ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দীর্ঘ ও সতর্ক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শনিবার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে তাদের বৈঠক হওয়ার কথা। সাত বছর পর শির ভারত সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ২০২০ সালের লাদাখ সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হওয়া গভীর অবিশ্বাস পুরোপুরি কাটেনি।
শির সর্বশেষ ভারত সফর ছিল ২০১৯ সালে। এরপর পূর্ব লাদাখে ভারত ও চীনের সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পর্যায়ে নিয়ে যায়। গত দুই বছরে সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি যোগাযোগ পুনরুদ্ধারে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে সীমান্ত বিরোধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি এখনো সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে।
সীমান্তে শান্তিই সম্পর্ক স্বাভাবিকের ভিত্তি

২০২৪ সালের অক্টোবরে লাদাখের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অচলাবস্থা কাটাতে দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। এর পর রাশিয়ায় মোদি ও শির বৈঠক হয় এবং সীমান্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
এরপর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু হয়েছে। কৈলাস মানস সরোবর যাত্রাও আবার শুরু হয়েছে। নির্ধারিত তিনটি সীমান্তপথে ঐতিহ্যবাহী সীমান্ত বাণিজ্য ফের চালু হয়েছে। চীনা নাগরিকদের জন্য ভারতের ভিসা প্রক্রিয়াতেও কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে।
তবে এসব পদক্ষেপকে স্থায়ী স্বাভাবিকতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ এখনো সীমিত। আগস্টে বেইজিংয়ে এক বৈঠকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল স্পষ্ট করেছেন, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বাভাবিকতার সরাসরি যোগ রয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির জন্য প্রথম শর্ত এখনো সীমান্ত পরিস্থিতিই।
চীনের পক্ষ থেকেও যোগাযোগ বাড়ানো এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দুই দেশকে ভালো প্রতিবেশী ও পরস্পরের সাফল্যে সহায়ক অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব কমানোই এখন মূল পরীক্ষা।
অরুণাচল প্রদেশে পুরোনো বিরোধের নতুন চাপ
লাদাখে উত্তেজনা কমলেও ভারত-চীন সীমান্তের সব জায়গায় পরিস্থিতি একই রকম স্থিতিশীল নয়। জুলাইয়ে অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি জেলার তাকসিং এলাকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানের খবর প্রকাশিত হয়।

ভারত ওই ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ্যে জানায়নি। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগস্টে দাবি করে, সীমান্ত পরিস্থিতি তখন মোটের ওপর স্থিতিশীল। একই সঙ্গে দুই পক্ষই ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল হিসাবের ঝুঁকি এড়াতে কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।
৭ সেপ্টেম্বর অরুণাচল প্রদেশের কিবিথু সেক্টরের ওয়াচা-দামাই সীমান্ত বৈঠকস্থলে দুই দেশের কোর কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকও হয়েছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর পূর্বাঞ্চলে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সামরিক যোগাযোগ।
অরুণাচল নিয়ে ভারতের অবস্থানও অপরিবর্তিত। নয়াদিল্লি বারবার বলে আসছে, সীমান্ত পরিস্থিতিই বৃহত্তর ভারত-চীন সম্পর্কের গতিপথকে প্রভাবিত করবে। চীন অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসলেও ভারত রাজ্যটিকে দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে সীমান্ত প্রশ্ন কেবল সামরিক নয়, জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও যুক্ত।
অর্থনৈতিক সম্পর্কেও রয়ে গেছে আস্থার ঘাটতি
রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়। বিনিয়োগ অনুমোদন, ভিসা এবং শিল্প সরঞ্জাম আমদানির মতো বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা এখনো নানা বাধার মুখে পড়ছেন।
ভারত মার্চে কিছু খাতে চীনা বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। ইলেকট্রনিকস, মূলধনি পণ্য ও সৌরকোষের মতো খাতে এর প্রভাব পড়েছে। কিছু প্রকল্প অনুমোদনও পেয়েছে। এর মধ্যে ডিক্সন টেকনোলজিস ও চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা ভিভোর একটি উৎপাদন উদ্যোগ রয়েছে।
তবু বড় চীনা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বিওয়াইডি ও গ্রেট ওয়াল মোটরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতে স্থগিত করা বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এখনো আগের অবস্থানে ফেরেনি। একই সময়ে ভারতের সৌরবিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস ও অবকাঠামো খাতে ব্যবহৃত চীনা যন্ত্রপাতি ও উপকরণের সরবরাহেও বিলম্বের খবর রয়েছে।

এখানেই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যটি স্পষ্ট হয়। কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে, কিন্তু অর্থনৈতিক আস্থা তার সঙ্গে একই গতিতে ফিরছে না। অথচ বৈশ্বিক বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ যখন ভারত ও চীন উভয়ের ওপরই নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তখন অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আস্থার ওপর
মোদি-শি বৈঠক তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সাক্ষাৎ নয়। এটি দেখাবে, সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর পর দুই দেশ সম্পর্ককে কতটা গভীরে নিয়ে যেতে চায়। রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, কিছু মানুষে-মানুষে যোগাযোগও ফিরেছে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন আরও স্থায়ী আস্থা।
ভারতের জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো অনিশ্চয়তা গ্রহণযোগ্য নয়। চীনের জন্যও ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুই দেশের সামনে পথ একেবারে সহজ নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয়ও বটে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, ব্রিকসের মঞ্চে মোদি ও শির বৈঠক কি কেবল সম্পর্কের বরফ আরও কিছুটা গলাবে, নাকি সীমান্ত, অর্থনীতি ও পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করবে। উত্তর নির্ভর করবে বৈঠকের বক্তব্যের চেয়ে বেশি—তার পরবর্তী বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।
প্রকৃতি দেব 



















