ভারতে প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলমান ছাত্র-যুব আন্দোলনের মুখে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন করা হবে। তবে এই ঘোষণার পরও আন্দোলন থামানোর কোনো ইঙ্গিত দেয়নি আন্দোলনকারীরা। তারা এখনো শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার মোদির এই ঘোষণা আসে, এর কয়েক ঘণ্টা আগে নয়াদিল্লিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জের ঘটনার পর। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর এটিকে তার সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যুব আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে শুরু হওয়া তার তৃতীয় মেয়াদের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবেও বিষয়টি বিবেচিত হচ্ছে।
প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় নরেন্দ্র মোদি বলেন, তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভারতে বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত বিশেষভাবে গঠন করা হয়। অতীতে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, অর্থপাচার এবং জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতেও এ ধরনের আদালত ব্যবহৃত হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি অপরিবর্তিত
মোদির ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। গত মাসে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করা প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি আন্দোলন শুরু করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই ঘটনার সঙ্গে কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনাও যুক্ত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও সিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতেই হবে।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, আন্দোলন শুরু হওয়ার ২৫ দিন পেরিয়ে গেছে। প্রয়োজন হলে ২৫ মাসও আন্দোলন চলবে, কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তারা সরে যাবেন না।
রাহুল গান্ধীরও একই দাবি

প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীও মোদির ঘোষণাকে যথেষ্ট বলে মনে করেননি। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস হতে দেওয়ার দায় সরকারের। তার ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারের নীতির কারণে।
রাহুল গান্ধী শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত, শিক্ষার্থীদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা প্রার্থনা এবং আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িতদের শাস্তির দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
সংঘর্ষ, আহত পুলিশ ও মেট্রো স্টেশন বন্ধ
বুধবার রাতে দিল্লির যন্ত্রর মন্তরে ১০ হাজারের বেশি মানুষ সমবেত হন বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়। রাতের দিকে কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও প্লাস্টিকের বোতল নিক্ষেপ করলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। দিল্লি পুলিশ জানায়, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে সোমবারও হাজার হাজার আন্দোলনকারী সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করলে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ করা হয়।

নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্য দিল্লি ও আশপাশের ১৬টি মেট্রো স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন। চলতি সপ্তাহে এটি দ্বিতীয়বারের মতো বড় পরিসরে মেট্রো স্টেশন বন্ধের ঘটনা।
সরকার-আন্দোলনকারীদের আলোচনা
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে মোদি সরকার ইতোমধ্যে সিজেপি নেতাদের সঙ্গে এক দফা বৈঠক করেছে। সরকার আন্দোলনকারীদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি সংসদে আলোচনার এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনার প্রস্তাবও দিয়েছে।
অন্যদিকে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে।
অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন অল্প সময়েই দেশজুড়ে যুবসমাজের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রশ্নফাঁস, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা—এই তিনটি বিষয় আন্দোলনের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতের ঘোষণা দিলেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকায় ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















