০২:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

তালেবানের সাবেক প্রতিপক্ষের সঙ্গে ১৬ বছর পর মুখোমুখি: আফগান যুদ্ধের ক্ষত, অনুতাপ ও ক্ষমার এক বিরল গল্প

দুই দশকের আফগান যুদ্ধ শুধু রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাস বদলায়নি, বদলে দিয়েছে সেই যুদ্ধে অংশ নেওয়া অসংখ্য মানুষের জীবনও। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মেরিন সেনা ও পরে নিউইয়র্ক টাইমসের যুদ্ধসংবাদদাতা থমাস গিবন্স-নেফ বহু বছর পর আফগানিস্তানে ফিরে গিয়ে দেখা করেন সেই তালেবান কমান্ডারের সঙ্গে, যার বিরুদ্ধে তিনি ২০১০ সালে মারজাহর যুদ্ধে লড়েছিলেন। এই সাক্ষাৎ হয়ে ওঠে যুদ্ধ, অনুশোচনা, স্মৃতি ও ক্ষমার এক ব্যতিক্রমী মানবিক অধ্যায়।

মারজাহ যুদ্ধের স্মৃতি

২০১০ সালের শুরুর দিকে আফগানিস্তানের মারজাহ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় সামরিক অভিযানের কেন্দ্র। তখন মাত্র ২২ বছর বয়সী মেরিন স্নাইপার দলের নেতা ছিলেন গিবন্স-নেফ। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি একাধিক মানুষকে হত্যা করেছিলেন, যার স্মৃতি আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। কে শত্রু, কে সাধারণ মানুষ—এই বিভাজন সব সময় স্পষ্ট ছিল না। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জনের কৌশল এবং বাড়ির পাশে গোলাগুলির বাস্তবতা ছিল গভীরভাবে পরস্পরবিরোধী।

বহু বছর পর পুরোনো প্রতিপক্ষের খোঁজে

মে মাসে আফগানিস্তানে ফিরে গিয়ে গিবন্স-নেফের লক্ষ্য ছিল তালেবান কমান্ডার মোল্লা আবদুল রহিম গুলাবের সঙ্গে আবার কথা বলা। ২০২১ সালে সাংবাদিক হিসেবে তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হলেও তখন নিজের সাবেক মেরিন পরিচয় প্রকাশ করেননি।

এবার তিনি সত্য জানান। বলেন, তিনি শুধু সাংবাদিক নন, মারজাহ যুদ্ধে গুলাবের বিপক্ষেই যুদ্ধ করেছিলেন। গুলাব জানান, প্রথম সাক্ষাতেই তার প্রশ্নের ধরন দেখে তিনি বিষয়টি অনুমান করেছিলেন।

In Kabul clinic, Taliban and the soldiers they fought confront wounds of war  | Reuters

যুদ্ধের দুই ভিন্ন স্মৃতি

আলোচনায় উঠে আসে উভয় পক্ষের হারানো সহযোদ্ধা, নিহত বন্ধু এবং যুদ্ধের নির্মম অভিজ্ঞতা। গিবন্স-নেফ জানতে চান সেই তালেবান স্নাইপারের পরিণতি, যে তার দুই সহযোদ্ধাকে গুলি করেছিল। অন্যদিকে গুলাব জানতে চান, গুলিবিদ্ধ মার্কিন সেনারা শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন কি না।

আলোচনার এক পর্যায়ে গুলাব প্রশ্ন করেন, কেন আফগানিস্তানে যুদ্ধ করা অনেক মার্কিন সেনা দেশে ফিরে আত্মহত্যা করেন। জবাবে গিবন্স-নেফ বলেন, বহু সেনা মনে করেন তাদের ত্যাগ ও সহিংসতার কোনো অর্থপূর্ণ ফল পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান অনেকের ওপর গভীর মানসিক চাপ তৈরি করেছে।

ক্ষমার এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত

কথোপকথনের শেষদিকে গুলাব বলেন, যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। নিহত মুজাহিদ বা সাধারণ মানুষের পরিবারের পক্ষ থেকে তিনি কথা বলতে পারেন না, তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি গিবন্স-নেফকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

এই বক্তব্য গিবন্স-নেফের কাছে ছিল এক অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা। তার মতে, বহু বছর ধরে যে যুদ্ধের স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, সেই সংঘাতের একসময়ের প্রতিপক্ষের কাছ থেকে এমন মানবিক প্রতিক্রিয়া তাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।

যুদ্ধের পরও থেকে যাওয়া প্রশ্ন

গিবন্স-নেফ লিখেছেন, একসময় যাকে তিনি শুধু শত্রু হিসেবে দেখতেন, দীর্ঘ সময় পর সেই মানুষটির মধ্যেও তিনি একজন মানুষের মুখ দেখতে পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর তালেবান কমান্ডারের একটি বার্তা—‘আপনি নিরাপদে বাড়ি পৌঁছেছেন তো?’—তার কাছে যুদ্ধ-পরবর্তী সম্পর্কের এক গভীর প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই সাক্ষাৎ যুদ্ধের সামরিক ইতিহাস নয়, বরং যুদ্ধের মানবিক মূল্য, ব্যক্তিগত অনুশোচনা এবং বহু বছর পরও বেঁচে থাকা স্মৃতির এক বিরল দলিল হিসেবে উঠে এসেছে।

তালেবান কমান্ডারের সঙ্গে ১৬ বছর পর সাক্ষাৎ: যুদ্ধ, অনুশোচনা ও ক্ষমার বিরল মানবিক গল্প।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

তালেবানের সাবেক প্রতিপক্ষের সঙ্গে ১৬ বছর পর মুখোমুখি: আফগান যুদ্ধের ক্ষত, অনুতাপ ও ক্ষমার এক বিরল গল্প

০৮:৩৮:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

দুই দশকের আফগান যুদ্ধ শুধু রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাস বদলায়নি, বদলে দিয়েছে সেই যুদ্ধে অংশ নেওয়া অসংখ্য মানুষের জীবনও। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মেরিন সেনা ও পরে নিউইয়র্ক টাইমসের যুদ্ধসংবাদদাতা থমাস গিবন্স-নেফ বহু বছর পর আফগানিস্তানে ফিরে গিয়ে দেখা করেন সেই তালেবান কমান্ডারের সঙ্গে, যার বিরুদ্ধে তিনি ২০১০ সালে মারজাহর যুদ্ধে লড়েছিলেন। এই সাক্ষাৎ হয়ে ওঠে যুদ্ধ, অনুশোচনা, স্মৃতি ও ক্ষমার এক ব্যতিক্রমী মানবিক অধ্যায়।

মারজাহ যুদ্ধের স্মৃতি

২০১০ সালের শুরুর দিকে আফগানিস্তানের মারজাহ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় সামরিক অভিযানের কেন্দ্র। তখন মাত্র ২২ বছর বয়সী মেরিন স্নাইপার দলের নেতা ছিলেন গিবন্স-নেফ। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি একাধিক মানুষকে হত্যা করেছিলেন, যার স্মৃতি আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। কে শত্রু, কে সাধারণ মানুষ—এই বিভাজন সব সময় স্পষ্ট ছিল না। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জনের কৌশল এবং বাড়ির পাশে গোলাগুলির বাস্তবতা ছিল গভীরভাবে পরস্পরবিরোধী।

বহু বছর পর পুরোনো প্রতিপক্ষের খোঁজে

মে মাসে আফগানিস্তানে ফিরে গিয়ে গিবন্স-নেফের লক্ষ্য ছিল তালেবান কমান্ডার মোল্লা আবদুল রহিম গুলাবের সঙ্গে আবার কথা বলা। ২০২১ সালে সাংবাদিক হিসেবে তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হলেও তখন নিজের সাবেক মেরিন পরিচয় প্রকাশ করেননি।

এবার তিনি সত্য জানান। বলেন, তিনি শুধু সাংবাদিক নন, মারজাহ যুদ্ধে গুলাবের বিপক্ষেই যুদ্ধ করেছিলেন। গুলাব জানান, প্রথম সাক্ষাতেই তার প্রশ্নের ধরন দেখে তিনি বিষয়টি অনুমান করেছিলেন।

In Kabul clinic, Taliban and the soldiers they fought confront wounds of war  | Reuters

যুদ্ধের দুই ভিন্ন স্মৃতি

আলোচনায় উঠে আসে উভয় পক্ষের হারানো সহযোদ্ধা, নিহত বন্ধু এবং যুদ্ধের নির্মম অভিজ্ঞতা। গিবন্স-নেফ জানতে চান সেই তালেবান স্নাইপারের পরিণতি, যে তার দুই সহযোদ্ধাকে গুলি করেছিল। অন্যদিকে গুলাব জানতে চান, গুলিবিদ্ধ মার্কিন সেনারা শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন কি না।

আলোচনার এক পর্যায়ে গুলাব প্রশ্ন করেন, কেন আফগানিস্তানে যুদ্ধ করা অনেক মার্কিন সেনা দেশে ফিরে আত্মহত্যা করেন। জবাবে গিবন্স-নেফ বলেন, বহু সেনা মনে করেন তাদের ত্যাগ ও সহিংসতার কোনো অর্থপূর্ণ ফল পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান অনেকের ওপর গভীর মানসিক চাপ তৈরি করেছে।

ক্ষমার এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত

কথোপকথনের শেষদিকে গুলাব বলেন, যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। নিহত মুজাহিদ বা সাধারণ মানুষের পরিবারের পক্ষ থেকে তিনি কথা বলতে পারেন না, তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি গিবন্স-নেফকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

এই বক্তব্য গিবন্স-নেফের কাছে ছিল এক অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা। তার মতে, বহু বছর ধরে যে যুদ্ধের স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, সেই সংঘাতের একসময়ের প্রতিপক্ষের কাছ থেকে এমন মানবিক প্রতিক্রিয়া তাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।

যুদ্ধের পরও থেকে যাওয়া প্রশ্ন

গিবন্স-নেফ লিখেছেন, একসময় যাকে তিনি শুধু শত্রু হিসেবে দেখতেন, দীর্ঘ সময় পর সেই মানুষটির মধ্যেও তিনি একজন মানুষের মুখ দেখতে পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর তালেবান কমান্ডারের একটি বার্তা—‘আপনি নিরাপদে বাড়ি পৌঁছেছেন তো?’—তার কাছে যুদ্ধ-পরবর্তী সম্পর্কের এক গভীর প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই সাক্ষাৎ যুদ্ধের সামরিক ইতিহাস নয়, বরং যুদ্ধের মানবিক মূল্য, ব্যক্তিগত অনুশোচনা এবং বহু বছর পরও বেঁচে থাকা স্মৃতির এক বিরল দলিল হিসেবে উঠে এসেছে।

তালেবান কমান্ডারের সঙ্গে ১৬ বছর পর সাক্ষাৎ: যুদ্ধ, অনুশোচনা ও ক্ষমার বিরল মানবিক গল্প।