যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করা বিদেশিদের পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা করেছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদারের সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে মঙ্গলবার এ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ইস্যু করা বি-১ ও বি-২ ভিসাধারীদের মধ্যে যারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করেছেন বা বর্তমানে আশ্রয় চাইছেন, তাদের ভিসা বাতিলের আওতায় আনা হতে পারে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট জানিয়েছেন, এ বিষয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে পররাষ্ট্র দপ্তর। যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্রবেশের পর স্থায়ীভাবে থাকার জন্য আশ্রয় আবেদন করেছেন—এমন বিদেশিদের অ-অভিবাসী ভিসা শনাক্ত করে বাতিল করা হবে বলে জানান তিনি।
তবে ঠিক কতটি ভিসা বাতিল হতে পারে, তা জানায়নি পররাষ্ট্র দপ্তর। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভিসা বাতিলের প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে বা ‘রোলিং বেসিসে’ চালানো হবে। যাদের ভিসা বাতিল হবে, তাদের বহিষ্কার করা হবে কি না কিংবা যেসব আশ্রয় আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলোর কী হবে—সেটিও স্পষ্ট করা হয়নি।
ভিসা বাতিলের পরিসর
বি-১ ভিসা সাধারণত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে বি-২ ভিসা পর্যটন, ছুটি কাটানো বা চিকিৎসার মতো উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। উভয় ধরনের ভিসায় সাধারণত সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত থাকার সুযোগ থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের হিসাবে, ২০২৪ অর্থবছরে প্রায় ৬৫ লাখ বি-১ ও বি-২ ভিসা ইস্যু করা হয়েছিল। ফলে নতুন পদক্ষেপটি কার্যকর হলে বিপুলসংখ্যক ভিসাধারী এর আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয় আবেদনকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও অতীতে এসব ভিসা নিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেছেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ ‘অ্যাফার্মেটিভ অ্যাসাইলাম’ আবেদন করেছিলেন। গত এক দশকে যারা এ ধরনের আশ্রয়ের আবেদন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পদ্ধতি জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি বি-১ বা বি-২ ভিসা নিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেছিলেন।
আশ্রয় ব্যবস্থাকে ‘লুফহোল’ বললেন কর্মকর্তা
যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাও সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ ‘ভুয়া আশ্রয় আবেদন’ নিয়ে বিরক্ত। তার ভাষ্য, আশ্রয় ব্যবস্থাকে অভিবাসন আইন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার কথা নয়।
মার্কিন আইনে অবশ্য দেশে প্রবেশের পর বিদেশি নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। নিজ দেশে নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাইতে পারেন। ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে প্রবেশের এক বছরের মধ্যে আবেদন করলে অভিবাসন অবস্থান নির্বিশেষে আশ্রয়ের আবেদন করা যায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে নতুন পদক্ষেপ
নতুন ভিসা বাতিলের পরিকল্পনাটি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিক পদক্ষেপের অংশ। এর আগে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগ, দক্ষ কর্মীদের ভিসায় বাড়তি ফি আরোপ এবং নিজ দেশে ফেরত গেলে ভয় রয়েছে বলে জানানো ভিসা আবেদনকারীদের ভিসা না দেওয়ার মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের কয়েকটি আদালতে আটকে গেছে বা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তর চলতি মাসে জানিয়েছিল, ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বিদেশিদের ভ্রমণ নথি বাতিলের ঘটনাও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবশ্য কিছু ভিসা বাতিলের ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছে।
মার্কিন অভিবাসন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড ঘিরে সহিংসতার ঘটনাও সামনে এসেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে গাড়িচালকদের লক্ষ্য করে অন্তত ১৭টি গুলির ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এসব ঘটনায় দুই মার্কিন নাগরিকসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় আবেদন করা ব্যক্তিদের ভিসা বাতিলের নতুন উদ্যোগটি তাই দেশটির অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করার সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাওয়া ব্যক্তিদের বি-১ ও বি-২ ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ২০১৬-২০২৬ সালের মধ্যে ইস্যু করা ভিসাধারীদের মধ্যে আশ্রয় আবেদনকারীরা এ পদক্ষেপের আওতায় আসতে পারেন।
Sarakhon Report 



















