১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আমেরিকা আসলে কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত? নিশ্চিতভাবে যুদ্ধ শেষ হবে না, বদলে যাবে যুদ্ধের ধরন রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প

নীল ডিভিশন: নাৎসি জার্মানির পাশে ফ্রাঙ্কোর গোপন যুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিল। তবে সেই নিরপেক্ষতার আড়ালেই দেশটির শাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো নানা উপায়ে নাৎসি জার্মানির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। সেই সমর্থনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিল ‘নীল ডিভিশন’, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জার্মান বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছিল।

১৯৪১ সালে নাৎসি বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নে অভিযান শুরু করলে ফ্রাঙ্কো এটিকে কমিউনিজমবিরোধী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখেন। জার্মান নেতা অ্যাডলফ হিটলারকে সহায়তা করার জন্য তিনি একটি বিশেষ সামরিক ইউনিট পাঠানোর প্রস্তাব দেন। কয়েক দিনের মধ্যেই স্পেনে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ শুরু হয় এবং প্রায় ১৮ হাজার মানুষ এতে যোগ দিতে নাম লেখান।

The Blue Division: Franco's Soldiers on the Eastern Front - History Guild

যুদ্ধের আহ্বানে সাড়া

এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর সদস্য, গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞ যোদ্ধা এবং ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীরা। জার্মানির বাভারিয়ায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তারা জার্মান সেনাবাহিনীর ২৫০তম পদাতিক ডিভিশনের অংশ হয়ে ওঠে। তবে তাদের নীল রঙের ইউনিফর্মের কারণে সবাই তাদের ‘নীল ডিভিশন’ নামেই চিনত।

জার্মান সেনাদের অনেকেই স্প্যানিশ যোদ্ধাদের শৃঙ্খলাহীন বলে সমালোচনা করতেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তারা দ্রুতই সাহস ও সহনশীলতার জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে। পূর্ব ফ্রন্টে যাওয়ার পথে তাদের ৬০০ মাইলেরও বেশি পথ হেঁটে অতিক্রম করতে হয়েছিল, যা সেই সময়ে বড় ধরনের সামরিক সহনশীলতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।

লেনিনগ্রাদের রক্তক্ষয়ী ফ্রন্ট

নীল ডিভিশনকে পাঠানো হয় লেনিনগ্রাদ অবরোধের যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে তারা তীব্র ঠান্ডা, রোগব্যাধি এবং খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়। জার্মান বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ সমস্যার কারণে রসদ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছিল। তারপরও দীর্ঘ সময় ধরে তারা সোভিয়েত রেড আর্মির বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে।

The Blue Division and the Spaniards Who Fought Against Stalin

১৯৪৩ সালের শুরুতে ক্রাসনি বর যুদ্ধে নীল ডিভিশনের প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য বিশাল সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে। প্রতিপক্ষের সৈন্যসংখ্যা ছিল তাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি, সঙ্গে ছিল ট্যাংক ও ভারী কামান। তবুও স্প্যানিশ যোদ্ধারা প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও সোভিয়েত অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়।

তাদের যুদ্ধসাহস দেখে হিটলার মন্তব্য করেছিলেন, এত নির্ভীক সৈনিক কল্পনা করাও কঠিন। মৃত্যুকেও তারা যেন উপেক্ষা করত।

ফ্রাঙ্কোর চাপ ও শেষ পরিণতি

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হতে থাকে, ততই মিত্রশক্তির চাপ বাড়তে থাকে স্পেনের ওপর। ফ্রাঙ্কোকে সৈন্য ফিরিয়ে এনে নিরপেক্ষতা পুনরায় নিশ্চিত করতে বলা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি নীল ডিভিশন ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে হাজার হাজার স্প্যানিশ যোদ্ধা দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়। কেউ ‘নীল লিজিয়ন’ নামে যুদ্ধ চালিয়ে যায়, আবার কেউ সরাসরি জার্মান বাহিনীর বিশেষ ইউনিটে যোগ দেয়। ধারণা করা হয়, মোট প্রায় ৪৭ হাজার স্প্যানিশ যোদ্ধা এই বাহিনীর অংশ ছিলেন এবং তাদের শেষ সদস্যরাও ১৯৪৫ সালে বার্লিন পতনের আগ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল।

স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকলেও নীল ডিভিশনের ইতিহাস দেখায়, সেই নিরপেক্ষতার আড়ালে ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতে দেশটির সম্পৃক্ততা কতটা গভীর ছিল।

