১৯৬০ সালের শার্পভিল হত্যাকাণ্ডের সাত দশক পরও সেই রক্তাক্ত দিনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন বেঁচে থাকা মানুষ ও নিহতদের স্বজনেরা। এবার ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তিনজন ভুক্তভোগী।
শান্তিপূর্ণ মিছিলে হঠাৎ গুলি
১৯৬০ সালের ২১ মার্চ দক্ষিণ আফ্রিকার শার্পভিল শহরে বর্ণবাদী সরকারের বৈষম্যমূলক চলাচল-নিয়ন্ত্রণ আইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে জড়ো হয়েছিলেন হাজারো মানুষ। ওই আইনের আওতায় কৃষ্ণাঙ্গ, ভারতীয় বংশোদ্ভূত ও মিশ্র বর্ণের দক্ষিণ আফ্রিকানদের সব সময় এমন পরিচয়পত্র বহন করতে হতো, যাতে তারা কোথায় যেতে পারবেন তা নির্ধারিত থাকত।
তৎকালীন ২০ বছর বয়সী কারখানাশ্রমিক আব্রাহাম মোফোকেংও সেই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন আবহাওয়া ছিল চমৎকার। পুলিশ স্টেশনের বাইরে জড়ো হওয়া মানুষ গান গাইছিলেন। হঠাৎ কোনো সতর্কতা ছাড়াই পুলিশ গুলি চালানো শুরু করে।
ওই ঘটনায় অন্তত ৯১ জন নিহত এবং ২৩৮ জন আহত হন। ইতিহাসে ঘটনাটি ‘শার্পভিল হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
গুলি থেকে পালানোর সময় মোফোকেংয়ের ডান পায়ের ভেতর দিয়ে একটি গুলি ছুঁয়ে যায়। এতে তার জুতা ছিটকে পড়ে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, পিঠেও গুলি লেগেছে। সেই গুলির একটি অংশ তার মেরুদণ্ডে এখনও আটকে আছে।

সাত দশক পর ক্ষতিপূরণের দাবি
বর্তমানে ৮৬ বছর বয়সী মোফোকেং শার্পভিলেই বসবাস করেন। তিনি আরও দুই দাবিদারের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। বৃহস্পতিবার করা এই মামলায় হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে।
মামলাটি সফল হলে একই ধরনের দাবি নিয়ে আরও বহু ভুক্তভোগী ও নিহতদের স্বজন আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
দাবিদারদের আইনজীবীরা প্রায় ৫ লাখ র্যান্ড করে ক্ষতিপূরণ চাচ্ছেন। বর্তমান হিসাবে এর মূল্য প্রায় ২৩ হাজার পাউন্ডের সমান।
পুরোনো আইনই এখন বড় বাধা
শার্পভিল হত্যাকাণ্ডের পর ভুক্তভোগীরা ক্ষতিপূরণের দাবি জানালে ১৯৬১ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকার একটি আইন করে। ওই আইনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমন, জননিরাপত্তা রক্ষা বা জীবন ও সম্পদ রক্ষার মতো কারণ দেখিয়ে ‘সৎ বিশ্বাসে’ নেওয়া সরকারি পদক্ষেপের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইনটি হত্যাকাণ্ডের দিন থেকেই কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় সাত দশক পরও আইনটি বহাল রয়েছে।
মামলাকারীদের আইনজীবীরা এখন আদালতে যুক্তি দিচ্ছেন, এই আইন দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তাই এটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করা উচিত।
মোফোকেংয়ের জীবনেও রয়ে গেছে সেই ক্ষত

২০০৩ সালে সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের সিদ্ধান্তের পর মোফোকেং এককালীন ৩০ হাজার র্যান্ড পেয়েছিলেন। কমিশন অবশ্য ছয় বছর ধরে বছরে প্রায় ২০ হাজার র্যান্ড করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
কিন্তু সেই অর্থ তার জীবনের ক্ষতি পূরণ করতে পারেনি। মোফোকেং বলেন, এত বছর পরও তাদের কষ্ট শেষ হয়নি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যগত সমস্যাও তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
বাবাকে হারিয়ে থেমে যায় আরেক জীবন
মামলার অন্য দুই দাবিদারের একজন পাউলিনা মাথিন্যে। ১৯৬০ সালে তার বাবা স্যামসন পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তখন পাউলিনার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর।
বাবা কাজ থেকে বাড়ি ফিরলে আনন্দে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতেন পাউলিনা। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের দিন তিনি বুঝতে পারেননি কী ঘটেছে। শুধু দেখেছিলেন, তার মা কাঁদছেন। বারবার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি কাঁদছেন।
স্বামীকে হারানোর পর পাঁচ সন্তানকে গৃহকর্মীর সামান্য আয়ে বড় করতে হয় তার মাকে। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল পাউলিনার। কিন্তু পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় মাত্র ১৭ বছর বয়সে তাকে শিক্ষাজীবন ছেড়ে কাজে যোগ দিতে হয়।
এখন ৭১ বছর বয়সী পাউলিনা মনে করেন, ক্ষতিপূরণ তার হারিয়ে যাওয়া জীবনের কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারে। তার অনেক বন্ধু শিক্ষক বা নার্স হয়েছেন। অথচ তিনি এখনও সেই বাড়িতেই বসবাস করছেন, যেখানে তার বাবা থাকতেন।

শার্পভিলের সংকট আরও পুরোনো
ভুক্তভোগীদের সমর্থনকারী আফ্রিকানিস্ট কংগ্রেসের সদস্য ভিনসেন্ট থামায়ের মতে, শার্পভিলের সংকট শুধু ১৯৬০ সালের হত্যাকাণ্ড দিয়ে শুরু হয়নি।
বর্ণবাদী শাসনামলে কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের উর্বর জমি থেকে উচ্ছেদ, জোরপূর্বক শহরতলির নির্দিষ্ট এলাকায় সরিয়ে দেওয়া এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে এই ক্ষত জড়িয়ে আছে।
তার মতে, আজ ক্ষতিপূরণের কথা উঠলে শুধু হত্যাকাণ্ডে নিহত বা আহত ব্যক্তিদের জন্য অর্থ দেওয়ার বিষয়টি দেখলে চলবে না। হারিয়ে যাওয়া জমি, অর্থনীতি থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও দীর্ঘদিন ধরে চলা বৈষম্যের বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের অবসানের তিন দশকের বেশি সময় পরও বৈষম্য ও দারিদ্র্য পুরোপুরি দূর না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে শার্পভিলের এই মামলা অতীতের একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের দায় নির্ধারণেরও নতুন পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















