০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

রাষ্ট্র বনাম বাজার: অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের পথে ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকি

মাত্র উনিশ মাসেই ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। আগের সরকারগুলো যেখানে বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল, সেখানে বর্তমান প্রশাসন আরও মৌলিক এক লক্ষ্য সামনে এনেছে—রাষ্ট্রের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করে অর্থনীতির আদর্শিক ভিত্তিকেই নতুনভাবে গড়ে তোলা।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধানের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ‘পাঞ্চাশিলা অর্থনীতি’র ধারণা। রাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় সম্পদের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রভাব কমানো, বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারই এই নীতির প্রধান উদ্দেশ্য। রাজনৈতিকভাবে এই বক্তব্য আকর্ষণীয়। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।

অর্থনৈতিক দর্শনের পরিবর্তন সাধারণত কয়েক দশকের প্রক্রিয়া। চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারও একদিনে আসেনি; দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠান, আইন এবং বাজার কাঠামোকে রূপান্তরিত করা হয়েছে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ায় যে পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে, তা একটি মাত্র নির্বাচনী মেয়াদের মধ্যেই বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা। ফলে বহু সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

সংবিধানের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অবশ্যই ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক চিন্তার অন্যতম ভিত্তি। এর মূল দর্শন হলো অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, যেখানে রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ খাত ও প্রাকৃতিক সম্পদের তত্ত্বাবধান করবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য হবে জনকল্যাণ। কিন্তু এই অনুচ্ছেদের সঙ্গে পরবর্তী সাংবিধানিক সংশোধনে যুক্ত হওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়—‘ন্যায়ভিত্তিক দক্ষতা’।

এই ধারণা শুধু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের কথা বলে না; একই সঙ্গে দক্ষতা, ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সচেতনতা, আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় অগ্রগতির মধ্যে ভারসাম্যের কথাও বলে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভূমিকা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ নিয়মভিত্তিক শাসন এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান।

সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন সংবিধানের একটি অংশকে রাজনৈতিক বৈধতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগুলো উপেক্ষিত থাকে। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের নামে যদি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে, অথচ সেই ক্ষমতার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা।

পাঞ্চাশিলা অর্থনীতি নিয়েও অতীতে একমুখী কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। এই ধারণার অন্যতম প্রবক্তা অধ্যাপক মুব্যার্তো কখনোই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক অর্থনীতির পক্ষে ছিলেন না। তাঁর কাছে অর্থনীতির সাফল্যের মাপকাঠি ছিল মানুষের কল্যাণ, সামাজিক সংহতি এবং ন্যায্য অংশগ্রহণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করে।

অন্যদিকে অধ্যাপক আরিফ বুদিমান মনে করতেন, পাঞ্চাশিলা অর্থনীতি নৈতিক আদর্শ হিসেবে শক্তিশালী হলেও বাস্তব নীতিনির্ধারণের জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। এটি উদার পুঁজিবাদের সমালোচনা করেছে, সম্পদের কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, কিন্তু কীভাবে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা দেয়নি।

আজকের বিতর্কেও সেই পুরোনো প্রশ্নই ফিরে এসেছে। অনেকেই ধরে নিচ্ছেন, রাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ালেই পাঞ্চাশিলা অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণ হবে। অথচ মূল চিন্তাবিদদের কেউই কেবল আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা বিস্তারের কথা বলেননি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বাজারের কার্যকারিতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় উন্নয়নের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।

The Weekly Look at the Global Economy and Markets

এই বিতর্কে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিজে হাবিবির প্রস্তাবিত ‘পাঞ্চাশিলা বাজার অর্থনীতি’ নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। তিনি বাজারকে প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং যুক্তি দিয়েছিলেন, বাজার ব্যবস্থাকে নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও বিনিয়োগের অধিকার থাকবে, কিন্তু সেই অধিকার শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর জনগণের কল্যাণে অবদান রাখবে।