The Blue Division and the Spaniards Who Fought Against Stalin

 

জনপ্রিয় সংবাদ

আমেরিকা আসলে কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

নীল ডিভিশন: নাৎসি জার্মানির পাশে ফ্রাঙ্কোর গোপন যুদ্ধ

১০:১৭:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিল। তবে সেই নিরপেক্ষতার আড়ালেই দেশটির শাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো নানা উপায়ে নাৎসি জার্মানির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। সেই সমর্থনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিল ‘নীল ডিভিশন’, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জার্মান বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছিল।

১৯৪১ সালে নাৎসি বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নে অভিযান শুরু করলে ফ্রাঙ্কো এটিকে কমিউনিজমবিরোধী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখেন। জার্মান নেতা অ্যাডলফ হিটলারকে সহায়তা করার জন্য তিনি একটি বিশেষ সামরিক ইউনিট পাঠানোর প্রস্তাব দেন। কয়েক দিনের মধ্যেই স্পেনে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ শুরু হয় এবং প্রায় ১৮ হাজার মানুষ এতে যোগ দিতে নাম লেখান।

The Blue Division: Franco's Soldiers on the Eastern Front - History Guild

যুদ্ধের আহ্বানে সাড়া

এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর সদস্য, গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞ যোদ্ধা এবং ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীরা। জার্মানির বাভারিয়ায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তারা জার্মান সেনাবাহিনীর ২৫০তম পদাতিক ডিভিশনের অংশ হয়ে ওঠে। তবে তাদের নীল রঙের ইউনিফর্মের কারণে সবাই তাদের ‘নীল ডিভিশন’ নামেই চিনত।

জার্মান সেনাদের অনেকেই স্প্যানিশ যোদ্ধাদের শৃঙ্খলাহীন বলে সমালোচনা করতেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তারা দ্রুতই সাহস ও সহনশীলতার জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে। পূর্ব ফ্রন্টে যাওয়ার পথে তাদের ৬০০ মাইলেরও বেশি পথ হেঁটে অতিক্রম করতে হয়েছিল, যা সেই সময়ে বড় ধরনের সামরিক সহনশীলতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।

লেনিনগ্রাদের রক্তক্ষয়ী ফ্রন্ট

নীল ডিভিশনকে পাঠানো হয় লেনিনগ্রাদ অবরোধের যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে তারা তীব্র ঠান্ডা, রোগব্যাধি এবং খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়। জার্মান বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ সমস্যার কারণে রসদ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছিল। তারপরও দীর্ঘ সময় ধরে তারা সোভিয়েত রেড আর্মির বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে।

The Blue Division and the Spaniards Who Fought Against Stalin

১৯৪৩ সালের শুরুতে ক্রাসনি বর যুদ্ধে নীল ডিভিশনের প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য বিশাল সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে। প্রতিপক্ষের সৈন্যসংখ্যা ছিল তাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি, সঙ্গে ছিল ট্যাংক ও ভারী কামান। তবুও স্প্যানিশ যোদ্ধারা প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও সোভিয়েত অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়।

তাদের যুদ্ধসাহস দেখে হিটলার মন্তব্য করেছিলেন, এত নির্ভীক সৈনিক কল্পনা করাও কঠিন। মৃত্যুকেও তারা যেন উপেক্ষা করত।

ফ্রাঙ্কোর চাপ ও শেষ পরিণতি

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হতে থাকে, ততই মিত্রশক্তির চাপ বাড়তে থাকে স্পেনের ওপর। ফ্রাঙ্কোকে সৈন্য ফিরিয়ে এনে নিরপেক্ষতা পুনরায় নিশ্চিত করতে বলা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি নীল ডিভিশন ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে হাজার হাজার স্প্যানিশ যোদ্ধা দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়। কেউ ‘নীল লিজিয়ন’ নামে যুদ্ধ চালিয়ে যায়, আবার কেউ সরাসরি জার্মান বাহিনীর বিশেষ ইউনিটে যোগ দেয়। ধারণা করা হয়, মোট প্রায় ৪৭ হাজার স্প্যানিশ যোদ্ধা এই বাহিনীর অংশ ছিলেন এবং তাদের শেষ সদস্যরাও ১৯৪৫ সালে বার্লিন পতনের আগ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল।

স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকলেও নীল ডিভিশনের ইতিহাস দেখায়, সেই নিরপেক্ষতার আড়ালে ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতে দেশটির সম্পৃক্ততা কতটা গভীর ছিল।

The Blue Division and the Spaniards Who Fought Against Stalin