০৯:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৩৮)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৪
  • 131

রাঙাছুটুর বাপের বাড়ি

ধড়মড় করিয়া উঠিয়া যাই। ও-কোণের বারান্দা হইতে বাঁশের বড় কোটাটি লই। তারপর প্রথমে যাই নাভিওয়ালা আমগাছতলায়। সেখানে কত আম পড়িয়া আছে-একটা, দুইটা, তিনটা আরও-আরও আরও। কুড়াইয়া কুড়াইয়া সাজি ভরি। তারপর বর্ণচোরা আমের গাছতলায়। গাছে আম পাকিয়া আছে। কিন্তু চিনিবার জো নাই। পাকিয়া লালও হয় না, তলায়ও পড়ে না। গাছে উঠিয়া টিপিয়া টিপিয়া পাড়িতে হয়। গেদা ভালো গাছে উঠিতে পারে। আমি তলায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া আম কুড়াই। তারপর চিনিচম্পা গাছের আম। একেবারে চিনির মতো মিষ্টি। আর এমন রং। সেখান হইতে ছুটিয়া যাই সিঁদুরে-আম গাছের তলায়। এত উপরে উঠিয়াছে গাছটি যেন আকাশ ছুঁইবে। চারিধার হইতে বেতের কাঁটাতলায় জঙ্গল হইয়া আছে এর তলা।
বেতের গাছ সরাইয়া সরাইয়া গাছের নিচে যাই। পাখিতে আধেক-খাওয়া দুই-তিনটা আম কুড়াইয়া পাই। কিন্তু গাছে উঠিবে কে? আগডালে সুন্দর সুন্দর সিঁদুরে-আম ঝুলিতেছে। গেদা এত বড় গাছেও উঠিতে পারে, কিন্তু গাছ ভরিয়া বাসা করিয়া আছে লাল পিঁপড়া। কে যাইবে এই গাছে। আমাদের হাতের ঢিল অতদূরে যায় না। নানির লম্বা বাঁশের হস্কাটা লইয়া আসি। হস্কার আগায় কোটা বাঁধিয়া দুইজনে গাছের উপরের ডালে আটকাইয়া ঝাঁকি দেই। রাশি রাশি আম আসিয়া তলায় পড়ে-দুই-একটা গাছে আসিয়াও লাগে। কিন্তু কে তখন তাহা লক্ষ করে। ওই একটা-ওই একটা, কুড়াইয়া কুড়াইয়া সাধ মেটে না। ধামা ভরিয়া আম কুড়াইয়া বাড়ি ফিরি। নানি বলেন, “আমার ভাই আসিয়াছে বলিয়াই তো এত আম পাইলাম।”
কিন্তু এত আম কে খাইবে? সকলের বাড়িতেই গাছ-ভরা আম। হাটে-বাজারে কেউ বড় আম কিনিতে আসে না। ফরিদপুরের হাট সেই কত দূরে। যাইতে এক দুপুর লাগে। দিন যাইয়া দিন ফিরিয়া আসা যায়। সেখানে বেশি দামে আম বিক্রি হয়। কিন্তু ভালো রাস্তাঘাট নাই বলিয়া কে লইয়া যাইবে মাথায় করিয়া অত দূরের পথে।
নানিকে আমরা বড়-বু বলিয়া ডাকিতাম। আমার ভাইদের মধ্যে কে তাঁহাকে বড়-বু বলিয়া প্রথম ডাকিয়াছিল জানি না। আমার বোনদের ছেলেমেয়ে হইলে মা তাহাদের শিখাইয়া দিতেন, আমাকে বড়-বু বলিয়া ডাকিস। কিন্তু তাহারা মাকে নানি বলিয়াই ডাকিত। মা হয়তো তাঁর মায়ের প্রতি আমাদের বড়-বু ডাকটির অধিকারিণী হইতে চাহিয়াছিলেন।
বড়-বু আমাদের কুড়ানো সমস্ত আমের গোলা করিয়া কুলার উপর, ডালার উপর শুখাইতে দিতেন। সমস্ত উঠানটা নকশায় নকশায় ভরিয়া যাইত, বং-বেরঙের আমসত্ত্বে। সেই আমসত্ত্ব নানি আমাদের তো দিতেনই, বাকিটা যত্ন করিয়া হাঁড়িতে ভরিয়া রাখিতেন। আমরা আমাদের বাড়ি গোবিন্দপুরে আসিলে নানা আমাদিগকে দেখিতে আসিবার সময় সেই আমসত্ত্ব সঙ্গে লইয়া আসিতেন। আমরা যখন তাহা কাড়াকাড়ি করিয়া খাইতাম তখন তৃপ্তির খুশিতে বৃদ্ধের মুখখানি ভরিয়া উঠিত। বাড়ি ফিরিয়া হয়তো তিনি আরও জৌলুস করিয়া এইসব কথা নানিকে বলিতেন।

