ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও একে অন্যের প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। ১৮৭৬, ১৯৭৬ এবং ২০২৬—এই তিনটি বছর ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করলেও একটি মৌলিক সত্যকে একইভাবে সামনে আনে। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অভিযোগকে যদি রাষ্ট্র প্রশাসনিক ঝামেলা বা আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখে, তাহলে সেই সংকট কখনও কেবল একটি দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের বৈধতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত হয়।
দেড়শ বছর আগে কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার প্রথম বড় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি পরীক্ষা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সর্বোচ্চ বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ করা হয়েছিল। ঔপনিবেশিক সরকারের কাছে এটি ছিল একটি সাধারণ প্রশাসনিক পরিবর্তন। কিন্তু শিক্ষিত ভারতীয় তরুণদের কাছে এটি ছিল রাষ্ট্রের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার প্রতীক। সুরেন্দ্রনাথ বিষয়টিকে কেবল নিয়ম পরিবর্তনের প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে উন্নীত করেছিলেন। সেই আন্দোলনই পরবর্তীকালে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি তৈরি করে।
এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে অবজ্ঞা করলে তা দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভুল অনেক সময় নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং নাগরিকের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়া।
এক শতাব্দী পরে, ১৯৭৬ সালে পৃথিবীর দুই ভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের শিক্ষা ইতিহাস আবারও দিয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটোতে আফ্রিকান্স ভাষাকে বাধ্যতামূলক শিক্ষার মাধ্যম করার প্রতিবাদে স্কুলশিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল। তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলের জবাবে গুলি চালানো হয়, শত শত মানুষ প্রাণ হারায়। অন্যদিকে ভারতে জরুরি অবস্থার সময় ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধ হয়, বিরোধী কর্মীরা আটক হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কার্যত নীরব করে দেওয়া হয়।
দুই দেশের পদ্ধতি ছিল ভিন্ন—এক জায়গায় প্রাণঘাতী শক্তি, অন্য জায়গায় প্রশাসনিক দমন। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র বিশ্বাস করেছিল যে কঠোরতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ইতিহাস পরে দেখিয়েছে, সেই ধারণা ছিল ভ্রান্ত। সোয়েটোর তরুণরাই বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগ্রামের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। ভারতে জরুরি অবস্থার পর যে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব উঠে আসে, তার বড় অংশই সেই সময়ের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
অর্থাৎ, তরুণদের কণ্ঠ সাময়িকভাবে স্তব্ধ করা সম্ভব হলেও তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে মুছে ফেলা যায় না। বরং দমনই অনেক সময় নতুন নেতৃত্ব এবং নতুন আন্দোলনের জন্ম দেয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনও একই ধারার আরেকটি অধ্যায়। চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষা নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা বাতিল এবং মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হওয়া বিষয়টি অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহৎ ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়।
কিন্তু অভিযোগের গভীরে যাওয়ার পরিবর্তে রাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল ব্যারিকেড, টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার। এখানেই ইতিহাস আবারও সতর্কবার্তা দেয়।
প্রথম শিক্ষা হলো, বলপ্রয়োগ কোনো প্রকৃত অভিযোগকে শেষ করতে পারে না। বরং সেটিকে আরও সুসংগঠিত করে। যখন একটি সীমিত প্রশাসনিক সমস্যা মোকাবিলায় রাষ্ট্র অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে, তখন মানুষের কাছে মূল প্রশ্নটি নীতিগত থাকে না; সেটি মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্নে রূপ নেয়। আর মর্যাদার প্রশ্ন সাধারণ প্রশাসনিক আলোচনার মাধ্যমে সহজে শেষ হয় না।

