০৯:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

চীনের মেদোগ বাঁধের পাল্টা উদ্যোগে ভারতের বিশাল প্রকল্প

  • Sarakhon Report
  • ০১:৪৭:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৫
  • 114

ভারত এবং চীন উভয়ই ব্রহ্মপুত্র নদে বিশাল বাঁধ নির্মাণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রতিযোগিতা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার কারণে নয়, বরং দুই দেশের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিফলনও বটে। তবে নদীর প্রবাহ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে পরিবেশগত ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

চীনের মেদোগ প্রকল্প ও ভারতের প্রতিক্রিয়া

চীন তিব্বতে ইয়ারলুং স্যাংপো নদীর ওপর ৬০ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মেদোগ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ শুরু করেছে। এর পাল্টা জবাবে ভারত ঘোষণা করেছে ১১.২ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন “আপার সিয়াং মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট” (ইউএসএমপি), যার সম্ভাব্য খরচ প্রায় ১৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতের দাবি, এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সাহায্য করবে না, বরং চীনের বাঁধ থেকে উদ্ভূত হুমকি মোকাবিলায় কৌশলগত ঢাল হিসেবেও কাজ করবে।

স্থানীয়দের জীবন ও বিরোধিতা

অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং উপত্যকায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষিজীবী মানুষ যেমন তাবেং সিরাম—ধান, কমলা, এলাচ ও আদা চাষ করে আসছেন। কিন্তু ইউএসএমপি বাঁধ বাস্তবায়িত হলে তাঁদের জমি ও বাড়িঘর পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে।

স্থানীয়রা বলছেন, তাঁদের জীবন, সংস্কৃতি ও কৃষি সিয়াং নদীর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদীকে তারা “আনে” বা “মা” নামে ডাকে। তাই ২৭টি গ্রাম ডুবে যাওয়া এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় তারা এই প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করছে।

আন্দোলন ও প্রতিরোধ

২০ জুলাই গেকুতে সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরামের (এসআইএফএফ) উদ্যোগে কয়েক হাজার মানুষ একত্রিত হয়ে বিশাল প্রতিবাদ সভা করে। তারা প্রস্তাবিত বাঁধ বাতিল এবং মোতায়েন করা কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানায়। সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে সিয়াং নদীকে “পবিত্র নদী” হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়।

পরিবেশ ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি

এই অঞ্চলটি জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ও ভূমিকম্পপ্রবণ। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের অভিযানে এখানে ১,৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এত বড় বাঁধ নির্মাণ হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়তে পারে। ইতিহাসও তা প্রমাণ করে—১৯৫০ সালে অসম-তিব্বত অঞ্চলে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৪,৮০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

ভূরাজনীতি ও নদীর কূটনীতি

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাকে এখন ভারত ও চীন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০২৩ সালের জুন থেকে দুই দেশের মধ্যে জলতাত্ত্বিক তথ্য বিনিময়ের চুক্তি স্থগিত রয়েছে। সীমান্ত বিরোধও এই উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

একই সঙ্গে ছোট-বড় বহু বাঁধ পরিকল্পনা বা নির্মাণাধীন, যা পুরো অঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

দিল্লির ইনস্টিটিউট অব চাইনিজ স্টাডিজের সহযোগী ফেলো ড. মির্জা জুলফিকার রহমানের মতে, এই বাঁধ প্রতিযোগিতা বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে বরং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রদর্শন। তাঁর মতে, ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ ও মধ্যবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে পরিবেশভিত্তিক আঞ্চলিক বোঝাপড়ায় নেতৃত্ব নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি।

এদিকে দক্ষিণ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপলের সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাক্কারের মতে, চীনের প্রকল্প সম্পর্কে ভারতের কাছে যথাযথ তথ্য নেই। তিনি বলেন, যতক্ষণ না মেদোগ বাঁধের মূল বৈশিষ্ট্য জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ এর সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে অনুমান করা ভুল হবে।

চীনের মেদোগ ও ভারতের ইউএসএমপি—দুই প্রকল্পই ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, জীবিকা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, তাড়াহুড়ো করে প্রতিক্রিয়ামূলক কৌশল নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। তাই আন্তর্জাতিক আইন মেনে চীনকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে বাধ্য করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার পথে অগ্রসর হওয়াই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

