুরু করেছে যে হরমুজ প্রণালির ওপর একক নির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি। তাই বিকল্প পাইপলাইন, নতুন বন্দর এবং ভিন্ন রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকলে এসব বিনিয়োগও নিরাপদ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ অবকাঠামো নির্মাণ কৌশলগত বিকল্প তৈরি করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না।
সবশেষে এই সংকট একটি মৌলিক শিক্ষা সামনে আনে। কোনো অঞ্চলের দেশগুলো একই বিপদের মুখোমুখি হলেই তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক কণ্ঠে কথা বলবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জ্বালানি এবং কূটনীতির হিসাব প্রতিটি রাজধানীতে আলাদা। তাই যুদ্ধের চাপ যতই বাড়ুক, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রকৃত ঐক্য গড়ে উঠবে কি না, তা নির্ভর করবে তাদের পারস্পরিক অবিশ্বাস কমানোর ওপর, শুধু অভিন্ন শত্রুর উপস্থিতির ওপর নয়। বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত এটুকু স্পষ্ট করেছে যে, শান্তির আকাঙ্ক্ষা সবার এক হলেও শান্তির পথ নিয়ে তাদের ঐকমত্য এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য।
দানিয়েলা চেসলো 



















