রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা জোরদারে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বিভিন্ন দেশ। এরই সাম্প্রতিক উদাহরণ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের আগস্টের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। এই চুক্তি কার্যত অন্য দেশের পরমাণু প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নতুন প্রবণতা বা ‘নিউক্লিয়ার লিজিং’-এর দিকে ইঙ্গিত করছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তবে পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্রধারী হওয়ায় এর নিরাপত্তাগত তাৎপর্য অনেক গভীর।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতায় পরিবর্তন
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেছে। তুরস্ক আবার ন্যাটোর সদস্য। কিন্তু উভয় দেশের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা এখন আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক হয়ে ওঠার পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ভার নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ইরান যুদ্ধের প্রভাবও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনায় পরিবর্তন এনেছে।

ইউরোপেও বাড়ছে পরমাণু নির্ভরতা
‘নিউক্লিয়ার লিজিং’-এর প্রবণতা ইউরোপেও দেখা যাচ্ছে। মার্চে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ প্রথমবারের মতো জানান, ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তায় ফ্রান্সের পরমাণু সক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে।
আলোচনায় থাকা প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ইউরোপের কয়েকটি দেশে কিছু পরমাণু ওয়ারহেড মোতায়েন এবং পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের পরিস্থিতি ধরে যৌথ মহড়ার বিষয়ও রয়েছে। জার্মানি ও পোল্যান্ডসহ আটটি দেশ এতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে ফ্রান্সের উদ্যোগ ও মক্কা চুক্তির কাঠামো আলাদা। তবু দুটির মধ্যে একটি অভিন্ন প্রবণতা রয়েছে—পরমাণু অস্ত্র না থাকা দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে।
শীতল যুদ্ধের পর নতুন বাস্তবতা
অন্য দেশের পরমাণু প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নির্ভরতা নতুন নয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত সামরিক শক্তির পাশাপাশি দেশটির পরমাণু প্রতিরোধক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। ন্যাটোর মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও কানাডাও যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউক্লিয়ার আমব্রেলা’র আওতায় রয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতির পরিসর ভিন্ন। শীতল যুদ্ধের সময় পরমাণু প্রতিরোধের ব্যবস্থা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে ছিল। এখন ফ্রান্স ও পাকিস্তানও পরমাণু প্রতিরোধক্ষমতার সম্ভাব্য সরবরাহকারী হিসেবে সামনে আসছে। ফলে পরমাণু নিরাপত্তাতেও বহুমেরুকেন্দ্রিকতার প্রভাব পড়ছে।
রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্র বেলারুশে
বেলারুশ ২০২৩ সালে রাশিয়ার কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র নিজেদের ভূখণ্ডে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ‘নিউক্লিয়ার লিজিং’-এর আরেক ধরনের মডেল। এর মাধ্যমে বেলারুশ পরমাণু হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হওয়ার ঝুঁকি গ্রহণ করছে, বিনিময়ে প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো রাশিয়ার পরমাণু সক্ষমতাকে নিজের শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তায় কাজে লাগাতে চাইছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পরমাণু নির্ভরতার এই বিস্তার স্বল্পমেয়াদে কিছু দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ কমাতে পারে। নিজেদের পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনও এতে কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
র্যান্ড করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিজ্ঞানী স্কট হ্যারল্ডের মতে, পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো যত বেশি অংশীদারকে নিরাপত্তার ছাতার নিচে আনবে, তত বেশি দেশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো ধারাবাহিক সংঘাতের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে নতুন শঙ্কা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আবার আলোচনা শুরুর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। যদি দ্রুত রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসে, তাহলে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর কাছেও পরমাণু অস্ত্র অর্জন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
সেক্ষেত্রে কিছু দেশ নিজস্ব পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে যেতে পারে, আবার কেউ পরমাণু শক্তিধর দেশের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করতে পারে। এতে বিশ্ব আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরমাণু বিস্তারের যুগে প্রবেশ করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