চীনের মেদোগ বাঁধের পাল্টা উদ্যোগে ভারতের বিশাল প্রকল্প

০১:৪৭:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৫

ভারত এবং চীন উভয়ই ব্রহ্মপুত্র নদে বিশাল বাঁধ নির্মাণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রতিযোগিতা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার কারণে নয়, বরং দুই দেশের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিফলনও বটে। তবে নদীর প্রবাহ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে পরিবেশগত ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

চীনের মেদোগ প্রকল্প ও ভারতের প্রতিক্রিয়া

চীন তিব্বতে ইয়ারলুং স্যাংপো নদীর ওপর ৬০ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মেদোগ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ শুরু করেছে। এর পাল্টা জবাবে ভারত ঘোষণা করেছে ১১.২ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন “আপার সিয়াং মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট” (ইউএসএমপি), যার সম্ভাব্য খরচ প্রায় ১৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতের দাবি, এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সাহায্য করবে না, বরং চীনের বাঁধ থেকে উদ্ভূত হুমকি মোকাবিলায় কৌশলগত ঢাল হিসেবেও কাজ করবে।

স্থানীয়দের জীবন ও বিরোধিতা

অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং উপত্যকায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষিজীবী মানুষ যেমন তাবেং সিরাম—ধান, কমলা, এলাচ ও আদা চাষ করে আসছেন। কিন্তু ইউএসএমপি বাঁধ বাস্তবায়িত হলে তাঁদের জমি ও বাড়িঘর পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে।

স্থানীয়রা বলছেন, তাঁদের জীবন, সংস্কৃতি ও কৃষি সিয়াং নদীর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদীকে তারা “আনে” বা “মা” নামে ডাকে। তাই ২৭টি গ্রাম ডুবে যাওয়া এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় তারা এই প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করছে।

আন্দোলন ও প্রতিরোধ

২০ জুলাই গেকুতে সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরামের (এসআইএফএফ) উদ্যোগে কয়েক হাজার মানুষ একত্রিত হয়ে বিশাল প্রতিবাদ সভা করে। তারা প্রস্তাবিত বাঁধ বাতিল এবং মোতায়েন করা কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানায়। সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে সিয়াং নদীকে “পবিত্র নদী” হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়।

পরিবেশ ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি

এই অঞ্চলটি জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ও ভূমিকম্পপ্রবণ। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের অভিযানে এখানে ১,৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এত বড় বাঁধ নির্মাণ হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়তে পারে। ইতিহাসও তা প্রমাণ করে—১৯৫০ সালে অসম-তিব্বত অঞ্চলে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৪,৮০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

ভূরাজনীতি ও নদীর কূটনীতি

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাকে এখন ভারত ও চীন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০২৩ সালের জুন থেকে দুই দেশের মধ্যে জলতাত্ত্বিক তথ্য বিনিময়ের চুক্তি স্থগিত রয়েছে। সীমান্ত বিরোধও এই উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

একই সঙ্গে ছোট-বড় বহু বাঁধ পরিকল্পনা বা নির্মাণাধীন, যা পুরো অঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

দিল্লির ইনস্টিটিউট অব চাইনিজ স্টাডিজের সহযোগী ফেলো ড. মির্জা জুলফিকার রহমানের মতে, এই বাঁধ প্রতিযোগিতা বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে বরং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রদর্শন। তাঁর মতে, ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ ও মধ্যবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে পরিবেশভিত্তিক আঞ্চলিক বোঝাপড়ায় নেতৃত্ব নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি।

এদিকে দক্ষিণ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপলের সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাক্কারের মতে, চীনের প্রকল্প সম্পর্কে ভারতের কাছে যথাযথ তথ্য নেই। তিনি বলেন, যতক্ষণ না মেদোগ বাঁধের মূল বৈশিষ্ট্য জানা যাচ্ছে, ততক্ষণ এর সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে অনুমান করা ভুল হবে।

চীনের মেদোগ ও ভারতের ইউএসএমপি—দুই প্রকল্পই ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, জীবিকা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, তাড়াহুড়ো করে প্রতিক্রিয়ামূলক কৌশল নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। তাই আন্তর্জাতিক আইন মেনে চীনকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে বাধ্য করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার পথে অগ্রসর হওয়াই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি।