ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডানপন্থী দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার জন্য শেষ মুহূর্তে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে রেকর্ড সপ্তমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য থাকলেও জনমত জরিপগুলোতে তার নেতৃত্বাধীন জোটের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে।
নেতানিয়াহুর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডানপন্থী দলগুলোর বিভক্তি। তিনি বারবার সতর্ক করে বলেছেন, ডানপন্থীরা আলাদা আলাদাভাবে নির্বাচন করলে গুরুত্বপূর্ণ ভোট নষ্ট হবে এবং ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি বাড়বে। মঙ্গলবার রাতেই প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা।
১২০ আসনের সংসদে জটিল সমীকরণ
ইসরায়েলের সংসদে মোট ১২০টি আসন। কোনো একক দল সাধারণত একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। ফলে সরকার গঠনে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে জোট তৈরি করাই নিয়ম।
সংসদে আসন পেতে কোনো দলকে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়, যা প্রায় চারটি আসনের সমান। ছোট দলগুলোর জন্য এ নিয়ম বড় ঝুঁকি তৈরি করে। তারা প্রয়োজনীয় ভোট না পেলে তাদের পাওয়া ভোট কার্যত সংসদে কোনো আসনে রূপ নেয় না।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ দল আগের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসন হারাতে পারে। দলটি ২০ থেকে ২৩টি আসন পেলেও সবচেয়ে বড় দল হিসেবে থাকতে পারে। কিন্তু সরকার গঠন ও ক্ষমতায় থাকার জন্য তাকে কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হবে।

মিত্রদের এক করার চেষ্টা
অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় জায়নবাদী দল বর্তমানে সাতটি আসন ধরে রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপে দলটির সম্ভাব্য আসনসংখ্যা শূন্য থেকে ছয়ের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
নেতানিয়াহুর সমর্থন ও সহযোগিতায় দলটি গত ১ সেপ্টেম্বর ছোট একটি দলের সঙ্গে প্রার্থী তালিকা একীভূত করেছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন ইহুদি শক্তি দল নেতানিয়াহুর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। বর্তমানে দলটির ছয়টি আসন রয়েছে। বেন-গভিরের যুক্তি, আলাদাভাবে নির্বাচন করলেই দলটি বেশি শক্তিশালী হবে।
এই বিভাজনই নেতানিয়াহুর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
নতুন মুখ ওফের উইন্টারও চিন্তার কারণ
ডানপন্থী শিবিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওফের উইন্টার। তার রাজনৈতিক অবস্থান স্মোটরিচের সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে উইন্টার অন্য দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, ২০২৩ সালের হামাসের হামলার আগে যে নিরাপত্তা ব্যর্থতা ঘটেছিল, তার জন্য দায়ী হতে পারেন এমন কারও সঙ্গে তিনি নির্বাচনী জোট করবেন না।
উইন্টার এবারের নির্বাচনকে পরিবর্তনের পক্ষে প্রতিবাদী ভোট হিসেবে তুলে ধরছেন। সর্বশেষ জরিপে তার দল চারটি আসন পেতে পারে, আবার কোনো আসন নাও পেতে পারে। নেতানিয়াহুর আশঙ্কা, তার দল সংসদে ঢোকার মতো ভোট না পেলে ডানপন্থী ভোটের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যাবে।
৭ অক্টোবরের হামলার ছায়া
২০২২ সালের নির্বাচনে বিভক্ত মধ্য-বামপন্থীদের বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ ডানপন্থী জোটের কারণে নেতানিয়াহু বড় জয় পেয়েছিলেন। এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সময় নিরাপত্তা ব্যর্থতার ঘটনায় নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের কঠোর নিরাপত্তাবাদী ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খায়। সমালোচকেরা তার দায় স্বীকার না করার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এরপর গাজা, ইরান ও লেবাননে একের পর এক যুদ্ধ হয়েছে। ইসরায়েল সামরিকভাবে কিছু সাফল্য পেলেও দীর্ঘমেয়াদি ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি—এমন ধারণা ভোটারদের একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এলের মতে, নেতানিয়াহু এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। ইসরায়েলের মানুষের মধ্যে যে গভীর ঐতিহাসিক সংকটের অনুভূতি তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে নেতানিয়াহুর নামও জড়িয়ে আছে।
গাদি আইজেনকটের উত্থান
নেতানিয়াহুর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বর্তমানে উঠে এসেছেন ইসরায়েলের সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকট। গাজায় তিনি নিজের এক সন্তানকে হারিয়েছেন।
তার নেতৃত্বাধীন ইয়াশার দল কয়েক মাস ধরে জনমত জরিপে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। কোনো কোনো জরিপে দলটি নেতানিয়াহুর লিকুদ দলের সমান অবস্থানে পৌঁছেছে, আবার কখনো তাকে ছাড়িয়েও গেছে।

তবে আইজেনকটের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। নির্বাচনের পর কোন দল কার সঙ্গে জোট করবে, সেটিই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণ করতে পারে।
বয়সও হয়ে উঠছে নেতানিয়াহুর জন্য প্রশ্ন
নেতানিয়াহুর বয়সও এবারের নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠছে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় তিনি ছিলেন তুলনামূলক তরুণ ও পরিবর্তনের প্রতীক। এখন বয়সের কারণে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতেও পরিবর্তন এসেছে।
বিশ্লেষক আসা-এল বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহু ছিলেন ইসরায়েলের কেনেডি; আর এখন তিনি ইসরায়েলের বাইডেন হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন।
নির্বাচনের আগে তাই নেতানিয়াহুর প্রধান লক্ষ্য শুধু নিজের দলকে শক্তিশালী করা নয়, বরং পুরো ডানপন্থী শিবিরের ভোট একত্র করা। সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়, সেটিই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















