কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে শিক্ষাজগতে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নতুন কিছু নয়। অতীতে ক্যালকুলেটর যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেছিল, তখনও আশঙ্কা ছিল শিক্ষার্থীরা আর গণিত শিখবে না। ইন্টারনেটের বিস্তারেও বলা হয়েছিল, পড়াশোনা ও চিন্তাশক্তির অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। শিক্ষা ব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছে এবং নতুন প্রযুক্তিকে শিক্ষার অংশে পরিণত করেছে।
জেনারেটিভ এআইও সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি বড় পরিবর্তন। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণা, লেখালেখি, প্রোগ্রামিং, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা সমস্যা সমাধানে নিয়মিতভাবে ChatGPT, Gemini বা Claude-এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। ফলে প্রশ্নটি আর এ নয় যে শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করবে কি না। বাস্তবতা হলো, তারা ইতোমধ্যেই করছে। এখন আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে তাদের দায়িত্বশীল ও দক্ষ ব্যবহারকারী হিসেবে গড়ে তুলবে।
অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও এই পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিতে দেখছে। কোথাও কঠোর নীতিমালা, কোথাও এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যার, আবার কোথাও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ মূল সমস্যার সমাধান নয়। প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা সাধারণত প্রযুক্তির ব্যবহার কমায় না; বরং তা আরও অস্বচ্ছ করে তোলে। বরং প্রয়োজন এমন শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে এআইকে শেখার একটি উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে এবং একই সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিও বোঝানো হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব এখন শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান দেওয়া নয়, বরং ভবিষ্যতের কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করা। বর্তমান কর্মবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সফটওয়্যার উন্নয়ন, আর্থিক বিশ্লেষণ, আইনি গবেষণা, কৌশলগত পরিকল্পনা কিংবা ডেটা বিশ্লেষণের মতো বহু ক্ষেত্রে এআই ইতোমধ্যেই নিয়মিত সহকারী হিসেবে কাজ করছে। নতুন কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশে এখন এআই ব্যবহারের দক্ষতা চাওয়া হচ্ছে। ফলে এই প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে ভবিষ্যতের পেশাজীবনে সফল হওয়া কঠিন হবে।
এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এআইকে একটি মৌলিক পেশাগত দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু এআই ব্যবহার শেখালেই চলবে না; তাদের জানতে হবে কীভাবে কার্যকর নির্দেশনা বা প্রম্পট তৈরি করতে হয়, কীভাবে এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই করতে হয়, কোথায় ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকতে পারে এবং কোন পরিস্থিতিতে মানুষের নিজস্ব বিচারশক্তিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক পরিসরেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউনেস্কো বহুদিন ধরেই এমন একটি মানবকেন্দ্রিক এআই নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করার বদলে মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা নয়, বরং তার বিচক্ষণ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ইতোমধ্যে এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি শিক্ষা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের জন্য একটি যৌথ নীতিমালা গ্রহণ করেছে। সেখানে স্কুল পর্যায়ে তাৎক্ষণিক উত্তর তৈরিতে এআই ব্যবহারে কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলেও উচ্চশিক্ষায় দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। একইভাবে মালয়েশিয়াও যদি আঞ্চলিক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এআই-দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তবে শুধু প্রযুক্তি শেখানোই যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে তারা এআইয়ের সাহায্যে নতুন সমাধান তৈরি করতে পারে। এআই কেবল অ্যাসাইনমেন্ট লেখার শর্টকাট হয়ে থাকলে তার প্রকৃত সম্ভাবনা নষ্ট হবে। বরং নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষায়িত এআই মডেল তৈরি, নতুন গবেষণার সহায়ক টুল নির্মাণ কিংবা সামাজিক সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি ব্যবহার—এসব ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্ভাবনী ভূমিকা থাকা উচিত।
এই পরিবর্তনের জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও বড় ধরনের সংস্কার দরকার। যদি পরীক্ষার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য মুখস্থ করা যাচাই করা হয়, তাহলে এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষা যদি বিশ্লেষণ, যুক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তব প্রয়োগের সক্ষমতা যাচাই করে, তাহলে এআই আর হুমকি থাকে না; বরং শেখার অংশ হয়ে ওঠে।
এ কারণে প্রচলিত লিখিত অ্যাসাইনমেন্টের পাশাপাশি মৌখিক উপস্থাপনা, সরাসরি কেস বিশ্লেষণ, প্রকল্প প্রদর্শন, প্রতিফলনমূলক পোর্টফোলিও এবং দলভিত্তিক উদ্ভাবনী কাজের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করলে মূল্যায়নের বিষয় হওয়া উচিত, তারা কীভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করেছে। তারা কী ধরনের প্রম্পট ব্যবহার করেছে, ভুল তথ্য কীভাবে শনাক্ত করেছে, কোন উৎস দিয়ে তথ্য যাচাই করেছে এবং কোথায় নিজের বিশ্লেষণ যোগ করেছে—এসবই মূল্যায়নের অংশ হতে পারে।
এভাবে চূড়ান্ত ফলাফলের পরিবর্তে শেখার পুরো প্রক্রিয়াকে মূল্যায়নের আওতায় আনলে একদিকে একাডেমিক সততা রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাস্তবভাবে যাচাই করা যাবে।
তবে এআই শিক্ষা কখনোই নৈতিক শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, তার অপব্যবহারের ঝুঁকিও তত বাড়বে। গবেষণায় জালিয়াতি, বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি, অন্যের কাজ নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কিংবা সমালোচনামূলক চিন্তার পরিবর্তে প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়া—এসবই ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা এবং প্রযুক্তির সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন স্নাতক তৈরি করা, যারা শুধু এআই ব্যবহার করতে জানবে না; বরং বুঝবে কখন এআইয়ের ওপর নির্ভর করা যায়, কখন তার তথ্য যাচাই করতে হবে এবং কোন সিদ্ধান্তে মানুষের বিচারশক্তিই শেষ কথা।
উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না কে সবচেয়ে কঠোরভাবে এআই ব্যবহার ঠেকাতে পারল, তার ভিত্তিতে। বরং এগিয়ে থাকবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়, যারা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিকে আরও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, আরও সৃজনশীলভাবে এবং আরও নৈতিকভাবে কাজে লাগাতে শেখাতে পারবে। কারণ ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এআই একটি দৈনন্দিন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করাই উচ্চশিক্ষার নতুন দায়িত্ব।
জাকারিয়া লাশেহেব 



