হাবিবির চিন্তার বিশেষত্ব ছিল, তিনি বাজারকে উদ্ভাবন, দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে তিনি সর্বময় অর্থনৈতিক খেলোয়াড় নয়, বরং কৌশলগত সমন্বয়কারী হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। অর্থাৎ বাজার সম্পদের কার্যকর বণ্টন করবে, আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে ন্যায্যতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সবার অংশগ্রহণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পার্থক্যটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ নিজেই কোনো নেতিবাচক ধারণা নয়। এশিয়ার বহু সফল দেশ নিজস্ব শিল্প, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন জাতীয়তাবাদের নামে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে এবং আইন, প্রতিষ্ঠান ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে পরিচালিত করতে শুরু করে।

ইন্দোনেশিয়ায় ইতোমধ্যেই সেই প্রবণতার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের যুক্তিতে হঠাৎ লাইসেন্স বাতিল, সম্পদ অধিগ্রহণ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনিক চাপ এবং নিয়মের ঘনঘন পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ব্যবসা পরিচালনার জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ। সেটি দুর্বল হয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইতিহাসও একই সতর্কবার্তা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার ‘গাইডেড ইকোনমি’র অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও বলছে, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া আক্রমণাত্মক অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রায়ই প্রতিযোগিতা কমায়, মূলধন বিদেশে সরিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থবিরতার দিকে ঠেলে দেয়।

প্রকৃত অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি কার্যকর অর্থনীতিতে সরকার, নাগরিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারী—সব পক্ষের মধ্যে আস্থাভিত্তিক অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে। সংবিধানের চেতাও সেই ভারসাম্যের কথাই বলে। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব প্রয়োজন, কিন্তু সেই নেতৃত্বের ভিত্তি হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক দক্ষতা, আইনের শাসন এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। অন্যথায় অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের লক্ষ্য অর্জনের আগেই সেই যাত্রাপথ নিজেই নতুন অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

রাষ্ট্র বনাম বাজার: অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের পথে ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকি

০৭:১৬:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

মাত্র উনিশ মাসেই ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। আগের সরকারগুলো যেখানে বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল, সেখানে বর্তমান প্রশাসন আরও মৌলিক এক লক্ষ্য সামনে এনেছে—রাষ্ট্রের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করে অর্থনীতির আদর্শিক ভিত্তিকেই নতুনভাবে গড়ে তোলা।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধানের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ‘পাঞ্চাশিলা অর্থনীতি’র ধারণা। রাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় সম্পদের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রভাব কমানো, বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারই এই নীতির প্রধান উদ্দেশ্য। রাজনৈতিকভাবে এই বক্তব্য আকর্ষণীয়। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।

অর্থনৈতিক দর্শনের পরিবর্তন সাধারণত কয়েক দশকের প্রক্রিয়া। চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারও একদিনে আসেনি; দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠান, আইন এবং বাজার কাঠামোকে রূপান্তরিত করা হয়েছে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ায় যে পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে, তা একটি মাত্র নির্বাচনী মেয়াদের মধ্যেই বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা। ফলে বহু সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

সংবিধানের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অবশ্যই ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক চিন্তার অন্যতম ভিত্তি। এর মূল দর্শন হলো অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, যেখানে রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ খাত ও প্রাকৃতিক সম্পদের তত্ত্বাবধান করবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য হবে জনকল্যাণ। কিন্তু এই অনুচ্ছেদের সঙ্গে পরবর্তী সাংবিধানিক সংশোধনে যুক্ত হওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়—‘ন্যায়ভিত্তিক দক্ষতা’।

এই ধারণা শুধু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের কথা বলে না; একই সঙ্গে দক্ষতা, ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সচেতনতা, আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় অগ্রগতির মধ্যে ভারসাম্যের কথাও বলে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভূমিকা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ নিয়মভিত্তিক শাসন এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান।

সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন সংবিধানের একটি অংশকে রাজনৈতিক বৈধতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগুলো উপেক্ষিত থাকে। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের নামে যদি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে, অথচ সেই ক্ষমতার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা।

পাঞ্চাশিলা অর্থনীতি নিয়েও অতীতে একমুখী কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। এই ধারণার অন্যতম প্রবক্তা অধ্যাপক মুব্যার্তো কখনোই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক অর্থনীতির পক্ষে ছিলেন না। তাঁর কাছে অর্থনীতির সাফল্যের মাপকাঠি ছিল মানুষের কল্যাণ, সামাজিক সংহতি এবং ন্যায্য অংশগ্রহণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করে।

অন্যদিকে অধ্যাপক আরিফ বুদিমান মনে করতেন, পাঞ্চাশিলা অর্থনীতি নৈতিক আদর্শ হিসেবে শক্তিশালী হলেও বাস্তব নীতিনির্ধারণের জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। এটি উদার পুঁজিবাদের সমালোচনা করেছে, সম্পদের কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, কিন্তু কীভাবে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা দেয়নি।

আজকের বিতর্কেও সেই পুরোনো প্রশ্নই ফিরে এসেছে। অনেকেই ধরে নিচ্ছেন, রাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ালেই পাঞ্চাশিলা অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণ হবে। অথচ মূল চিন্তাবিদদের কেউই কেবল আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা বিস্তারের কথা বলেননি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বাজারের কার্যকারিতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় উন্নয়নের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।

The Weekly Look at the Global Economy and Markets

এই বিতর্কে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিজে হাবিবির প্রস্তাবিত ‘পাঞ্চাশিলা বাজার অর্থনীতি’ নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। তিনি বাজারকে প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং যুক্তি দিয়েছিলেন, বাজার ব্যবস্থাকে নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও বিনিয়োগের অধিকার থাকবে, কিন্তু সেই অধিকার শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর জনগণের কল্যাণে অবদান রাখবে।

হাবিবির চিন্তার বিশেষত্ব ছিল, তিনি বাজারকে উদ্ভাবন, দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে তিনি সর্বময় অর্থনৈতিক খেলোয়াড় নয়, বরং কৌশলগত সমন্বয়কারী হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। অর্থাৎ বাজার সম্পদের কার্যকর বণ্টন করবে, আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে ন্যায্যতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সবার অংশগ্রহণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পার্থক্যটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ নিজেই কোনো নেতিবাচক ধারণা নয়। এশিয়ার বহু সফল দেশ নিজস্ব শিল্প, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন জাতীয়তাবাদের নামে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে এবং আইন, প্রতিষ্ঠান ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে পরিচালিত করতে শুরু করে।

ইন্দোনেশিয়ায় ইতোমধ্যেই সেই প্রবণতার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের যুক্তিতে হঠাৎ লাইসেন্স বাতিল, সম্পদ অধিগ্রহণ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনিক চাপ এবং নিয়মের ঘনঘন পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ব্যবসা পরিচালনার জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ। সেটি দুর্বল হয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইতিহাসও একই সতর্কবার্তা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার ‘গাইডেড ইকোনমি’র অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও বলছে, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া আক্রমণাত্মক অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রায়ই প্রতিযোগিতা কমায়, মূলধন বিদেশে সরিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থবিরতার দিকে ঠেলে দেয়।

প্রকৃত অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি কার্যকর অর্থনীতিতে সরকার, নাগরিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারী—সব পক্ষের মধ্যে আস্থাভিত্তিক অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে। সংবিধানের চেতাও সেই ভারসাম্যের কথাই বলে। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব প্রয়োজন, কিন্তু সেই নেতৃত্বের ভিত্তি হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক দক্ষতা, আইনের শাসন এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। অন্যথায় অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের লক্ষ্য অর্জনের আগেই সেই যাত্রাপথ নিজেই নতুন অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে উঠতে পারে।