০৬:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৪৮)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৪
  • 163

রাঙাছুটুর বাপের বাড়ি

সেই ঢ্যাপের খই-এর মোয়া খাইতে খাইতে নানির কত আদরের কথা মনে পড়িয়াছে। সেবার নানাবাড়ি গেলাম। বোধহয় জ্যৈষ্ঠমাসে। নানি কত আদর করিয়া আমাদের গ্রহণ করিলেন। মা নানিকে দেখিয়া বলিলেন, “মা। তোমার শরীর এবার বড্ড খারাপ হইয়াছে। আমাদের জন্য এটা-ওটা পিঠা বানাইয়া আর খাটিতে পারিবে না।” নানি কি তাই শোনেন।

আজ বানান পাকান পিঠা, কাল বানান চিতই পিঠা। যে যে খাবার মায়ের পছন্দ, নানি কত যত্ন করিয়া সেই সেই খাবার তৈরি করেন। তারপর রাত ভরিয়া মেয়ে আর মায়ের কথা। সে-কথা কি নানির ফুরাইতে চাহে? সকালের মোরগ যখন ডাকে তখনও জাগিয়া উঠিয়া শুনি তাঁদের কথা শেষ হয় নাই। সেই কবে আমাদের দেশ হইতে ভিখারি আসিয়াছিল। তার নিকটে নানি শুনিলেন, রাঙাছুটুর শরীর ভালো নাই। দেশের জমিতে ধান জন্মে নাই। জামাইকে কিনিয়া খাইতে হয়। নানি নানাকে বলিয়া দুইটি ঘোড়া বোঝাই ধান গোবিন্দপুর পাঠাইয়া দিলেন। এদেশ হইতে বুনো-মেয়েরা ওদেশে ভিক্ষা করিতে যায়। তাহাদের তিন তিন সের চাউল দিয়া নানি বলিয়া দিয়াছিলেন, রাঙাছুটুকে যেন দেখিয়া আসে। মা বলিলেন, “সেই বুনো-মেয়েরা আমাকে একছড়া পুঁতির মালা দিয়া আসিয়াছিল। মা! তুমি কি সুন্দর

করিয়া পুঁতির মালা গাঁথিতে পার। গলায় পরিলে যে দেখে সে-ই তারিফ করে।” শুনিয়া কত তৃপ্তিতে যেন নানির মন ভরিয়া গেল। সেকালে চিঠি লেখার প্রচলন ছিল না। ভিখারিদের সামান্য কিছু ভিক্ষা বেশি দিয়া মায়ের সঙ্গে নানির খবরাখবরের আদান-প্রদান হইত। আমাদের গাঁয়ের পাশে শোভারামপুরে ছিল তিন-চারজন ভিখারিণী। তাহাদের বলিয়া-কহিয়া মাঝে মাঝে মা নানাবাড়ির দেশে খবর পাঠাইতেন। তাহারা যখন ফিরিয়া আসিত কি আগ্রহে মা তাহাদের কাছে নানা প্রশ্ন করিয়া তাঁর মা-বাপের খবর শুনিতেন। শুধু কি নানা-নানির কথা। নানাবাড়ির নারকেল গাছে কিরকম ডাব ধরিয়াছে? সিঁদুরে-আমের গাছে কিরূপ মুকুল ধরিয়াছে? ফেলিরা কেমন আছে, মাতবরের মেয়ে আমার কথা কিছু জিজ্ঞাসা করিল নাকি? এমনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন করিয়া মা তাঁর বাপের বাড়ির সবকিছুকে যেন পটে আঁকিয়া লইতেন।

সেদিন নানি যাইবেন পিঠার জন্য চাউল কুটিতে। মা কত বারণ করিলেন, “তোমার শরীর খারাপ। কিছুতেই তুমি এত চাউল কুটিতে পারিবে না।” নানি কি বারণ শোনেন? মা তখন বলিলেন, “মা! তুমি তবে আলাও। আমি ঢেঁকিতে পার দিয়া দেই। নইলে কিছুতেই তোমাকে ঢেঁকির উপর যাইতে দিব না।” অনেক বাদ-প্রতিবাদের পরে নানি পিঠার গুঁড়া আলাইতে রাজি হইলেন। দুপুরবেলা চাউল কোটা আরম্ভ করিয়া প্রায় সন্ধ্যা হইয়া আসিল। আর সামান্য কয়টা চাউল আছে। কয়েক পার দিলেই গুঁড়া হইয়া যাইবে। এমন সময় অসাবধানে ঢেঁকির একটি পার নানির হাতের একটি আঙুলে লাগিয়া আঙুলটি ছেঁচিয়া গেল। পাছে মা দুঃখ পান, নানি সেই হাতের ব্যথায় একটুও আহা-উহু করিলেন না।

