০৬:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পলের প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোন ডুও বাজারে এলো ভারত ও চীনে কম খরচে হাজার হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগ, নতুন চ্যালেঞ্জ মার্কিন অস্ত্রশিল্পে ছোট নৌকার বিক্ষোভ নয়, আসল সংকট ব্রিটেনের ভেঙে পড়া অভিবাসন ব্যবস্থা ইউরোপে আবাসন সংকট, এয়ারবিএনবির ওপর আরও কড়াকড়ির প্রস্তাব অর্থের বিনিময়ে প্রচার, অথচ বিজ্ঞাপনের পরিচয় গোপন রাখতে বলছে ব্র্যান্ড ৯/১১-এর পর যে পথে বদলে গেল বিশ্বব্যবস্থা এআইকে নিজের গোপন ভাবনা দিলে সেটাই কি একদিন আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে? নাটোরে দিনে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, কমেছে আয়: বিপাকে শ্রমজীবী মানুষ গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দিতে হাইকোর্টের নির্দেশ ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ যাচ্ছে না, আমন্ত্রণ পাননি প্রধানমন্ত্রী: হুমায়ুন কবির

জ্বর-কাশি ও শ্বাসকষ্টের ১৩ শতাংশ রোগীই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত

বাংলাদেশে সাধারণ জ্বর, কাশি কিংবা তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ১৩ শতাংশই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। গত ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দেশে পাখির ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর উপস্থিতিও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

২০০৭ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ যৌথভাবে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে। এ কাজে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সহায়তা করছে। মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে দুই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

সেমিনারে চার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতাল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। গবেষক ও বিজ্ঞানীদের বড় একটি অংশ বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে। তাই বাংলাদেশে মার্চ মাসে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি তাহমীদ আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের যৌথ ইনফ্লুয়েঞ্জা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগ বিশ্বের রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও সহায়তা করছে।

তিনি বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধের একটি উপায় হলো টিকা নেওয়া। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মুখে মাস্ক ব্যবহার এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

২০ বছর ধরে যেভাবে চলছে পর্যবেক্ষণ

সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগী অধ্যাপক মনালিসা। তিনি ইনফ্লুয়েঞ্জা পর্যবেক্ষণের পটভূমি, পদ্ধতি, গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন।

তিনি জানান, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮০ জন মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জায় ১৬ হাজার ৮০৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর মতে, ইনফ্লুয়েঞ্জা দেশের অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশ্বের ১৩৮টি দেশে মোট ১৫৭টি জাতীয় ইনফ্লুয়েঞ্জা কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানও এ ব্যবস্থার অংশ।

গত ২০ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ দেশের ১৫টি সরকারি হাসপাতাল ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের পর্যবেক্ষণ করে আসছে।

এই হাসপাতালগুলোর মধ্যে রয়েছে ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, জয়পুরহাট ও পটুয়াখালী জেলা হাসপাতাল। এ ছাড়া রয়েছে যশোর ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সিলেটের বেসরকারি জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এতে জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি কিংবা তাঁর সংস্পর্শের মাধ্যমে এই রোগ ছড়াতে পারে।

গত ২০ বছরে এসব হাসপাতালে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ বা তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে আসা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯২ জন রোগীকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। প্রত্যেক রোগীর নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ২২ হাজার ২৮৪ জনের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত হয়েছে, যা মোট রোগীর ১৩ শতাংশ।

৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। তবে এ রোগে মৃত্যুর হার বেশি ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে।

শীত নয়, বরং এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম

সাধারণভাবে মনে করা হয়, শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ বেশি হয়। তবে ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলছেন, এই ধারণা সঠিক নয়।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের সহযোগী বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী সেমিনারে বলেন, বাংলাদেশে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম থাকে। এর মধ্যে জুন ও জুলাই মাসে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

তিনি জানান, পাঁচটি শ্রেণির মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জায় তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁরা হলেন স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, একাধিক দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ।

মার্চে টিকা নেওয়ার পরামর্শ

সেমিনারে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। গবেষক ও অংশগ্রহণকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ পাঁচ শ্রেণির মানুষকে টিকার আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তবে দেশের সবাইকে প্রতিবছর টিকা দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে মতভেদ দেখা যায়।

কেউ কেউ বলেন, প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দেশের সব মানুষকে প্রতিবছর টিকা দিতে হলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা যুক্ত করা যৌক্তিক হবে না।

ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা কখন দেওয়া উচিত, সে বিষয়েও মত দেন ফাহমিদা চৌধুরী। তিনি বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম শুরুর এক মাস আগে টিকা দেওয়া উচিত। সেই হিসাবে মার্চ মাসেই বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়ার উপযুক্ত সময়।

দেশে বাড়ছে বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ

দেশে পাখির ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর সংক্রমণও বাড়ছে বলে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে। এ রোগের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষক ও বিজ্ঞানীরা।

বাংলাদেশে মানুষের শরীরে প্রথম বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয় ২০০৮ সালে। এরপর থেকে দেশে মোট ১৬ জনের শরীরে এই রোগ শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন পুরুষ এবং দুজন নারী। আক্রান্ত ১৬ জনের মধ্যে ১১ জনই শিশু ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, দেশে বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ বাড়ছে। ২০০৮ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে আটজনের শরীরে এ রোগ শনাক্ত হয়েছিল। এরপর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আরও আটজন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালে চারজন এবং ২০২৬ সালে চারজনের শরীরে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়।

মূলত পোলট্রি বা হাঁস-মুরগির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়ছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সতর্কতার আহ্বান

