০৭:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ কি মানুষকেই বেছে নেবে?

প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নতুন কোনো উদ্ভাবন কেবল অর্থনীতি বা উৎপাদন ব্যবস্থাকে বদলে দেয় না; মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাকেও পাল্টে দিতে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই ধরনের এক প্রযুক্তি। আমরা এখন এমন এক যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রশ্নটি শুধু এআই কত শক্তিশালী হবে তা নয়; বরং মানুষ কতটা মানবিক থাকতে পারবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গত কয়েক দশকে প্রযুক্তি আমাদের জীবনে অভূতপূর্ব সুবিধা এনে দিয়েছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু এই সংযোগের মধ্যেই এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাও জন্ম নিয়েছে। আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক ক্ষেত্রে কম সম্পর্কিত। মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

এআই এই প্রবণতাকে আরও গভীর করতে পারে। কারণ এটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং এমন এক ব্যবস্থা, যা মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করতে পারে, স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এবং এক ধরনের সঙ্গীর ভূমিকাও পালন করতে পারে। এখানেই এর শক্তি এবং ঝুঁকি—দুটোই নিহিত।

টেলিভিশন মানুষের মনোযোগ দখল করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু এআই মানুষের আবেগ, সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করতে সক্ষম। এটি ধৈর্যশীল, সব সময় উপস্থিত এবং কোনো মানবিক দাবি ছাড়াই মানুষের কথা শুনতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে, মানুষ কি ধীরে ধীরে অন্য মানুষের বদলে প্রযুক্তির ওপর আবেগগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠবে?

এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। অনেকেই যুক্তি দেন, এআই কখনোই মানুষের মতো চেতনাসম্পন্ন হবে না, তার আত্মা থাকবে না, তাই মানুষ সহজেই পার্থক্য বুঝতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা হয়তো আরও জটিল। মানুষের অনুভূতি ও আচরণের বিপুল তথ্যভান্ডারের ওপর প্রশিক্ষিত এআই এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যা অনেকের কাছে মানবিক বলেই মনে হবে। প্রশ্ন তখন প্রযুক্তির প্রকৃতি নিয়ে নয়; বরং মানুষের উপলব্ধি নিয়ে।

গণতন্ত্র, সমাজ এবং সভ্যতা মূলত মানুষের পারস্পরিক উপস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি সমাজ টিকে থাকে তখনই, যখন নাগরিকেরা একে অপরকে দেখে, শোনে, বোঝে এবং একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সামাজিক আস্থা এবং নাগরিক দায়বদ্ধতা—এসবই বাস্তব মানবিক সম্পর্কের ফল। যদি মানুষের অভিজ্ঞতার বড় অংশ ভার্চুয়াল পরিসরে স্থানান্তরিত হয়, তবে গণতন্ত্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা মানুষকে নিরাপত্তা দিয়েছিল বটে, কিন্তু একই সঙ্গে দেখিয়েছিল যে সামাজিক বন্ধন কেবল একটি বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। মানুষ একা থাকার জন্য তৈরি নয়। পরিবার, প্রতিবেশ, বন্ধু, সহকর্মী—এই সম্পর্কগুলোই ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের ভিত্তি।

এ কারণেই আগামী দশকগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং তার সঙ্গে সহাবস্থানের একটি মানবিক পথ খুঁজে বের করা। এআই আমাদের কাজকে সহজ করবে, নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে এবং জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে। কিন্তু সেটি যেন মানুষের বিকল্প না হয়ে ওঠে, বরং মানুষের সক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করার উপায় হয়—সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে মূল কাজ।

ভবিষ্যতের পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তব মানবিক সংযোগ। মানুষের পাশে মানুষ থাকা, একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, সংকটে সহায়তা করা, মতবিনিময় করা এবং একটি অভিন্ন সামাজিক জীবনের অংশ হওয়া—এসবের কোনো ডিজিটাল বিকল্প নেই।

এআই বিপ্লবের প্রকৃত পরীক্ষাও সম্ভবত এখানেই। প্রশ্নটি প্রযুক্তি কত দূর যেতে পারে তা নয়; বরং মানুষ কতটা সচেতনভাবে বাস্তব মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন এবং যৌথ নাগরিক জীবনের মূল্য ধরে রাখতে পারে। ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত যন্ত্রের নয়, মানুষের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে। আর সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ কি মানুষকেই বেছে নেবে?

০৬:৩৯:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নতুন কোনো উদ্ভাবন কেবল অর্থনীতি বা উৎপাদন ব্যবস্থাকে বদলে দেয় না; মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাকেও পাল্টে দিতে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই ধরনের এক প্রযুক্তি। আমরা এখন এমন এক যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রশ্নটি শুধু এআই কত শক্তিশালী হবে তা নয়; বরং মানুষ কতটা মানবিক থাকতে পারবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গত কয়েক দশকে প্রযুক্তি আমাদের জীবনে অভূতপূর্ব সুবিধা এনে দিয়েছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু এই সংযোগের মধ্যেই এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাও জন্ম নিয়েছে। আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক ক্ষেত্রে কম সম্পর্কিত। মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

এআই এই প্রবণতাকে আরও গভীর করতে পারে। কারণ এটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং এমন এক ব্যবস্থা, যা মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করতে পারে, স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এবং এক ধরনের সঙ্গীর ভূমিকাও পালন করতে পারে। এখানেই এর শক্তি এবং ঝুঁকি—দুটোই নিহিত।

টেলিভিশন মানুষের মনোযোগ দখল করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু এআই মানুষের আবেগ, সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করতে সক্ষম। এটি ধৈর্যশীল, সব সময় উপস্থিত এবং কোনো মানবিক দাবি ছাড়াই মানুষের কথা শুনতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে, মানুষ কি ধীরে ধীরে অন্য মানুষের বদলে প্রযুক্তির ওপর আবেগগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠবে?

এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। অনেকেই যুক্তি দেন, এআই কখনোই মানুষের মতো চেতনাসম্পন্ন হবে না, তার আত্মা থাকবে না, তাই মানুষ সহজেই পার্থক্য বুঝতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা হয়তো আরও জটিল। মানুষের অনুভূতি ও আচরণের বিপুল তথ্যভান্ডারের ওপর প্রশিক্ষিত এআই এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যা অনেকের কাছে মানবিক বলেই মনে হবে। প্রশ্ন তখন প্রযুক্তির প্রকৃতি নিয়ে নয়; বরং মানুষের উপলব্ধি নিয়ে।

গণতন্ত্র, সমাজ এবং সভ্যতা মূলত মানুষের পারস্পরিক উপস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি সমাজ টিকে থাকে তখনই, যখন নাগরিকেরা একে অপরকে দেখে, শোনে, বোঝে এবং একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সামাজিক আস্থা এবং নাগরিক দায়বদ্ধতা—এসবই বাস্তব মানবিক সম্পর্কের ফল। যদি মানুষের অভিজ্ঞতার বড় অংশ ভার্চুয়াল পরিসরে স্থানান্তরিত হয়, তবে গণতন্ত্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা মানুষকে নিরাপত্তা দিয়েছিল বটে, কিন্তু একই সঙ্গে দেখিয়েছিল যে সামাজিক বন্ধন কেবল একটি বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। মানুষ একা থাকার জন্য তৈরি নয়। পরিবার, প্রতিবেশ, বন্ধু, সহকর্মী—এই সম্পর্কগুলোই ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের ভিত্তি।

এ কারণেই আগামী দশকগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং তার সঙ্গে সহাবস্থানের একটি মানবিক পথ খুঁজে বের করা। এআই আমাদের কাজকে সহজ করবে, নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে এবং জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে। কিন্তু সেটি যেন মানুষের বিকল্প না হয়ে ওঠে, বরং মানুষের সক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করার উপায় হয়—সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে মূল কাজ।

ভবিষ্যতের পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তব মানবিক সংযোগ। মানুষের পাশে মানুষ থাকা, একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, সংকটে সহায়তা করা, মতবিনিময় করা এবং একটি অভিন্ন সামাজিক জীবনের অংশ হওয়া—এসবের কোনো ডিজিটাল বিকল্প নেই।

এআই বিপ্লবের প্রকৃত পরীক্ষাও সম্ভবত এখানেই। প্রশ্নটি প্রযুক্তি কত দূর যেতে পারে তা নয়; বরং মানুষ কতটা সচেতনভাবে বাস্তব মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন এবং যৌথ নাগরিক জীবনের মূল্য ধরে রাখতে পারে। ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত যন্ত্রের নয়, মানুষের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে। আর সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকেই।