১০:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আমেরিকা আসলে কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত? নিশ্চিতভাবে যুদ্ধ শেষ হবে না, বদলে যাবে যুদ্ধের ধরন রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প

দুনিয়া যখন শক্তিশালীদের দখলে, জাতিসংঘের নেতৃত্বে দরকার বাস্তববাদী কূটনীতিক

বিশ্ব রাজনীতিতে এখন যেন নিয়মের চেয়ে শক্তির দাপটই বেশি। বড় দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ আদায়ে কখনো অর্থনৈতিক চাপ, কখনো সামরিক হুমকি, আবার কখনো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণকে হাতিয়ার করছে। এমন এক সময়ে জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস চলতি বছরের শেষ দিকে দুই মেয়াদ শেষ করে দায়িত্ব ছাড়বেন। তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে এখন পর্যন্ত সাতজন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।

সারাক্ষণ রিপোর্ট

জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব এমন এক পৃথিবীর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, যেখানে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর আচরণ অনেক সময় অপরাধী চক্রের মতোই কঠোর ও স্বার্থনির্ভর। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন—বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী তিন শক্তিই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের হাতে রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। ফলে জাতিসংঘের নেতৃত্বে কে আসবেন, সেই সিদ্ধান্তেও এই দেশগুলোর সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তবে তারা তুলনামূলকভাবে কম ভেটো ব্যবহার করে। কারণ, বড় শক্তিগুলোর বিরোধে জাতিসংঘ অচল হয়ে পড়ুক—এটি তারা চায় না। একই সঙ্গে তাদের স্থায়ী সদস্যপদও অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পুরোনো ক্ষমতার উত্তরাধিকার। বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশই মনে করে, এই বিশেষ মর্যাদা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

নীতির পক্ষে থাকবেন, নাকি ক্ষমতাবানদের সঙ্গে চলবেন

জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের বড় অংশই বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির এই দাপট নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা চায়, নতুন মহাসচিব জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলো রক্ষা করবেন। আগ্রাসী যুদ্ধ, অন্য দেশের ভূখণ্ড দখল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন।

কিন্তু এখানেই নতুন মহাসচিবের সবচেয়ে বড় সংকট। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কেউ ভেটো দিলে একজন প্রার্থী মহাসচিব হতে পারবেন না। অর্থাৎ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সমর্থন থাকলেও কয়েকটি শক্তিধর দেশের আপত্তি পুরো প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির নামে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রকাশ্য সমালোচনা সহজে মেনে নেবে না। অন্যদিকে রাশিয়া এমন কোনো মহাসচিব চায় না, যিনি ইউক্রেনে তার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরব হবেন। চীনও জাতিসংঘকে তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রশংসাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে আগ্রহী; দেশের অভ্যন্তরীণ দমননীতি কিংবা প্রতিবেশী অঞ্চলে তার শক্তি প্রয়োগ নিয়ে কঠিন প্রশ্ন উঠুক, তা তারা চায় না।

ফলে নতুন মহাসচিবের সামনে বাস্তবতা পরিষ্কার—ক্ষমতাধরদের সঙ্গে কাজ না করে জাতিসংঘকে কার্যকর রাখা সম্ভব নয়।

‘ক্ষমতাধরদের নির্দেশ’ নয়, দরকার কৌশলী নেতৃত্ব

জাতিসংঘের অভিজ্ঞ মহলে মহাসচিবদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথা বলা হয়। কেউ কেউ বড় শক্তিগুলোর রাজনীতি বুঝে কৌশলে এগিয়ে যান। আবার কেউ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর নির্দেশ মেনে চলেন। নতুন মহাসচিবকে প্রথম ধরনের নেতৃত্বই দিতে হবে।

অর্থাৎ তাঁকে একই সঙ্গে বাস্তববাদী এবং নীতিবান হতে হবে। সরাসরি সংঘাতে গিয়ে জাতিসংঘকে অচল করে দেওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি বড় শক্তির সব দাবি মেনে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করাও সমান ক্ষতিকর।

লাতিন আমেরিকা থেকে নেতৃত্বের সম্ভাবনা

অনানুষ্ঠানিক রীতিতে এবার লাতিন আমেরিকা থেকে মহাসচিব নির্বাচনের পালা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের অনেক সদস্য দেশ এবার একজন নারীকে এই পদে দেখতে আগ্রহী।

চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশেলেত প্রার্থী হয়েছেন। তবে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের আলোচনায় তাঁর সম্ভাবনা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন তাঁর অবস্থানকে আমেরিকার গর্ভপাত-সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিরূপ এবং চীনের মানবাধিকার প্রশ্নে যথেষ্ট কঠোর নয় বলে মনে করে।

৩০ জুলাই নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য দেশের মধ্যে প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে তিনজন প্রার্থীকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

তাদের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি।

দুজনের বক্তব্যেই বাস্তববাদী কূটনীতির ছাপ স্পষ্ট।

Opinion | The Economist

কৃষ্ণসাগরের খাদ্যচুক্তি থেকে গ্রিনস্প্যানের শিক্ষা

রেবেকা গ্রিনস্প্যান ২০২২ সালের কৃষ্ণসাগরীয় খাদ্যশস্য উদ্যোগকে তাঁর কূটনৈতিক সক্ষমতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানি আটকে গেলে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছিল।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, যার মাধ্যমে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানির পথ খুলে দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে রাশিয়ার খাদ্য ও সার রপ্তানিতেও সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। পরে রাশিয়া চুক্তিটি থেকে সরে যায়। তবু গ্রিনস্প্যানের যুক্তি হলো, কঠিন ও নৈতিকভাবে জটিল পরিস্থিতিতেও বাস্তবসম্মত সমঝোতার মাধ্যমে মানুষের উপকার করা সম্ভব।

তিনি নির্বাচিত হলে জাতিসংঘের প্রথম নারী এবং প্রথম ইহুদি মহাসচিব হওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।

গ্রোসির কূটনীতি: শত্রুপক্ষের মাঝেও জায়গা তৈরি

রাফায়েল গ্রোসি বর্তমান সময়কে দেখছেন ‘বড় শক্তির রাজনীতির প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে। তাঁর মতে, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে এমন রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেও সমঝোতায় যেতে পারে।

ইউক্রেনের রুশ-নিয়ন্ত্রিত জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে তাঁর ভূমিকা এর একটি উদাহরণ। তিনি যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাতিসংঘের পরিদর্শকদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

তবে জাতিসংঘের কিছু অভিজ্ঞ কর্মকর্তা গ্রোসিকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার জন্য তিনি এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন, যা জাতিসংঘের স্বাধীনতা ও নীতিগত অবস্থানকে দুর্বল করবে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা তাঁকে কঠিন ভারসাম্যের মধ্যে ফেলতে পারে।

জাতিসংঘ কি সত্যিই অকার্যকর?

জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা অনেক। কিন্তু তাই বলে প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি। বরং এমন একটি বিশ্বে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের কর্মকর্তারা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিদিনই কথা বলতে বাধ্য হন, জাতিসংঘ এখনো বিরল একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ।

মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, খাদ্যসংকট কিংবা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মতো সমস্যাগুলো কোনো একটি দেশের পক্ষে একা সমাধান করা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে দেশগুলোকে একই টেবিলে আনার ক্ষমতা জাতিসংঘের রয়েছে।

জাতিসংঘ সব সমস্যা সমাধান করতে পারে না। কিন্তু বিভিন্ন দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতাকে আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও জাতিসংঘ মধ্যস্থতা করতে পারে। প্রয়োজন হলে নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানো সম্ভব।

শক্তিশালীদের শান্তি নয়, ন্যায্য শান্তি

তবে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—শক্তিশালী দেশগুলোর চাপের কাছে দুর্বল দেশগুলোর অধিকার বিসর্জন দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এমন শান্তি হয়তো সাময়িকভাবে যুদ্ধ থামাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা নতুন সংঘাতের বীজ বপন করবে।

ইউক্রেন কিংবা গাজার মতো সংঘাতে যদি কেবল শক্তিশালী পক্ষের শর্ত মেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে সেটি প্রকৃত শান্তি হবে না। আবার বর্তমান বাস্তবতায় বড় শক্তিগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেও কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এই দ্বন্দ্বের মাঝেই জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিবের আসল কাজ।

তাঁকে কোনো ‘বিশ্ব পুলিশ’ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে না। তাঁর হাতে এমন ক্ষমতাও নেই। বরং তাঁকে হতে হবে এমন একজন দক্ষ বাস্তববাদী, যিনি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কথা বলতে জানেন, আবার দুর্বল দেশগুলোর অধিকারও ভুলে যান না।

আজকের শক্তির রাজনীতির যুগে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হয়তো বিশ্বকে এক লাফে বদলে দেওয়া নয়। বরং শক্তিশালীদের একটু একটু করে সঠিক পথে ঠেলে দেওয়া—যাতে তারা নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করলেও অন্তত আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মানুষের অধিকারের সীমারেখা পুরোপুরি অতিক্রম করতে না পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আমেরিকা আসলে কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