চলবে…

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৪৮)

১১:০০:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৪

রাঙাছুটুর বাপের বাড়ি

সেই ঢ্যাপের খই-এর মোয়া খাইতে খাইতে নানির কত আদরের কথা মনে পড়িয়াছে। সেবার নানাবাড়ি গেলাম। বোধহয় জ্যৈষ্ঠমাসে। নানি কত আদর করিয়া আমাদের গ্রহণ করিলেন। মা নানিকে দেখিয়া বলিলেন, “মা। তোমার শরীর এবার বড্ড খারাপ হইয়াছে। আমাদের জন্য এটা-ওটা পিঠা বানাইয়া আর খাটিতে পারিবে না।” নানি কি তাই শোনেন।

আজ বানান পাকান পিঠা, কাল বানান চিতই পিঠা। যে যে খাবার মায়ের পছন্দ, নানি কত যত্ন করিয়া সেই সেই খাবার তৈরি করেন। তারপর রাত ভরিয়া মেয়ে আর মায়ের কথা। সে-কথা কি নানির ফুরাইতে চাহে? সকালের মোরগ যখন ডাকে তখনও জাগিয়া উঠিয়া শুনি তাঁদের কথা শেষ হয় নাই। সেই কবে আমাদের দেশ হইতে ভিখারি আসিয়াছিল। তার নিকটে নানি শুনিলেন, রাঙাছুটুর শরীর ভালো নাই। দেশের জমিতে ধান জন্মে নাই। জামাইকে কিনিয়া খাইতে হয়। নানি নানাকে বলিয়া দুইটি ঘোড়া বোঝাই ধান গোবিন্দপুর পাঠাইয়া দিলেন। এদেশ হইতে বুনো-মেয়েরা ওদেশে ভিক্ষা করিতে যায়। তাহাদের তিন তিন সের চাউল দিয়া নানি বলিয়া দিয়াছিলেন, রাঙাছুটুকে যেন দেখিয়া আসে। মা বলিলেন, “সেই বুনো-মেয়েরা আমাকে একছড়া পুঁতির মালা দিয়া আসিয়াছিল। মা! তুমি কি সুন্দর

করিয়া পুঁতির মালা গাঁথিতে পার। গলায় পরিলে যে দেখে সে-ই তারিফ করে।” শুনিয়া কত তৃপ্তিতে যেন নানির মন ভরিয়া গেল। সেকালে চিঠি লেখার প্রচলন ছিল না। ভিখারিদের সামান্য কিছু ভিক্ষা বেশি দিয়া মায়ের সঙ্গে নানির খবরাখবরের আদান-প্রদান হইত। আমাদের গাঁয়ের পাশে শোভারামপুরে ছিল তিন-চারজন ভিখারিণী। তাহাদের বলিয়া-কহিয়া মাঝে মাঝে মা নানাবাড়ির দেশে খবর পাঠাইতেন। তাহারা যখন ফিরিয়া আসিত কি আগ্রহে মা তাহাদের কাছে নানা প্রশ্ন করিয়া তাঁর মা-বাপের খবর শুনিতেন। শুধু কি নানা-নানির কথা। নানাবাড়ির নারকেল গাছে কিরকম ডাব ধরিয়াছে? সিঁদুরে-আমের গাছে কিরূপ মুকুল ধরিয়াছে? ফেলিরা কেমন আছে, মাতবরের মেয়ে আমার কথা কিছু জিজ্ঞাসা করিল নাকি? এমনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন করিয়া মা তাঁর বাপের বাড়ির সবকিছুকে যেন পটে আঁকিয়া লইতেন।

সেদিন নানি যাইবেন পিঠার জন্য চাউল কুটিতে। মা কত বারণ করিলেন, “তোমার শরীর খারাপ। কিছুতেই তুমি এত চাউল কুটিতে পারিবে না।” নানি কি বারণ শোনেন? মা তখন বলিলেন, “মা! তুমি তবে আলাও। আমি ঢেঁকিতে পার দিয়া দেই। নইলে কিছুতেই তোমাকে ঢেঁকির উপর যাইতে দিব না।” অনেক বাদ-প্রতিবাদের পরে নানি পিঠার গুঁড়া আলাইতে রাজি হইলেন। দুপুরবেলা চাউল কোটা আরম্ভ করিয়া প্রায় সন্ধ্যা হইয়া আসিল। আর সামান্য কয়টা চাউল আছে। কয়েক পার দিলেই গুঁড়া হইয়া যাইবে। এমন সময় অসাবধানে ঢেঁকির একটি পার নানির হাতের একটি আঙুলে লাগিয়া আঙুলটি ছেঁচিয়া গেল। পাছে মা দুঃখ পান, নানি সেই হাতের ব্যথায় একটুও আহা-উহু করিলেন না।

চলবে…