০২:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১৯১)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ জুন ২০২৫
  • 542

নজরুল

তারপর বহুদিন কবির কোনো চিঠি পাই নাই। ইনাইয়া-বিনাইয়া কবিকে কত কী লিখিয়াছি, কবি নিরুত্তর। হঠাৎ একখানা পত্র পাইলাম, কবি আমাকে ফরিদপুরের অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার নরেন্দ্র রায় মহাশয়ের পুত্রবধূ এবং তাঁর নাতি-নাতকুরদের বিষয়ে সমস্ত খবর লিখিয়া পাঠাইতে অনুরোধ করিয়াছেন। নরেন্দ্রবাবুর এক নাতি আমারই সহপাঠী ছিল। তাহার সঙ্গে গিয়া তাহার মায়ের সঙ্গে দেখা করিলাম।

ভদ্রমহিলা আমাকে আপন ছেলের মতোই গ্রহণ করিলেন। আমি তাঁহাকে মাসিমা বলিয়া ডাকিলাম। তাঁহাদের বাসায় গিয়া শুনতে পাইলাম, মাসিমার বড় বোন বিরজাসুন্দরী দেবীকে কবি মা বলিয়া ডাকেন। কবির বিষয়ে তিনি আরও অনেক কথা বলিলেন। সেই হইতে মাসিমা হইলেন কবির সঙ্গে আমার পরিচয়ের নূতন যোগসূত্র। কবি আমাকে পত্র লিখিতেন না। কিন্তু মাসিমার বড়বোন বিরজাসুন্দরী দেবীর নিকট হইতে নিয়মিত পত্র পাইতেন। সেইসব পত্র শুধু নজরুলের কথাতেই ভরতি থাকিত।

মাসিমা কবির প্রায় অধিকাংশ কবিতাই মুখস্থ বলিতে পারিতেন। নজরুলের প্রশংসা যে দিন খুব বেশি করিতাম, সেদিন মাসিমা আমাকে না-খাওয়াইয়া কিছুতেই আসিতে দিতেন না। মাসিমার গৃহটি ছিল রক্ষণশীল হিন্দু-পরিবারের। আজ বিস্ময় মনে হয়, কি করিয়া একজন মুসলিম কবির আরবি-ফারসি মিশ্রিত কবিতাগুলি গৃহ-বন্দিনী একটি হিন্দু-মহিলার মনে প্রভাব বিস্তার করিতে পারিয়াছিল।

নজরুলের রচিত ‘মহরম’ কবিতাটি কতবার আমি মাসিমাকে আবৃত্তি করিতে শুনিয়াছি। মাসিমার আবৃত্তি ছিল বড় মধুর। তাঁর চেহারাটি প্রতিমার মতো ঝকমক করিত। একবার আমি নজরুলের উপর একটি কবিতা রচনা করিয়া মাসিমাকে শুনাইয়াছিলাম। সেদিন মাসিমা আমাকে পিঠা খাওয়াইয়াছিলেন। সেই কবিতার ক’টি লাইন মনে আছে-

নজরুল ইসলাম।

তসলিম ওই নাম।

বাংলার বাদলায় ঘনঘোর ঝনঝায়,

কাঁপাইয়া সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষ,

দামামার দমদম লোহুময় গান গায়; সেই কালে মহাবীর তোমারে যে হেরিলাম,

আলোড়িত আসমান ধরণীর বক্ষ;

নজরুল ইসলাম।

নজরুল কাব্য-প্রতিভার যবনিকার অন্তরালে আমার এই মাসিমার এবং তাঁর বোনদের স্নেহসুধার দান যে কতখানি, তাহা কেহ কোনোদিন জানিতে পারিবে না। বৃক্ষ যখন শাখাবাহু বিস্তার করিয়া ফুলে-ফলে সমস্ত ধরণীকে সজ্জিত করে তখন সকলের দৃষ্টি সেই বৃক্ষটির উপর। যে গোপন মাটির স্তন্যধারা সেই বৃক্ষটিকে দিনে দিনে জীবনরস দান করে; কে তাহার সন্ধান রাখে?

চলবে…..

