হাজার বছর ধরে ভারতীয়রা পনির এড়িয়ে চলেছেন। গরুকে পবিত্র মনে করা হিন্দু সমাজে দুধ টক করে দই বানানো স্বাভাবিক ছিল, তবে বাছুরের পাকস্থলী থেকে পাওয়া উৎসেচক দিয়ে দুধ পাকিয়ে পনির বানানোকে ইউরোপীয় রীতি হিসেবে দেখা হতো, যা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর ঠেকত। ছাগল বা ভেড়ার দুধের পনিরও তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। এমনকি আজও ঝাঁজালো স্বাদের পনির দিলে বয়স্ক ভারতীয়রা মুখ ফিরিয়ে নেন, অথচ তরকারিতে ব্যবহৃত নরম পনির তাদের কাছে পরিচিত।
তবে এখন বদলাচ্ছে সেই চিত্র। বিশ্বের বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদক দেশ ভারত বছরে প্রায় ২৫ কোটি টন দুধ উৎপাদন করে, যা বিশ্বের মোট সরবরাহের এক-চতুর্থাংশ। দেশটির মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিদেশি খাবারের প্রতি ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠছে, আর কম আয়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাসও বদলে দিচ্ছে ফাস্ট ফুড সংস্কৃতি। ফলে ভারতে এখন পনিরের বাজারে জোয়ার এসেছে। প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই বাজার বছরে প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
দিল্লির সাধারণ কোনো সুপারমার্কেটে গেলেই এখন পাঁচ থেকে ছয় ধরনের পনির চোখে পড়ে, দেশীয়ভাবে তৈরি মোজারেলা, চেডার আর ফেটাসহ। বেশিরভাগ ব্র্যান্ড নিজেদের বিনয়ীভাবে “মেল্টিং চিজ” বলে পরিচয় দেয়। দুগ্ধ খাতের বড় প্রতিষ্ঠান আমুল এই বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কুইক ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম ব্লিংকিটে তাদের পাঁচশ গ্রামের “চিজ ব্লক” পাওয়া যায় মাত্র তিনশ রুপিতে, প্রায় সোয়া তিন ডলার।
খাদ্যবিষয়ক লেখক তানুশ্রী ভৌমিকের ভাষায়, বেশিরভাগ ভারতীয়র জন্য পিৎজাই ছিল পনিরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের মাধ্যম। মার্কিন প্রতিষ্ঠান পিৎজা হাট তিন দশক আগে ভারতে প্রথম শাখা খোলে, এখন যার সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি। অনেক পরিবার এখন বাড়িতেই দোকান থেকে কেনা পিৎজা বেস বা আগের দিনের চাপাতি দিয়ে পিৎজা বানান। পনির মাখানো বার্গার, র্যাপ আর স্যান্ডউইচও এখন সাধারণ খাবারের তালিকায়।
চলতি বছরের এপ্রিলে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এলেফথেরিয়া তাদের ব্রি পনিরের জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার জেতে। তবে খাদ্যরসিকরা আসলে উদযাপন করছেন দেশীয় পনিরের পুনরুত্থান, যেমন ধোঁয়াটে স্বাদের ইয়াক পনির চুরপি, নোনতা ও মচমচে কালারি এবং নরম কালিমপং পনির। দিল্লির অভিজাত রেস্তোরাঁ অলিভে এই তিনটিই মেনুতে রাখা হয়েছে। রেস্তোরাঁর প্রধান শেফ ধ্রুব ওবেরয় বলছেন, আগে তাকে আমদানি করা উপকরণের ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন তার বেশিরভাগ পদেই ব্যবহৃত হয় দেশীয় পণ্য। তার ক্রেতারাও খুশি মনে এই পরিবর্তন মেনে নিয়েছেন।
ভারতের এই পনির বিপ্লব শুধু একটি খাদ্যাভ্যাসের বদল নয়, বরং প্রমাণ করে কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিশ্বায়ন একটি প্রাচীন সংস্কৃতির খাদ্যরুচিও বদলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















