তাইওয়ান প্রণালির নীল জলরাশির মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা পেংহু দ্বীপপুঞ্জ এখন আর শুধু পর্যটকদের কাছে সমুদ্র, প্রবাল আর নির্মল সৌন্দর্যের ঠিকানা নয়। সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান ঘাঁটিতে।
চীনের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পেংহুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে তাইপে। সেখানে অবস্থানরত হাজার হাজার সেনা নিয়মিত মহড়া চালাচ্ছেন সম্ভাব্য চীনা আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও প্রস্তুত করা হচ্ছে—যুদ্ধ বা জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংরক্ষণ করতে হবে, আহতদের কীভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো কীভাবে মেরামত করতে হবে এবং সংকটের সময় কীভাবে টিকে থাকতে হবে, তা শেখানো হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরু হলে প্রথম আঘাত আসতে পারে পেংহুতেই
তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পেংহু দ্বীপপুঞ্জে রয়েছে প্রায় ৯০টি দ্বীপ ও ছোট দ্বীপ। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন যদি তাইওয়ানে সামরিক অভিযান শুরু করে, তাহলে প্রথম ধাক্কাগুলোর একটি আসতে পারে এই দ্বীপপুঞ্জে।
কারণ পেংহুর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের উপকূল থেকে তাইওয়ানের মূল দ্বীপের দিকে এগিয়ে যাওয়া কোনো আক্রমণকারী বহরকে পেংহু পাশ কাটিয়ে যেতে হলে সেখানকার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি নিতে হবে। ফলে চীনা বাহিনীর জন্য পেংহুকে নিষ্ক্রিয় করা বা দখলে নেওয়া কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাইওয়ানের সামরিক বিশেষজ্ঞ সু তজু-ইউনের মতে, পেংহু থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাবনা থাকায় চীনা বাহিনী মূল ভূখণ্ডে আক্রমণের আগে এই দ্বীপগুলোর সামরিক সক্ষমতা মোকাবিলা করতে বাধ্য হতে পারে।
গোলাবর্ষণের মহড়ায় স্পষ্ট যুদ্ধের প্রস্তুতি
আগস্টের সামরিক মহড়ায় পেংহুর আকাশ ও সমুদ্রজুড়ে দেখা গেছে যুদ্ধের প্রস্তুতির স্পষ্ট চিত্র। অন্ধকার ভোরে সৈন্যরা ট্যাংকে গোলাবারুদ তুলেছেন। এরপর কামান, মর্টার, সাঁজোয়া যান ও পদাতিক বাহিনীকে নিয়ে শুরু হয়েছে সমুদ্রপথে সম্ভাব্য শত্রুর অবতরণ ঠেকানোর মহড়া।
চারটি ট্যাংক ধুলো, ধোঁয়া ও বিস্ফোরণের শব্দের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে কাল্পনিক আক্রমণকারীদের লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করেছে। সমুদ্রের দিকে ছোড়া আলোক গোলার বিস্ফোরণে রাতের অন্ধকার কেটে গেছে, আর মেশিনগানের গুলির রেখা আকাশে এঁকেছে যুদ্ধের এক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি।
এই মহড়ার মধ্য দিয়ে শুধু সেনাদের যুদ্ধ প্রস্তুতিই নয়, পেংহুর সামরিক গুরুত্বও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
তাইওয়ান পেংহুতে দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র মোতায়েনের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র সম্ভাব্য চীনা আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আঘাত হানার পাশাপাশি চীনের উপকূলে অবস্থানরত সামরিক সমাবেশকেও লক্ষ্য করতে পারে।
এমনকি চীনা বাহিনী তাইওয়ানের দিকে যাত্রা শুরু করার আগেই তাদের প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পেংহুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এবার যুক্ত হয়েছে চালকবিহীন আকাশযানও। জুলাইয়ে দ্বীপগুলোতে প্রথমবারের মতো আলাদা চালকবিহীন আকাশযান ইউনিট গঠন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সামরিক মহড়ায় এসব আকাশযান ব্যবহার করা হয়েছে।
তাইওয়ানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রও তাইওয়ানের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষায় চালকবিহীন আকাশযানের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে আসছে।
পেংহু হারালে বদলে যেতে পারে পুরো যুদ্ধের চিত্র
পেংহু শুধু একটি সামরিক ঘাঁটি নয়; তাইওয়ান প্রণালির নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। তাইওয়ানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করেন, পেংহু যদি চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে কার্যত পুরো তাইওয়ান প্রণালির ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ অনেকটাই খুলে যেতে পারে।
এই কারণেই দ্বীপপুঞ্জের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে তাইপে বিপুল গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে পেংহু কতক্ষণ চীনা আক্রমণ প্রতিহত করতে পারবে, তা নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। গত বছরের একটি যুদ্ধ মহড়ায় চীনের আকস্মিক দূরপাল্লার হামলার মাত্র এক দিনের মধ্যেই পেংহু পতনের দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। সেই ফল তাইওয়ানের সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদেরও উদ্বিগ্ন করেছিল।
শুধু সেনা নয়, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে সাধারণ মানুষও
পেংহুর প্রস্তুতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এবার শুধু সেনাবাহিনী নয়, সাধারণ মানুষকেও সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তাইওয়ান সরকার ‘সমগ্র সমাজের প্রতিরোধ সক্ষমতা’ গড়ে তোলার কর্মসূচির আওতায় দ্বীপবাসীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত এবং অন্যান্য সহায়তামূলক কাজের জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত করা হচ্ছে।
পেংহুতেই ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ এই প্রশিক্ষণ নিয়ে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছেন। বছরের শেষ নাগাদ তাইওয়ানজুড়ে প্রায় ২ লাখ মানুষকে এ ধরনের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
খাদ্য, ওষুধ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও প্রতিরক্ষার অংশ
সম্ভাব্য যুদ্ধের সময় সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় স্থানীয় প্রশাসন মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা করেছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের কাজেও সহযোগিতা নেওয়া হবে।
একজন স্থানীয় গাড়ি মেরামতকারী তাঁর প্রতিষ্ঠান জরুরি প্রয়োজনে তাইওয়ানের সেনাদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানেন, যুদ্ধ শুরু হলে এ কারণে তাঁর প্রতিষ্ঠানও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। তবু নিজের ভূমি ও জীবনযাত্রা রক্ষার দায়িত্ব থেকেই তিনি এই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
অবরোধের আশঙ্কাও ভাবাচ্ছে দ্বীপবাসীকে
পেংহুর জন্য হুমকি শুধু সরাসরি সামরিক হামলা নয়। চীন যদি তাইওয়ানের ওপর সমুদ্র অবরোধ আরোপ করে, তাহলেও দ্বীপপুঞ্জটি দ্রুত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
তাইওয়ানের অর্থনীতি বাণিজ্যনির্ভর হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। পেংহুর মতো দূরবর্তী দ্বীপগুলোতে সেই সংকট আরও দ্রুত আঘাত হানতে পারে।
এক কিশোর শিক্ষার্থীর আশঙ্কা, দীর্ঘদিন খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দিলে কিছু মানুষ হয়তো শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণের কথাও ভাবতে পারে। তবে অন্যদিকে স্থানীয় এক ট্যাক্সিচালকের কণ্ঠে শোনা গেছে ভিন্ন দৃঢ়তা—নিজের ভূমি আক্রান্ত হলে তিনি নীরব দর্শক হয়ে থাকবেন না।
ইতিহাসের পাতাতেও পেংহুর যুদ্ধের ছায়া
পেংহুর কৌশলগত গুরুত্ব নতুন কোনো বিষয় নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দ্বীপপুঞ্জটি তাইওয়ানে আক্রমণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও পেংহুর গভীর প্রাকৃতিক বন্দর মিত্রবাহিনীর নজরে ছিল। তবে সম্ভাব্য ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত দ্বীপগুলো দখলের একটি পরিকল্পনা বাতিল করেছিল।
এই ইতিহাসই আজকের পেংহুর সামরিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
পর্যটনের স্বর্গ থেকে সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র
পেংহুর সাদা বালুর সৈকত, প্রবালপ্রাচীর ও নীল সমুদ্র প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটককে আকর্ষণ করে। কিন্তু সেই শান্ত সৌন্দর্যের আড়ালে এখন ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে যুদ্ধের প্রস্তুতি।
সেনারা অস্ত্র হাতে মহড়া দিচ্ছেন। আকাশে উড়ছে চালকবিহীন আকাশযান। স্থানীয় প্রশাসন গড়ে তুলছে জরুরি সরবরাহব্যবস্থা। আর সাধারণ মানুষ শিখছেন কীভাবে যুদ্ধ, অবরোধ কিংবা অন্য কোনো ভয়াবহ সংকটের মধ্যেও নিজেদের সমাজকে সচল রাখা যায়।
চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সংঘাত এখনো যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু পেংহুর প্রস্তুতি বলছে, সম্ভাব্য সেই দিনের জন্য দ্বীপবাসী আর শুধু অপেক্ষা করতে চাইছে না। সমুদ্রের শান্ত নীল ঢেউয়ের নিচে তাই যেন জমে উঠছে এক গভীর উদ্বেগ—যদি যুদ্ধ সত্যিই আসে, তবে প্রথম প্রতিরোধের দেয়ালটি দাঁড়াবে এখানেই।
Sarakhon Report 



















