মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে রিপাবলিকান দল মোটের ওপর তাঁর প্রতি অনুগত থাকলেও সিনেটের একটি ছোট অংশের আইনপ্রণেতা ক্রমেই তাঁর সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর ট্রাম্পের বিতর্কিত উদ্যোগে বাধা দেওয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আগামী দিনে এই বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, বর্তমান কয়েকজন ট্রাম্পবিরোধী বা তুলনামূলকভাবে স্বাধীনচেতা রিপাবলিকান সিনেটর শিগগিরই বিদায় নিতে পারেন। তাঁদের জায়গায় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নতুন আইনপ্রণেতারা এলে সিনেটে প্রেসিডেন্টের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
ট্রাম্পের পছন্দের অর্থ তহবিলে সিনেটের বাধা
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাক্কা এসেছে তাঁর প্রস্তাবিত ১৮০ কোটি ডলারের তথাকথিত ‘অস্ত্রায়নবিরোধী’ তহবিল নিয়ে। বিচার বিভাগের প্রধান পদে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থী টড ব্লঁশকে সমর্থনের শর্ত হিসেবে টেক্সাসের সিনেটর জন কর্নিন ও নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস দাবি করেছিলেন, এই তহবিল বাতিল করতে হবে।
২ আগস্ট ব্লঁশ লিখিতভাবে আশ্বাস দেন যে বিচার বিভাগ তহবিলটি বাতিল করছে। এর দুই দিন পর সিনেটের বিচারবিষয়ক কমিটি তাঁর মনোনয়ন এগিয়ে দেয়।
ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। তাদের যুক্তি, তহবিল বাতিল হলেও ট্রাম্প ভবিষ্যতে আবার সেটি চালু করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে রিপাবলিকান দলের ভেতরের কিছু সদস্যের কাছে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে অন্তত বোঝা গেছে যে প্রেসিডেন্টের সব সিদ্ধান্ত নির্বিঘ্নে বাস্তবায়ন করার জন্য কংগ্রেস প্রস্তুত নয়।
থুনের সামনে কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা
এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন। ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়েও তিনি বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভোটার পরিচয় যাচাইসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইন। ট্রাম্প এই আইন পাস করাতে আগ্রহী হলেও থুনের অবস্থান হলো, এর পক্ষে প্রয়োজনীয় ৬০টি ভোট নেই। ফলে সিনেটের দীর্ঘ বিতর্ক ও বিল আটকে দেওয়ার প্রক্রিয়া অতিক্রম করে আইনটি পাস করা কঠিন।
ট্রাম্পের সমাধান ছিল এই বাধা দূর করতে সিনেটের দীর্ঘ বিতর্কের নিয়মটি বাতিল করা। কিন্তু থুন এতে রাজি নন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রিপাবলিকানরা এই নিয়ম বাতিল করবে না।
এটি শুধু একটি আইনি বা প্রক্রিয়াগত বিষয় নয়। এর মধ্যে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নও রয়েছে। থুন মনে করছেন, আজ ট্রাম্পের সুবিধার জন্য এই নিয়ম ভেঙে দিলে ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন যেকোনো প্রেসিডেন্ট একই পথ ব্যবহার করতে পারবেন।
নির্বাচনের আগে ঝুঁকি নিতে নারাজ রিপাবলিকানরা
আরেকটি কারণেও রিপাবলিকান সিনেটররা ট্রাম্পের সব পরিকল্পনায় এগিয়ে যেতে চাইছেন না। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে অনেক সিনেটর নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।
ট্রাম্পের বিতর্কিত কোনো প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলে তাঁদের নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। বিশেষ করে যেসব সিনেটর কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারেন, তাঁরা এমন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলতে চাইছেন।