 

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১৯১)

১১:০০:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ জুন ২০২৫

নজরুল

তারপর বহুদিন কবির কোনো চিঠি পাই নাই। ইনাইয়া-বিনাইয়া কবিকে কত কী লিখিয়াছি, কবি নিরুত্তর। হঠাৎ একখানা পত্র পাইলাম, কবি আমাকে ফরিদপুরের অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার নরেন্দ্র রায় মহাশয়ের পুত্রবধূ এবং তাঁর নাতি-নাতকুরদের বিষয়ে সমস্ত খবর লিখিয়া পাঠাইতে অনুরোধ করিয়াছেন। নরেন্দ্রবাবুর এক নাতি আমারই সহপাঠী ছিল। তাহার সঙ্গে গিয়া তাহার মায়ের সঙ্গে দেখা করিলাম।

ভদ্রমহিলা আমাকে আপন ছেলের মতোই গ্রহণ করিলেন। আমি তাঁহাকে মাসিমা বলিয়া ডাকিলাম। তাঁহাদের বাসায় গিয়া শুনতে পাইলাম, মাসিমার বড় বোন বিরজাসুন্দরী দেবীকে কবি মা বলিয়া ডাকেন। কবির বিষয়ে তিনি আরও অনেক কথা বলিলেন। সেই হইতে মাসিমা হইলেন কবির সঙ্গে আমার পরিচয়ের নূতন যোগসূত্র। কবি আমাকে পত্র লিখিতেন না। কিন্তু মাসিমার বড়বোন বিরজাসুন্দরী দেবীর নিকট হইতে নিয়মিত পত্র পাইতেন। সেইসব পত্র শুধু নজরুলের কথাতেই ভরতি থাকিত।

মাসিমা কবির প্রায় অধিকাংশ কবিতাই মুখস্থ বলিতে পারিতেন। নজরুলের প্রশংসা যে দিন খুব বেশি করিতাম, সেদিন মাসিমা আমাকে না-খাওয়াইয়া কিছুতেই আসিতে দিতেন না। মাসিমার গৃহটি ছিল রক্ষণশীল হিন্দু-পরিবারের। আজ বিস্ময় মনে হয়, কি করিয়া একজন মুসলিম কবির আরবি-ফারসি মিশ্রিত কবিতাগুলি গৃহ-বন্দিনী একটি হিন্দু-মহিলার মনে প্রভাব বিস্তার করিতে পারিয়াছিল।

নজরুলের রচিত ‘মহরম’ কবিতাটি কতবার আমি মাসিমাকে আবৃত্তি করিতে শুনিয়াছি। মাসিমার আবৃত্তি ছিল বড় মধুর। তাঁর চেহারাটি প্রতিমার মতো ঝকমক করিত। একবার আমি নজরুলের উপর একটি কবিতা রচনা করিয়া মাসিমাকে শুনাইয়াছিলাম। সেদিন মাসিমা আমাকে পিঠা খাওয়াইয়াছিলেন। সেই কবিতার ক’টি লাইন মনে আছে-

নজরুল ইসলাম।

তসলিম ওই নাম।

বাংলার বাদলায় ঘনঘোর ঝনঝায়,

কাঁপাইয়া সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষ,

দামামার দমদম লোহুময় গান গায়; সেই কালে মহাবীর তোমারে যে হেরিলাম,

আলোড়িত আসমান ধরণীর বক্ষ;

নজরুল ইসলাম।

নজরুল কাব্য-প্রতিভার যবনিকার অন্তরালে আমার এই মাসিমার এবং তাঁর বোনদের স্নেহসুধার দান যে কতখানি, তাহা কেহ কোনোদিন জানিতে পারিবে না। বৃক্ষ যখন শাখাবাহু বিস্তার করিয়া ফুলে-ফলে সমস্ত ধরণীকে সজ্জিত করে তখন সকলের দৃষ্টি সেই বৃক্ষটির উপর। যে গোপন মাটির স্তন্যধারা সেই বৃক্ষটিকে দিনে দিনে জীবনরস দান করে; কে তাহার সন্ধান রাখে?

চলবে…..