যুক্তরাষ্ট্র থেকে তৃতীয় দেশে পাঠানো অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আফ্রিকার দেশ নিরক্ষীয় গিনিতে। দেশটির মালাবোর একটি হোটেলে থাকা অভিবাসীদের সঙ্গে পুলিশের বিরোধের একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। ঘটনার ভিডিওতেও পুলিশের হাতে অস্ত্র তাক করে রাখার দৃশ্য দেখা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত মুঠোফোন নিয়ে বিরোধ থেকে। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হোটেলের প্রবেশপথে জাতীয় পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন সদস্যকে আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে অভিবাসীদের দিকে তাক করে থাকতে দেখা যায়। এ সময় একজন অভিবাসীকে মাটিতে হাঁটু গেড়ে থাকতে দেখা যায়, আর আশপাশে থাকা অন্যরা চিৎকার করছিলেন।
মুঠোফোন চাওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে কিউবার এক অভিবাসী পুলিশের কাছে তার জব্দ করা মুঠোফোন ফেরত চান। পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোনটি প্রয়োজন ছিল তার।
পুলিশ তার অনুরোধে সাড়া না দিলে মিশরের নাগরিক আহমেদ সোলাইমান ঘটনাটি নিজের মুঠোফোনে ধারণ করতে শুরু করেন। এরপর কয়েকজন পুলিশ সদস্য তার দিকে এগিয়ে এসে তাকে ও আশপাশে থাকা আরও কয়েকজনকে ধরে ফেলেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
সোলাইমানের দাবি, পুলিশ তার গলা ও জামা ধরে টানাটানি করে এবং তার পকেট থেকে ফোন বের করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য অস্ত্র তাক করে তাকে হাঁটু গেড়ে হাত ওপরে তুলতে নির্দেশ দেন। প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট তাকে ওই অবস্থায় থাকতে হয় বলে সোলাইমান জানিয়েছেন।
পরে হোটেলের পরিচালক ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি শান্ত করেন। এরপর অভিবাসীদের আবার নিজেদের কক্ষে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
মালাবোর হোটেলে আটক ৩১ জন
বর্তমানে নিরক্ষীয় গিনির মালাবোর ওই হোটেলে ৩১ জন অভিবাসীকে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে লাইবেরিয়ায় পাঠানোর চেষ্টা করা পাঁচজন অভিবাসী বিমান থেকে নামতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তাদের নিরক্ষীয় গিনিতে পাঠানো হয়।
গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত মোট ৫৩ জনকে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে নিরক্ষীয় গিনিতে পাঠানো হয়েছে বলে অভিবাসন পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার হিসাব। তাদের মধ্যে ১১টি আফ্রিকান দেশের নাগরিক ছাড়াও জর্জিয়া, জ্যামাইকা, ব্রাজিল ও কিউবার নাগরিক রয়েছেন।
চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা নিয়েও অভিযোগ
নিরক্ষীয় গিনিতে পাঠানো অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ নয়। এর আগেও কয়েকজন সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়া, আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে থাকার অভিযোগ করেছিলেন।
কিছু অভিবাসীর আইনজীবীরা বলছেন, পুলিশের হাতে অস্ত্র তাক করার এই ঘটনা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এমন একটি দেশে পাঠানো হচ্ছে যেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই।
আইনজীবীদের একজন মেরেডিথ ইউন বলেন, নিরক্ষীয় গিনিতে মানুষকে পাঠানোর ফলে তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে—এমন প্রমাণ আবারও সামনে এসেছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
তৃতীয় দেশে পাঠানোর নীতি নিয়ে বিতর্ক
নিজ দেশে ফেরত পাঠানো আইনগতভাবে সম্ভব নয়—এমন অভিবাসীদের অন্য দেশে পাঠানোর জন্য গত বছর থেকে আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তি করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব ব্যবস্থা দেশটির অভিবাসন আইনের আওতাতেই করা হচ্ছে।
তবে মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এই চুক্তিগুলোর অনেক বিষয়ই স্পষ্ট নয়। এমনকি যেসব অভিবাসী নিজ দেশে ফিরে গেলে নির্যাতন বা অন্য ধরনের গুরুতর নিপীড়নের শিকার হতে পারেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আদালত আগে সুরক্ষা দিয়েছিল, তাদেরও তৃতীয় দেশে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিছু অভিবাসী জানিয়েছেন, পরে তাদের আবার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিবাসীদের বহিষ্কারে প্রশাসন আইনসম্মত সব পথ ব্যবহার করছে। তাদের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক enforcement কর্তৃপক্ষের হেফাজতে না থাকলে তার পরবর্তী অবস্থার জন্য ওই সংস্থাকে দায়ী করা যায় না।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও জানিয়েছে, যাদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার আইনগত অধিকার নেই, তাদের বহিষ্কারে প্রয়োজনীয় সব আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে নিরক্ষীয় গিনির সরকার এ ঘটনা নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো জবাব দেয়নি।
ঘটনার ভিডিও পর্যালোচনা করা হলেও সংঘর্ষের আগে ঠিক কী ঘটেছিল, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিবাসীদের দিকে পুলিশের অস্ত্র তাক করার দৃশ্য তাদের নিরাপত্তা এবং তৃতীয় দেশে পাঠানোর পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