দুনিয়া যখন শক্তিশালীদের দখলে, জাতিসংঘের নেতৃত্বে দরকার বাস্তববাদী কূটনীতিক

০৬:২১:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে এখন যেন নিয়মের চেয়ে শক্তির দাপটই বেশি। বড় দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ আদায়ে কখনো অর্থনৈতিক চাপ, কখনো সামরিক হুমকি, আবার কখনো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণকে হাতিয়ার করছে। এমন এক সময়ে জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস চলতি বছরের শেষ দিকে দুই মেয়াদ শেষ করে দায়িত্ব ছাড়বেন। তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে এখন পর্যন্ত সাতজন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।

সারাক্ষণ রিপোর্ট

জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব এমন এক পৃথিবীর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, যেখানে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর আচরণ অনেক সময় অপরাধী চক্রের মতোই কঠোর ও স্বার্থনির্ভর। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন—বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী তিন শক্তিই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের হাতে রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। ফলে জাতিসংঘের নেতৃত্বে কে আসবেন, সেই সিদ্ধান্তেও এই দেশগুলোর সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তবে তারা তুলনামূলকভাবে কম ভেটো ব্যবহার করে। কারণ, বড় শক্তিগুলোর বিরোধে জাতিসংঘ অচল হয়ে পড়ুক—এটি তারা চায় না। একই সঙ্গে তাদের স্থায়ী সদস্যপদও অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পুরোনো ক্ষমতার উত্তরাধিকার। বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশই মনে করে, এই বিশেষ মর্যাদা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

নীতির পক্ষে থাকবেন, নাকি ক্ষমতাবানদের সঙ্গে চলবেন

জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের বড় অংশই বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির এই দাপট নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা চায়, নতুন মহাসচিব জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলো রক্ষা করবেন। আগ্রাসী যুদ্ধ, অন্য দেশের ভূখণ্ড দখল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন।

কিন্তু এখানেই নতুন মহাসচিবের সবচেয়ে বড় সংকট। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কেউ ভেটো দিলে একজন প্রার্থী মহাসচিব হতে পারবেন না। অর্থাৎ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সমর্থন থাকলেও কয়েকটি শক্তিধর দেশের আপত্তি পুরো প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির নামে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রকাশ্য সমালোচনা সহজে মেনে নেবে না। অন্যদিকে রাশিয়া এমন কোনো মহাসচিব চায় না, যিনি ইউক্রেনে তার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরব হবেন। চীনও জাতিসংঘকে তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রশংসাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে আগ্রহী; দেশের অভ্যন্তরীণ দমননীতি কিংবা প্রতিবেশী অঞ্চলে তার শক্তি প্রয়োগ নিয়ে কঠিন প্রশ্ন উঠুক, তা তারা চায় না।

ফলে নতুন মহাসচিবের সামনে বাস্তবতা পরিষ্কার—ক্ষমতাধরদের সঙ্গে কাজ না করে জাতিসংঘকে কার্যকর রাখা সম্ভব নয়।

‘ক্ষমতাধরদের নির্দেশ’ নয়, দরকার কৌশলী নেতৃত্ব

জাতিসংঘের অভিজ্ঞ মহলে মহাসচিবদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথা বলা হয়। কেউ কেউ বড় শক্তিগুলোর রাজনীতি বুঝে কৌশলে এগিয়ে যান। আবার কেউ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর নির্দেশ মেনে চলেন। নতুন মহাসচিবকে প্রথম ধরনের নেতৃত্বই দিতে হবে।

অর্থাৎ তাঁকে একই সঙ্গে বাস্তববাদী এবং নীতিবান হতে হবে। সরাসরি সংঘাতে গিয়ে জাতিসংঘকে অচল করে দেওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি বড় শক্তির সব দাবি মেনে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করাও সমান ক্ষতিকর।

লাতিন আমেরিকা থেকে নেতৃত্বের সম্ভাবনা

অনানুষ্ঠানিক রীতিতে এবার লাতিন আমেরিকা থেকে মহাসচিব নির্বাচনের পালা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের অনেক সদস্য দেশ এবার একজন নারীকে এই পদে দেখতে আগ্রহী।

চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশেলেত প্রার্থী হয়েছেন। তবে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের আলোচনায় তাঁর সম্ভাবনা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন তাঁর অবস্থানকে আমেরিকার গর্ভপাত-সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিরূপ এবং চীনের মানবাধিকার প্রশ্নে যথেষ্ট কঠোর নয় বলে মনে করে।

