ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতি যে বহুদিন ধরেই ব্যক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে, তা নতুন কোনো পর্যবেক্ষণ নয়। কিন্তু ডালাসে এই সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দলটির মধ্যবর্তী নির্বাচনী আয়োজন সেই প্রবণতাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে রিপাবলিকান পার্টি ও ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিচয়কে আলাদা করে দেখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
নামটি ছিল মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় সম্মেলন। কিন্তু আয়োজনের বড় অংশে দলীয় নীতি, প্রার্থী কিংবা সংগঠনের ভবিষ্যতের চেয়ে ট্রাম্পই ছিলেন মূল চরিত্র। এমনকি ভোটারদের প্রতি তাঁর আহ্বানও ছিল এমনভাবে, যেন আসন্ন নির্বাচনে তিনি নিজেই প্রার্থী।
এই আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাই শুধু এর রাজনৈতিক বার্তা নয়; বরং এর মাধ্যমে রিপাবলিকান পার্টি নিজেকে ট্রাম্পের সঙ্গে কতটা একীভূত করে ফেলেছে, সেটিই সামনে এসেছে।
দলের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছেন একজন মানুষ
সম্মেলনে ট্রাম্পকে নিয়ে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা রাজনৈতিক প্রশংসার প্রচলিত সীমা ছাড়িয়েছে। তাঁকে আমেরিকার পুনরুত্থানের নেতা থেকে শুরু করে দেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বলা হয়েছে। একটি প্রচারচিত্রে তাঁকে এমনকি ঈশ্বরের নির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই বয়ানের রাজনৈতিক কাঠামোও খুব পরিচিত। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে যুক্তরাষ্ট্র নাকি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ছিল; তাঁর নেতৃত্বে দেশ আবার সমৃদ্ধি ও শক্তির পথে ফিরেছে; এখন ডেমোক্র্যাটরা সেই সাফল্য নষ্ট করার হুমকি দিচ্ছে। তাই কংগ্রেসে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা মানে ট্রাম্পের অর্জন রক্ষা করা।
কিন্তু এই যুক্তির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। এখানে রিপাবলিকান পার্টি ও তার নেতাদের সম্মিলিত কর্মকাণ্ডের গল্প নেই। সাফল্যের কৃতিত্ব প্রায় সম্পূর্ণ একজন ব্যক্তির। ফলে দলের প্রার্থীদের ভোট দেওয়াও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের সমার্থক হয়ে উঠছে।

রাজনীতিতে ব্যক্তির এই মাত্রার আধিপত্য দলের জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে, কিন্তু এর বিপদও স্পষ্ট। কারণ নেতার জনপ্রিয়তা যখন বাড়ে, দলও লাভবান হয়; কিন্তু নেতার জনপ্রিয়তা যখন কমে যায়, তখন পুরো সংগঠন একই সংকটের মুখে পড়ে।
শুধু আনুগত্য নয়, নিয়ম ভাঙার ইঙ্গিতও
ডালাসের সম্মেলনে ট্রাম্পকে ঘিরে ব্যক্তিপূজার সবচেয়ে অস্বাভাবিক প্রকাশগুলোর একটি ছিল তাঁর নেতৃত্বে নিজের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেওয়ার ঘটনা। তিনি সমর্থকদের ভোট দিতে উৎসাহিত করার সময় প্রয়োজনে নিয়ম ভাঙার কথাও বলেন।
এ ধরনের ঘটনা মার্কিন মূলধারার দলীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত অস্বাভাবিক। রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী ও সমর্থকদের সাধারণত দল, আদর্শ বা সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের কথা বলা হয়। এখানে আনুগত্যের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে একজন ব্যক্তি।
এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন মঞ্চ-ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি রিপাবলিকান পার্টির বর্তমান রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—দলটি কি এখনও নিজস্ব নীতি ও প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক সংগঠন, নাকি ট্রাম্পকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের কঠিন বাস্তবতা
রিপাবলিকানদের এই কৌশলের পেছনে অবশ্য বাস্তব নির্বাচনী হিসাব রয়েছে। ট্রাম্পের এমন অনেক সমর্থক আছেন, যারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভোট দিতে আগ্রহী হলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ভোটকেন্দ্রে যান না। এই কম-সক্রিয় ভোটারদের আবার নির্বাচনী মাঠে নিয়ে আসাই ট্রাম্পকেন্দ্রিক প্রচারের অন্যতম লক্ষ্য।
কিন্তু সমস্যা হলো, রিপাবলিকানদের সামগ্রিক নির্বাচনী অবস্থান এখন দুর্বল। নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদন ৩০-এর ঘরে নেমে এসেছে। একই সময়ে দলীয় পছন্দের জাতীয় জরিপে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় সাত শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছে।
চাপ কেবল ঐতিহ্যগত দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই। নর্থ ক্যারোলাইনা ও মিশিগানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যের পাশাপাশি টেক্সাস, আলাস্কা, ওহাইও ও আইওয়ার মতো রিপাবলিকানদের তুলনামূলক শক্তিশালী এলাকাতেও ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন অথবা সমানে সমানে লড়াই করছেন।
এ অবস্থায় সিনেটে বড় পরাজয় এবং প্রতিনিধি পরিষদে আরও গুরুতর ধাক্কার আশঙ্কা বাস্তব। ফলে রিপাবলিকান নেতৃত্ব যদি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে চায়, তার যুক্তি বোঝা কঠিন নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই কৌশল আদৌ কাজ করবে কি না।
‘স্বাভাবিকতার দল’ হওয়ার দাবির সঙ্গে সংঘাত
উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভ্যান্স রিপাবলিকান পার্টিকে স্বাভাবিকতার দল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু একই সম্মেলনে ট্রাম্পকে ঘিরে যে আবেগ, আনুগত্য এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রকাশ ঘটেছে, তার সঙ্গে এই দাবির একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্ব রয়েছে।
আরও বড় সমস্যা হলো, যাদের ভোটকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার জন্য এই আয়োজন, তাদের কতজন আদৌ সম্মেলনটি দেখেছেন? যেসব ভোটার ট্রাম্পের প্রতি সবচেয়ে অনুগত, তাঁদের সবাই রাজনৈতিক অনুষ্ঠান অনুসরণ করেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে সম্মেলনের দৃশ্য সবচেয়ে বেশি নজরে পড়তে পারে সেই ভোটারদের, যারা রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। আর তাঁদের একটি বড় অংশ যদি ট্রাম্পের প্রতি ইতিমধ্যে বিরূপ হয়ে থাকেন, তাহলে পুরো আয়োজনের প্রভাব প্রত্যাশার বিপরীত হতে পারে।
কারণ সম্মেলনটি শেষ পর্যন্ত একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার করে দিয়েছে—রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দেওয়া মানেই ট্রাম্পকে সমর্থন করা।
এটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
ট্রাম্পের অনুগত ভোটারদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে তাঁর নামকে প্রতিটি রিপাবলিকান প্রার্থীর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া স্বল্পমেয়াদে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু একই কৌশল বিরোধী ভোটারদেরও আরও দৃঢ়ভাবে সংগঠিত করতে পারে।
যে ভোটার ট্রাম্পকে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চান না, তাঁর কাছে এই সম্মেলনের বার্তা খুব সরল: ট্রাম্পকে থামাতে হলে তাঁর দলের প্রার্থীদের হারাতে হবে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নিজে ব্যালটে থাকেন না। তাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কতটা তাঁর দলের প্রার্থীদের পক্ষে ভোটে রূপান্তরিত হবে এবং তাঁর প্রতি বিরূপতা কতটা রিপাবলিকান প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভোটে পরিণত হবে।
ডালাসের সম্মেলন প্রথম প্রশ্নটির উত্তর খুঁজেছে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নটিকে হয়তো আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
রিপাবলিকান পার্টির জন্য শেষ পর্যন্ত সেটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। ট্রাম্পকে দলটির শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অর্থ হলো তাঁর দুর্বলতাকেও দলের দুর্বলতায় পরিণত করা। যদি বর্তমান জনমতের প্রবণতা ভোটের দিন পর্যন্ত বজায় থাকে, তাহলে ট্রাম্পকে ঘিরে অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচার রিপাবলিকানদের ভোটারদের ঘরে ফেরানোর বদলে আরও বেশি ভোটারকে তাঁদের বিরুদ্ধে ভোট দিতে উৎসাহিত করতে পারে।
জামেল বুই 


