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন হাবিব বলেন, দেশের হাসপাতালগুলোতে ব্যাপকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক যুক্তিসংগতভাবে ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া কিংবা যথেচ্ছভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা কমাতে হবে।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি। এ ছাড়া বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা বিভাগের মহাপরিচালক সৈয়দা জেসমিন সুলতানা, ঢাকায় কর্মরত যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের কর্মকর্তা মনোয়ার মোর্শেদ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি চিকিৎসা কর্মকর্তা আইরিন ইসিবোর।

ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে সময়মতো টিকা গ্রহণ, নিয়মিত হাত ধোয়া, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনা গেলে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে তাঁরা মনে করেন।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

পলের প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোন ডুও বাজারে এলো ভারত ও চীনে

জ্বর-কাশি ও শ্বাসকষ্টের ১৩ শতাংশ রোগীই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত

০১:৫৫:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে সাধারণ জ্বর, কাশি কিংবা তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ১৩ শতাংশই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। গত ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দেশে পাখির ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর উপস্থিতিও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

২০০৭ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ যৌথভাবে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে। এ কাজে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সহায়তা করছে। মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে দুই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

সেমিনারে চার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতাল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। গবেষক ও বিজ্ঞানীদের বড় একটি অংশ বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে। তাই বাংলাদেশে মার্চ মাসে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি তাহমীদ আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের যৌথ ইনফ্লুয়েঞ্জা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগ বিশ্বের রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও সহায়তা করছে।

তিনি বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধের একটি উপায় হলো টিকা নেওয়া। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মুখে মাস্ক ব্যবহার এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

২০ বছর ধরে যেভাবে চলছে পর্যবেক্ষণ

সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগী অধ্যাপক মনালিসা। তিনি ইনফ্লুয়েঞ্জা পর্যবেক্ষণের পটভূমি, পদ্ধতি, গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন।

তিনি জানান, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮০ জন মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জায় ১৬ হাজার ৮০৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর মতে, ইনফ্লুয়েঞ্জা দেশের অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশ্বের ১৩৮টি দেশে মোট ১৫৭টি জাতীয় ইনফ্লুয়েঞ্জা কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানও এ ব্যবস্থার অংশ।

গত ২০ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ দেশের ১৫টি সরকারি হাসপাতাল ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের পর্যবেক্ষণ করে আসছে।

এই হাসপাতালগুলোর মধ্যে রয়েছে ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, জয়পুরহাট ও পটুয়াখালী জেলা হাসপাতাল। এ ছাড়া রয়েছে যশোর ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সিলেটের বেসরকারি জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এতে জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি কিংবা তাঁর সংস্পর্শের মাধ্যমে এই রোগ ছড়াতে পারে।

গত ২০ বছরে এসব হাসপাতালে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ বা তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে আসা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯২ জন রোগীকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। প্রত্যেক রোগীর নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ২২ হাজার ২৮৪ জনের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত হয়েছে, যা মোট রোগীর ১৩ শতাংশ।

৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। তবে এ রোগে মৃত্যুর হার বেশি ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে।

শীত নয়, বরং এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম

সাধারণভাবে মনে করা হয়, শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ বেশি হয়। তবে ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলছেন, এই ধারণা সঠিক নয়।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের সহযোগী বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী সেমিনারে বলেন, বাংলাদেশে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম থাকে। এর মধ্যে জুন ও জুলাই মাসে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

তিনি জানান, পাঁচটি শ্রেণির মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জায় তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁরা হলেন স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, একাধিক দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ।

মার্চে টিকা নেওয়ার পরামর্শ

সেমিনারে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। গবেষক ও অংশগ্রহণকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ পাঁচ শ্রেণির মানুষকে টিকার আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তবে দেশের সবাইকে প্রতিবছর টিকা দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে মতভেদ দেখা যায়।

কেউ কেউ বলেন, প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দেশের সব মানুষকে প্রতিবছর টিকা দিতে হলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা যুক্ত করা যৌক্তিক হবে না।

ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা কখন দেওয়া উচিত, সে বিষয়েও মত দেন ফাহমিদা চৌধুরী। তিনি বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম শুরুর এক মাস আগে টিকা দেওয়া উচিত। সেই হিসাবে মার্চ মাসেই বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়ার উপযুক্ত সময়।

দেশে বাড়ছে বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ

দেশে পাখির ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর সংক্রমণও বাড়ছে বলে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে। এ রোগের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষক ও বিজ্ঞানীরা।

বাংলাদেশে মানুষের শরীরে প্রথম বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয় ২০০৮ সালে। এরপর থেকে দেশে মোট ১৬ জনের শরীরে এই রোগ শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন পুরুষ এবং দুজন নারী। আক্রান্ত ১৬ জনের মধ্যে ১১ জনই শিশু ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, দেশে বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ বাড়ছে। ২০০৮ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে আটজনের শরীরে এ রোগ শনাক্ত হয়েছিল। এরপর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আরও আটজন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালে চারজন এবং ২০২৬ সালে চারজনের শরীরে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়।

মূলত পোলট্রি বা হাঁস-মুরগির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়ছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সতর্কতার আহ্বান

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও রাষ্ট্রীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন হাবিব বলেন, দেশের হাসপাতালগুলোতে ব্যাপকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক যুক্তিসংগতভাবে ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া কিংবা যথেচ্ছভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা কমাতে হবে।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি। এ ছাড়া বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা বিভাগের মহাপরিচালক সৈয়দা জেসমিন সুলতানা, ঢাকায় কর্মরত যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের কর্মকর্তা মনোয়ার মোর্শেদ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি চিকিৎসা কর্মকর্তা আইরিন ইসিবোর।

ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে সময়মতো টিকা গ্রহণ, নিয়মিত হাত ধোয়া, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনা গেলে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে তাঁরা মনে করেন।