জাপানের মুদ্রা ইয়েনের টানা দরপতন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ইয়েন কেনার বাজার হস্তক্ষেপ করেছে জাপান। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় সোমবার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও এমন যৌথ পদক্ষেপ নিতে তারা দ্বিধা করবে না।
চল্লিশ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে যাওয়া ইয়েনকে সামাল দিতে নেওয়া এই পদক্ষেপকে জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের বিরল আর্থিক সমন্বয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েন ও জাপানি সরকারি বন্ডের ব্যাপক বিক্রি বৈশ্বিক বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের সুদহার আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০১১ সালের পর প্রথম যৌথ হস্তক্ষেপ
জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ইয়েন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েনের বাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খল ওঠানামা ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
২০১১ সালে জাপানে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ইয়েনের দর নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সমন্বিত পদক্ষেপের পর এবারই প্রথম জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এর আগে বলেছিলেন, বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে ইয়েনের দর ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
হস্তক্ষেপের পর দ্রুত শক্তিশালী ইয়েন

যৌথ হস্তক্ষেপের খবর প্রকাশের পর ইয়েনের মূল্য ডলারের বিপরীতে এক শতাংশের বেশি বেড়ে ১৫৫ দশমিক ২০-তে উঠেছে। মে মাসের শুরুর পর এটিই ছিল ইয়েনের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান।
এর আগে গত মাসে ইয়েন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৬৪-এ নেমে যায়, যা প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়।
জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রয়োজন হলে আরও সমন্বিত বাজার হস্তক্ষেপ করা হবে। তবে সোমবারও নতুন করে জাপান বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
সুদহার বাড়ানোর চাপ বাড়ছে
ইয়েনের দুর্বলতা সামাল দিতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরও সুদহার বাড়ানোর চাপ বাড়ছে। ব্যাংক অব জাপান গত সপ্তাহে সুদহার অপরিবর্তিত রাখলেও সেপ্টেম্বরে পরবর্তী বৈঠকে সুদহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
জাপানের শীর্ষ মুদ্রা কর্মকর্তা আতসুশি মিমুরা বলেছেন, মুদ্রানীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পরিচালনা করা হবে।
অন্যদিকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও বলেছেন, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও যৌথ হস্তক্ষেপে অংশ নিতে প্রস্তুত। তিনি ইয়েনের অতিরিক্ত অবমূল্যায়ন সংশোধনে জাপানের পদক্ষেপকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন এবং জাপানের সুদহার আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব বক্তব্য সেপ্টেম্বরেই জাপানের সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা আরও জোরালো করেছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যে সরকারি বন্ডের বাজারেও দেখা গেছে। দুই বছরের জাপানি সরকারি বন্ডের সুদহার সাময়িকভাবে ১ দশমিক ৫৪৫ শতাংশে উঠে যায়, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ।
ডলারের তারল্য নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা
ইয়েনের দরপতন ঠেকাতে শুধু মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ নয়, ডলারের তারল্য নিশ্চিত করার বিষয়েও জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সমন্বয় বাড়ছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী মাসগুলোতে ফেডারেল রিজার্ভের পুনঃক্রয় সুবিধার আওতা বাড়ানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনা করতে পারে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জাপান প্রয়োজনের সময় ডলারের তারল্য পেতে পারে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে এই সুবিধা চালু করা হয়েছিল। এর ফলে জাপান সরাসরি মার্কিন সরকারি বন্ড বিক্রি না করেও প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহ করতে পারে। এতে মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপের সময় জাপানের অর্থায়নের চাপ কিছুটা কমতে পারে।
শুধু বাজারে হস্তক্ষেপেই কি ইয়েন শক্তিশালী হবে?
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, যৌথ হস্তক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রভাব বড় হলেও ইয়েনের দুর্বলতার মূল কারণগুলো এখনো দূর হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বাড়া জাপানের আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সুদহারের পার্থক্যও এখনো বড়। ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলার তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় থাকছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জাপান এককভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ায় এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনেক বেশি। কিন্তু ইয়েনের দরপতনের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদে ইয়েনের একমুখী শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সীমিত।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই যৌথ পদক্ষেপ শুধু ইয়েনের দর রক্ষার উদ্যোগ নয়, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার প্রচেষ্টারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইয়েনের বড় ধরনের পতন জাপানে আমদানি মূল্য ও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে জাপানি পরিবারের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জাপানি সরকারি বন্ডের বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক বন্ড বাজারেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই ইয়েনকে স্থিতিশীল রাখতে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















