০৮:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

চীনের আফ্রিকা কৌশল: বাণিজ্যের আড়ালে নতুন ভূরাজনৈতিক মানচিত্র

আফ্রিকাকে ঘিরে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রতিযোগিতার ধরন বদলেছে। সামরিক জোট, কূটনৈতিক বিবৃতি বা উন্নয়ন সহায়তার বদলে এখন মূল লড়াই হচ্ছে বাজার, অবকাঠামো, খনিজ সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে। এই প্রতিযোগিতায় চীন অনেক দূর এগিয়ে গেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এখনও নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টায় ব্যস্ত। জাপানও আফ্রিকায় তার পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে সক্রিয় করতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আফ্রিকার বড় অংশ এখন চীনের অর্থনৈতিক বলয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

চীন সম্প্রতি আফ্রিকার প্রায় সব দেশের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ঘোষণা করেছে। কেবল তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা এসওয়াতিনিকে এই সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট। যখন যুক্তরাষ্ট্র নতুন বাণিজ্য বাধা তৈরি করছে এবং আফ্রিকাকে নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত নীতি অনুসরণ করছে, তখন চীন নিজেকে আফ্রিকার নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে।

গত দুই দশকে চীন-আফ্রিকা বাণিজ্য যে হারে বেড়েছে, তা কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্কের গল্প নয়; এটি ক্ষমতার নতুন বিন্যাসেরও ইঙ্গিত। আফ্রিকার দেশগুলো এখন কেবল কাঁচামালের উৎস নয়, ভবিষ্যতের বাজার, কৌশলগত মিত্র এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ভোটব্যাংক। জাতিসংঘে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের উপস্থিতি যে কোনো বৈশ্বিক শক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন এই বাস্তবতাকে খুব দ্রুত বুঝেছে।

বাংলাদেশ-পাকিস্তানের বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন, আমদানি-রপ্তানি হয় কী পণ্য?

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের বহু ঘোষণা এলেও বাস্তবে ওয়াশিংটনের নীতিতে ধারাবাহিকতা নেই। একদিকে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে নতুন আমদানি শুল্ক—এই দ্বৈত অবস্থান আফ্রিকার অনেক দেশকে বিভ্রান্ত করেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অবজ্ঞা ও অভিবাসনকেন্দ্রিক চাপ। ফলে আফ্রিকার বহু দেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা এখন আর আগের মতো গ্রহণযোগ্য নয়।

চীনের সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ অবকাঠামো বিনিয়োগ। আফ্রিকার অর্থনীতির প্রধান দুর্বলতা পরিবহন, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে দীর্ঘদিনের ঘাটতি। চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে। রেললাইন, বন্দর, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র—সবখানেই চীনা অর্থ ও প্রযুক্তির উপস্থিতি দৃশ্যমান। এতে আফ্রিকার বহু দেশ দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছে।

তবে এই সম্পর্ক পুরোপুরি ভারসাম্যপূর্ণ নয়। আফ্রিকা মূলত কাঁচামাল রপ্তানি করছে, আর চীন তৈরি পণ্য বিক্রি করছে। ফলে আফ্রিকার বড় বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে আফ্রিকার শিল্পায়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কারণ স্থানীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ার বদলে অর্থনীতি আবারও কাঁচামালনির্ভর হয়ে পড়ছে।

বেইজিং পারমাণবিক আলোচনায় যোগ দিবে না: চীন | | বাংলাদেশ প্রতিদিন

চীন অবশ্য বলছে, তারা শুধু পণ্য কেনাবেচা নয়, পূর্ণ শিল্পশৃঙ্খল গড়ে তুলতে চায়। অর্থাৎ উৎপাদন, প্রযুক্তি, পরিবহন ও বাজার—সবকিছুকে একসঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। সমালোচকদের মতে, এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য। আফ্রিকার অর্থনীতিকে চীনা কাঠামোর সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা, যাতে পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতায় জাপান ও ইউরোপের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। জাপান বহু আগে থেকেই আফ্রিকায় উন্নয়ন সহযোগিতা চালিয়ে আসছে, কিন্তু বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও চীনের তুলনায় খুবই কম। ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও আফ্রিকার সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে, কিন্তু রাজনৈতিক বার্তা ও দৃশ্যমান উপস্থিতির ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে।

সব মিলিয়ে আফ্রিকা এখন কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি অঞ্চল নয়; এটি ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। যার হাতে থাকবে আফ্রিকার বাজার, সম্পদ ও রাজনৈতিক আস্থা, আগামী দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তার প্রভাব বাড়বে। চীন এই লড়াইয়ে এগিয়ে আছে। প্রশ্ন হলো, অন্য শক্তিগুলো কি সময় থাকতে নিজেদের কৌশল বদলাতে পারবে?

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

চীনের আফ্রিকা কৌশল: বাণিজ্যের আড়ালে নতুন ভূরাজনৈতিক মানচিত্র

০১:১৯:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

আফ্রিকাকে ঘিরে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রতিযোগিতার ধরন বদলেছে। সামরিক জোট, কূটনৈতিক বিবৃতি বা উন্নয়ন সহায়তার বদলে এখন মূল লড়াই হচ্ছে বাজার, অবকাঠামো, খনিজ সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে। এই প্রতিযোগিতায় চীন অনেক দূর এগিয়ে গেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এখনও নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টায় ব্যস্ত। জাপানও আফ্রিকায় তার পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে সক্রিয় করতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আফ্রিকার বড় অংশ এখন চীনের অর্থনৈতিক বলয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

চীন সম্প্রতি আফ্রিকার প্রায় সব দেশের জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ঘোষণা করেছে। কেবল তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা এসওয়াতিনিকে এই সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট। যখন যুক্তরাষ্ট্র নতুন বাণিজ্য বাধা তৈরি করছে এবং আফ্রিকাকে নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত নীতি অনুসরণ করছে, তখন চীন নিজেকে আফ্রিকার নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে।

গত দুই দশকে চীন-আফ্রিকা বাণিজ্য যে হারে বেড়েছে, তা কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্কের গল্প নয়; এটি ক্ষমতার নতুন বিন্যাসেরও ইঙ্গিত। আফ্রিকার দেশগুলো এখন কেবল কাঁচামালের উৎস নয়, ভবিষ্যতের বাজার, কৌশলগত মিত্র এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ভোটব্যাংক। জাতিসংঘে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের উপস্থিতি যে কোনো বৈশ্বিক শক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন এই বাস্তবতাকে খুব দ্রুত বুঝেছে।

বাংলাদেশ-পাকিস্তানের বাণিজ্য সম্পর্ক কেমন, আমদানি-রপ্তানি হয় কী পণ্য?

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের বহু ঘোষণা এলেও বাস্তবে ওয়াশিংটনের নীতিতে ধারাবাহিকতা নেই। একদিকে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে নতুন আমদানি শুল্ক—এই দ্বৈত অবস্থান আফ্রিকার অনেক দেশকে বিভ্রান্ত করেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অবজ্ঞা ও অভিবাসনকেন্দ্রিক চাপ। ফলে আফ্রিকার বহু দেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা এখন আর আগের মতো গ্রহণযোগ্য নয়।

চীনের সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ অবকাঠামো বিনিয়োগ। আফ্রিকার অর্থনীতির প্রধান দুর্বলতা পরিবহন, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে দীর্ঘদিনের ঘাটতি। চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে। রেললাইন, বন্দর, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র—সবখানেই চীনা অর্থ ও প্রযুক্তির উপস্থিতি দৃশ্যমান। এতে আফ্রিকার বহু দেশ দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছে।

তবে এই সম্পর্ক পুরোপুরি ভারসাম্যপূর্ণ নয়। আফ্রিকা মূলত কাঁচামাল রপ্তানি করছে, আর চীন তৈরি পণ্য বিক্রি করছে। ফলে আফ্রিকার বড় বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে আফ্রিকার শিল্পায়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কারণ স্থানীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ার বদলে অর্থনীতি আবারও কাঁচামালনির্ভর হয়ে পড়ছে।

বেইজিং পারমাণবিক আলোচনায় যোগ দিবে না: চীন | | বাংলাদেশ প্রতিদিন

চীন অবশ্য বলছে, তারা শুধু পণ্য কেনাবেচা নয়, পূর্ণ শিল্পশৃঙ্খল গড়ে তুলতে চায়। অর্থাৎ উৎপাদন, প্রযুক্তি, পরিবহন ও বাজার—সবকিছুকে একসঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। সমালোচকদের মতে, এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য। আফ্রিকার অর্থনীতিকে চীনা কাঠামোর সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা, যাতে পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতায় জাপান ও ইউরোপের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। জাপান বহু আগে থেকেই আফ্রিকায় উন্নয়ন সহযোগিতা চালিয়ে আসছে, কিন্তু বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও চীনের তুলনায় খুবই কম। ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও আফ্রিকার সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে, কিন্তু রাজনৈতিক বার্তা ও দৃশ্যমান উপস্থিতির ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে।

সব মিলিয়ে আফ্রিকা এখন কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি অঞ্চল নয়; এটি ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। যার হাতে থাকবে আফ্রিকার বাজার, সম্পদ ও রাজনৈতিক আস্থা, আগামী দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তার প্রভাব বাড়বে। চীন এই লড়াইয়ে এগিয়ে আছে। প্রশ্ন হলো, অন্য শক্তিগুলো কি সময় থাকতে নিজেদের কৌশল বদলাতে পারবে?