দলটির এক অভ্যন্তরীণ কৌশলবিদের মতে, অনেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাই ট্রাম্পের হয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন। তাঁদের কাছে দলীয় অবস্থানের পাশাপাশি নিজেদের নির্বাচনী ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ কারণেই থুন অনেক সিনেটরের কাছে এক ধরনের রাজনৈতিক ‘ঢাল’ হিসেবে দেখা দিচ্ছেন। তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে এমন কিছু প্রস্তাব আটকে রাখছেন, যেগুলো সমর্থন করলে দলের অনেক সদস্য নির্বাচনী ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ শিবির আরও শক্তিশালী হওয়ার পথে
তবে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ সিনেটের বর্তমান গঠন আগামী বছর বদলে যেতে পারে।
জন কর্নিন ও থম টিলিসের আসনে নতুন করে নির্বাচন হবে। তাঁদের জায়গায় ডেমোক্র্যাট অথবা ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ ভাবধারার নতুন রিপাবলিকান নেতারা আসতে পারেন।
একইভাবে লুইজিয়ানার বিল ক্যাসিডি ও কেন্টাকির মিচ ম্যাককনেলের বিদায়ের পর তাঁদের জায়গাতেও ট্রাম্পঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে রিপাবলিকান সিনেট আরও বেশি ট্রাম্পমুখী হয়ে উঠতে পারে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক ম্যাথিউ গ্লাসম্যানের ধারণা, আগামী বছর সিনেটের রিপাবলিকান অংশ আদর্শগতভাবে আরও বেশি ট্রাম্পঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে।
থুনের জন্য সামনে আরও কঠিন সময়
রিপাবলিকান দলের ট্রাম্পপন্থী অংশ যত শক্তিশালী হবে, জন থুনের দায়িত্বও তত কঠিন হয়ে উঠবে। বর্তমানে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত উটাহর সিনেটর মাইক লি আগামী বছর বিচারবিষয়ক কমিটিতে রিপাবলিকানদের শীর্ষ অবস্থানে যেতে পারেন।
তখন ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত মনোনয়ন, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক তহবিল নিয়ে থুনের ওপর আরও বেশি চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ট্রাম্প যদি ভবিষ্যতে বিতর্কিত সেই তহবিল আবার চালু করার চেষ্টা করেন, তখন ট্রাম্পপন্থী সিনেটররা থুনকে সেটি সমর্থনের জন্য চাপ দিতে পারেন।
এমনকি নতুন রিপাবলিকান সিনেটরদের একটি অংশ সিনেটের দীর্ঘ বিতর্কের নিয়ম পুরোপুরি বাতিল করার দাবিও তুলতে পারেন। সেটি হলে মার্কিন কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর ঐতিহ্যগত যে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সংঘাত, নাকি ক্ষমতার ভারসাম্য?
বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ট্রাম্পবিরোধী বিদ্রোহ বলা কঠিন। কারণ রিপাবলিকান সিনেটরদের বড় অংশই এখনো প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি অনুগত। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা বুঝতে পারছেন, কংগ্রেস যদি নির্বিচারে প্রেসিডেন্টের প্রতিটি সিদ্ধান্ত মেনে নেয়, তাহলে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই কারণে থুনের নেতৃত্বে কিছু রিপাবলিকান সিনেটর ট্রাম্পের সব পরিকল্পনাকে থামিয়ে না দিলেও অন্তত কিছু ক্ষেত্রে গতি কমিয়ে দিচ্ছেন।
আগামী বছর সিনেটের নতুন গঠন সেই ভারসাম্যকে আরও বদলে দিতে পারে। ট্রাম্পপন্থী নতুন সিনেটররা সংখ্যায় ও প্রভাবে বাড়লে প্রেসিডেন্টের জন্য আইন পাস করানো সহজ হতে পারে। আর ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিলে থুনের রাজনৈতিক ক্ষমতা অনেকটাই কমে যাবে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ট্রাম্প কী চান, তা নয়; বরং রিপাবলিকান সিনেটররা কতটা পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবেন। বর্তমানের ছোটখাটো প্রতিরোধ আগামী দিনে মার্কিন ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