সোয়েটোতে যা ঘটেছিল, তা কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য প্রযোজ্য নয়। বিশ্বের বহু সমাজে একই অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। একটি আন্দোলনের শক্তি প্রায়ই তার প্রথম দাবিতে নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়। প্রতিবাদকারীদের ওপর সহিংসতা আন্দোলনের জন্য নতুন সমর্থন, নতুন প্রতীক এবং নতুন নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
দ্বিতীয় শিক্ষা আরও সূক্ষ্ম। নাগরিককে অবজ্ঞা করা রাষ্ট্রের মর্যাদাকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন ভারতীয় তরুণদের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেনি। সেই অবহেলাই আন্দোলনের শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়।
আজও যখন ক্ষমতার উচ্চ পর্যায় থেকে তরুণদের নিয়ে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা হয়, তখন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে। শিক্ষার্থীদের ছোট করে দেখানোর প্রচেষ্টা বাস্তবে আন্দোলনকে দুর্বল করে না; বরং তাদের নৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ তখন বিতর্কটি কেবল পরীক্ষা বা ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা নাগরিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রের আচরণের প্রশ্নে পরিণত হয়।
যে সরকার সত্যিই উত্তেজনা কমাতে চায়, তারা প্রথমেই ভাষার পরিবর্তন ঘটায়। প্রতিবাদকারীদের শত্রু নয়, অংশীদার হিসেবে স্বীকার করে। পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যে প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক উদ্বেগের বিষয়—এই স্বীকৃতিই সংকট নিরসনের প্রথম ধাপ হতে পারে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, আন্দোলন নিজে সমস্যা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের জবাবদিহির সংকটের লক্ষণ। শিক্ষার্থীরা আনন্দের জন্য রাস্তায় রাত কাটায় না বা টিয়ার গ্যাসের মুখোমুখি হয় না। তারা তখনই আন্দোলনে নামে, যখন প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ নিষ্পত্তির সব পথ তাদের কাছে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
১৮৭৬ সালে প্রতিনিধিত্বের কোনো কার্যকর রাজনৈতিক কাঠামো ছিল না বলেই আন্দোলন বিকল্প মঞ্চ তৈরি করেছিল। জরুরি অবস্থায় আদালত, সংবাদমাধ্যম ও সংসদ কার্যকরভাবে কাজ করতে না পারায় ক্ষোভ জমে উঠেছিল। একইভাবে আজকের শিক্ষার্থীরাও বলছে, তারা আশ্বাস নয়, কার্যকর ব্যবস্থা চায়—বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং দায়ী প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহি।
একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক কাঠামোতে এসব দাবি সংসদীয় তদারকি, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই সমাধান হওয়ার কথা। যদি সেই প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকে, তাহলে রাস্তায় আন্দোলনের প্রয়োজনই পড়ে না। কিন্তু যখন সেই পথগুলো অকার্যকর হয়ে যায়, তখন জনপথই শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
সুতরাং টেকসই সমাধান আরও শক্তিশালী পুলিশি ব্যবস্থা নয়; বরং আরও শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা। পরীক্ষা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়নে আইনি স্বচ্ছতা আনা, সংসদীয় কমিটির কার্যকর নজরদারি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য প্রকৃত দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা—এসব সংস্কারই ভবিষ্যতের সংকট প্রতিরোধ করতে পারে।
ইতিহাসের এক অদ্ভুত মিল হলো, ২০২৬ সালের এই ঘটনাগুলো ঘটছে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার দেড়শ বছর পূর্তির সময়ে। ১৮৭৬ সালের শাসকেরা ভাবেননি, একটি পরীক্ষা-সংক্রান্ত ক্ষোভ একদিন স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে দেবে। ১৯৭৬ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বা ভারতের ক্ষমতাসীনরাও কল্পনা করেননি, যাদের তারা দমন করছেন, তারাই একদিন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
প্রত্যেক সরকারই মনে করে, ইতিহাসের এই চক্র তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো, যারা অতীতের শিক্ষা অস্বীকার করে, তারাই শেষ পর্যন্ত সেই পুনরাবৃত্তির অংশ হয়ে যায়।
আজকের শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের কাছে পরাজয় দাবি করছে না। তারা কেবল এমন একটি ব্যবস্থা চাইছে, যেখানে রাষ্ট্র যে পরীক্ষা নেয়, সেই পরীক্ষার সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করার নৈতিক যোগ্যতাও তার থাকবে। দেড় শতকের অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে—যে রাষ্ট্র তরুণদের এই আহ্বানকে গুরুত্ব দেয়, তার প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হয়। আর যে রাষ্ট্র তাদের কণ্ঠকে কেবল দমন করতে চায়, সে শেষ পর্যন্ত নিজের বৈধতাকেই দুর্বল করে।
শশাঙ্ক পান্ডে 



