৩০ জুলাই নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য দেশের মধ্যে প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে তিনজন প্রার্থীকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

তাদের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি।

দুজনের বক্তব্যেই বাস্তববাদী কূটনীতির ছাপ স্পষ্ট।

Opinion | The Economist

কৃষ্ণসাগরের খাদ্যচুক্তি থেকে গ্রিনস্প্যানের শিক্ষা

রেবেকা গ্রিনস্প্যান ২০২২ সালের কৃষ্ণসাগরীয় খাদ্যশস্য উদ্যোগকে তাঁর কূটনৈতিক সক্ষমতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানি আটকে গেলে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছিল।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, যার মাধ্যমে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানির পথ খুলে দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে রাশিয়ার খাদ্য ও সার রপ্তানিতেও সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। পরে রাশিয়া চুক্তিটি থেকে সরে যায়। তবু গ্রিনস্প্যানের যুক্তি হলো, কঠিন ও নৈতিকভাবে জটিল পরিস্থিতিতেও বাস্তবসম্মত সমঝোতার মাধ্যমে মানুষের উপকার করা সম্ভব।

তিনি নির্বাচিত হলে জাতিসংঘের প্রথম নারী এবং প্রথম ইহুদি মহাসচিব হওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।

গ্রোসির কূটনীতি: শত্রুপক্ষের মাঝেও জায়গা তৈরি

রাফায়েল গ্রোসি বর্তমান সময়কে দেখছেন ‘বড় শক্তির রাজনীতির প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে। তাঁর মতে, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে এমন রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেও সমঝোতায় যেতে পারে।

ইউক্রেনের রুশ-নিয়ন্ত্রিত জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে তাঁর ভূমিকা এর একটি উদাহরণ। তিনি যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাতিসংঘের পরিদর্শকদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

তবে জাতিসংঘের কিছু অভিজ্ঞ কর্মকর্তা গ্রোসিকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার জন্য তিনি এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন, যা জাতিসংঘের স্বাধীনতা ও নীতিগত অবস্থানকে দুর্বল করবে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা তাঁকে কঠিন ভারসাম্যের মধ্যে ফেলতে পারে।

জাতিসংঘ কি সত্যিই অকার্যকর?

জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা অনেক। কিন্তু তাই বলে প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি। বরং এমন একটি বিশ্বে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের কর্মকর্তারা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিদিনই কথা বলতে বাধ্য হন, জাতিসংঘ এখনো বিরল একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ।

মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, খাদ্যসংকট কিংবা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মতো সমস্যাগুলো কোনো একটি দেশের পক্ষে একা সমাধান করা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে দেশগুলোকে একই টেবিলে আনার ক্ষমতা জাতিসংঘের রয়েছে।

জাতিসংঘ সব সমস্যা সমাধান করতে পারে না। কিন্তু বিভিন্ন দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতাকে আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও জাতিসংঘ মধ্যস্থতা করতে পারে। প্রয়োজন হলে নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানো সম্ভব।

শক্তিশালীদের শান্তি নয়, ন্যায্য শান্তি

তবে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—শক্তিশালী দেশগুলোর চাপের কাছে দুর্বল দেশগুলোর অধিকার বিসর্জন দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এমন শান্তি হয়তো সাময়িকভাবে যুদ্ধ থামাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা নতুন সংঘাতের বীজ বপন করবে।

ইউক্রেন কিংবা গাজার মতো সংঘাতে যদি কেবল শক্তিশালী পক্ষের শর্ত মেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে সেটি প্রকৃত শান্তি হবে না। আবার বর্তমান বাস্তবতায় বড় শক্তিগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেও কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এই দ্বন্দ্বের মাঝেই জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিবের আসল কাজ।

তাঁকে কোনো ‘বিশ্ব পুলিশ’ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে না। তাঁর হাতে এমন ক্ষমতাও নেই। বরং তাঁকে হতে হবে এমন একজন দক্ষ বাস্তববাদী, যিনি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কথা বলতে জানেন, আবার দুর্বল দেশগুলোর অধিকারও ভুলে যান না।

আজকের শক্তির রাজনীতির যুগে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হয়তো বিশ্বকে এক লাফে বদলে দেওয়া নয়। বরং শক্তিশালীদের একটু একটু করে সঠিক পথে ঠেলে দেওয়া—যাতে তারা নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করলেও অন্তত আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মানুষের অধিকারের সীমারেখা পুরোপুরি অতিক্রম করতে না পারে।