চলবে…

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৩৮)

১১:০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৪

রাঙাছুটুর বাপের বাড়ি

ধড়মড় করিয়া উঠিয়া যাই। ও-কোণের বারান্দা হইতে বাঁশের বড় কোটাটি লই। তারপর প্রথমে যাই নাভিওয়ালা আমগাছতলায়। সেখানে কত আম পড়িয়া আছে-একটা, দুইটা, তিনটা আরও-আরও আরও। কুড়াইয়া কুড়াইয়া সাজি ভরি। তারপর বর্ণচোরা আমের গাছতলায়। গাছে আম পাকিয়া আছে। কিন্তু চিনিবার জো নাই। পাকিয়া লালও হয় না, তলায়ও পড়ে না। গাছে উঠিয়া টিপিয়া টিপিয়া পাড়িতে হয়। গেদা ভালো গাছে উঠিতে পারে। আমি তলায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া আম কুড়াই। তারপর চিনিচম্পা গাছের আম। একেবারে চিনির মতো মিষ্টি। আর এমন রং। সেখান হইতে ছুটিয়া যাই সিঁদুরে-আম গাছের তলায়। এত উপরে উঠিয়াছে গাছটি যেন আকাশ ছুঁইবে। চারিধার হইতে বেতের কাঁটাতলায় জঙ্গল হইয়া আছে এর তলা।
বেতের গাছ সরাইয়া সরাইয়া গাছের নিচে যাই। পাখিতে আধেক-খাওয়া দুই-তিনটা আম কুড়াইয়া পাই। কিন্তু গাছে উঠিবে কে? আগডালে সুন্দর সুন্দর সিঁদুরে-আম ঝুলিতেছে। গেদা এত বড় গাছেও উঠিতে পারে, কিন্তু গাছ ভরিয়া বাসা করিয়া আছে লাল পিঁপড়া। কে যাইবে এই গাছে। আমাদের হাতের ঢিল অতদূরে যায় না। নানির লম্বা বাঁশের হস্কাটা লইয়া আসি। হস্কার আগায় কোটা বাঁধিয়া দুইজনে গাছের উপরের ডালে আটকাইয়া ঝাঁকি দেই। রাশি রাশি আম আসিয়া তলায় পড়ে-দুই-একটা গাছে আসিয়াও লাগে। কিন্তু কে তখন তাহা লক্ষ করে। ওই একটা-ওই একটা, কুড়াইয়া কুড়াইয়া সাধ মেটে না। ধামা ভরিয়া আম কুড়াইয়া বাড়ি ফিরি। নানি বলেন, “আমার ভাই আসিয়াছে বলিয়াই তো এত আম পাইলাম।”
কিন্তু এত আম কে খাইবে? সকলের বাড়িতেই গাছ-ভরা আম। হাটে-বাজারে কেউ বড় আম কিনিতে আসে না। ফরিদপুরের হাট সেই কত দূরে। যাইতে এক দুপুর লাগে। দিন যাইয়া দিন ফিরিয়া আসা যায়। সেখানে বেশি দামে আম বিক্রি হয়। কিন্তু ভালো রাস্তাঘাট নাই বলিয়া কে লইয়া যাইবে মাথায় করিয়া অত দূরের পথে।
নানিকে আমরা বড়-বু বলিয়া ডাকিতাম। আমার ভাইদের মধ্যে কে তাঁহাকে বড়-বু বলিয়া প্রথম ডাকিয়াছিল জানি না। আমার বোনদের ছেলেমেয়ে হইলে মা তাহাদের শিখাইয়া দিতেন, আমাকে বড়-বু বলিয়া ডাকিস। কিন্তু তাহারা মাকে নানি বলিয়াই ডাকিত। মা হয়তো তাঁর মায়ের প্রতি আমাদের বড়-বু ডাকটির অধিকারিণী হইতে চাহিয়াছিলেন।
বড়-বু আমাদের কুড়ানো সমস্ত আমের গোলা করিয়া কুলার উপর, ডালার উপর শুখাইতে দিতেন। সমস্ত উঠানটা নকশায় নকশায় ভরিয়া যাইত, বং-বেরঙের আমসত্ত্বে। সেই আমসত্ত্ব নানি আমাদের তো দিতেনই, বাকিটা যত্ন করিয়া হাঁড়িতে ভরিয়া রাখিতেন। আমরা আমাদের বাড়ি গোবিন্দপুরে আসিলে নানা আমাদিগকে দেখিতে আসিবার সময় সেই আমসত্ত্ব সঙ্গে লইয়া আসিতেন। আমরা যখন তাহা কাড়াকাড়ি করিয়া খাইতাম তখন তৃপ্তির খুশিতে বৃদ্ধের মুখখানি ভরিয়া উঠিত। বাড়ি ফিরিয়া হয়তো তিনি আরও জৌলুস করিয়া এইসব কথা নানিকে বলিতেন।

চলবে…