চীনের অনলাইন বাণিজ্যে দীর্ঘদিনের খাবার ও পানীয় সরবরাহের ভর্তুকিনির্ভর মূল্যযুদ্ধ অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ভোক্তাদের কেনাকাটার অভ্যাসে। এখন খাবারের পাশাপাশি ওষুধ, ফুল, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক পণ্যসহ নানা ধরনের পণ্যও এক ঘণ্টার মধ্যে হাতে পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
এক ঘণ্টায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার নতুন অভ্যাস
গত এক বছরে চীনের বড় অনলাইন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে মূল্যছাড়, বিনা খরচে সরবরাহ এবং ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের প্রণোদনায়। এর ফলে দ্রুত পণ্য সরবরাহভিত্তিক খুচরা বাণিজ্য এখন অনলাইন কেনাকাটার নতুন প্রধান প্রতিযোগিতাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই দ্রুত সরবরাহভিত্তিক বাজারের আকার ১ দশমিক ২ লাখ কোটি ইউয়ানে পৌঁছাতে পারে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত এ বাজার বছরে গড়ে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে বড় শহরের ক্রেতাদের মধ্যে এক ঘণ্টার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে প্রসাধনী পর্যন্ত হাতে পাওয়ার প্রত্যাশা দ্রুত বাড়ছে। খাবার ও পানীয় সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত অ্যাপগুলোতে ঘন ঘন ক্রেতাদের আনাগোনা এখন অন্য পণ্য বিক্রির সুযোগও তৈরি করছে।

প্রয়োজন মনে হলেই কিনে ফেলার প্রবণতা
বেইজিংয়ের বাসিন্দা জিয়াং ইয়ানশিন সম্প্রতি বন্ধুদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে যাওয়ার পথে একটি জনপ্রিয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের চরিত্রভিত্তিক পুতুলের অর্ডার দেন। তিনি রেস্তোরাঁয় পৌঁছানোর আগেই সরবরাহকারী পণ্যটি সেখানে পৌঁছে দেন।
জিয়াং বলেন, এভাবে কেনাকাটা করাই এখন তাঁর কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কোনো কিছু মনে হলেই তিনি কিনে ফেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই হাতে পেয়ে যান।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় শহরের ক্রেতারা ইতোমধ্যে দ্রুত সরবরাহের এই ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এটি শুধু খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবসা নয়; বরং প্রচলিত দোকান ও সরবরাহব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপনের একটি বড় সুযোগ।
ভর্তুকির মূল্যযুদ্ধের বড় খরচ
তবে এই পরিবর্তনের পেছনে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় ছিল বিপুল। গত বছর কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান খাবার সরবরাহের বাজার দখলে রাখতে ব্যাপক মূল্যছাড় ও ভর্তুকি দিয়েছে। এতে ক্রেতারা লাভবান হলেও ছোট রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বেড়েছে।
চীনের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাও প্রতিযোগিতার ধরন নিয়ে একাধিকবার বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছে। ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সরবরাহকর্মীদের স্বার্থ রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে খাবার সরবরাহের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ৩৬০ কোটি ইউয়ান জরিমানাও করা হয়।
ভর্তুকির এই প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের ওপরও বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছিল। গত বছর একটি বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লোকসানে চলে যায়, আরেকটির মুনাফা কমে যায় এবং অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

এখন লক্ষ্য ভর্তুকি নয়, মুনাফা
মূল্যযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে লক্ষ্য ছিল নতুন ক্রেতা ও ব্যবহারকারী আকর্ষণ করা। এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য সেই ব্যবহারকারীদের ধরে রেখে তাদের কাছ থেকে বেশি লাভজনক পণ্য বিক্রি করা।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের দ্রুত সরবরাহভিত্তিক বাণিজ্য থেকে আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৩৩০ কোটি ইউয়ানে পৌঁছেছে। অন্যদিকে আরেক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এই খাতে তাদের লোকসান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ভর্তুকি কমে আসায় বাজারের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটিও প্রায় এক বছর পর সামগ্রিকভাবে মুনাফায় ফিরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। প্রথম পর্যায়ে ভর্তুকি দিয়ে ক্রেতা সংগ্রহ করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের ধরে রাখা, পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো এবং প্রতিটি অর্ডার থেকে প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ কতটা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গুদাম ও সুপারমার্কেটেই নতুন লড়াই
নতুন প্রতিযোগিতায় প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু মূল্যছাড়ের ওপর নির্ভর করছে না। বরং তারা সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তুলছে।
কেউ দ্রুত পণ্য পৌঁছে দিতে সুপারমার্কেটের নেটওয়ার্ক বাড়াচ্ছে। কেউ আবার শুধু অনলাইন অর্ডার পূরণের জন্য আলাদা দোকান ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সরবরাহের গুদাম তৈরি করছে। লক্ষ্য একটাই—অর্ডার পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব পণ্য ক্রেতার হাতে পৌঁছে দেওয়া।
ফলে চীনের অনলাইন বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার ধরনও বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে কে সবচেয়ে বেশি মূল্যছাড় দিতে পারে, সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন; এখন সেখানে প্রশ্ন হচ্ছে কে সবচেয়ে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও লাভজনকভাবে পণ্য পৌঁছে দিতে পারে।
এই পরিবর্তন শুধু ব্যবসার ধরন বদলাচ্ছে না, ক্রেতাদের প্রত্যাশাও স্থায়ীভাবে পাল্টে দিচ্ছে। অনলাইনে অর্ডার করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার বদলে এখন অনেক চীনা ক্রেতাই মনে করছেন—প্রয়োজন হলে পণ্যটি এক ঘণ্টার মধ্যেই পাওয়া উচিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















