গ্রীষ্ম এলেই সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা বাড়ে। সেই সঙ্গে ফিরে আসে সানস্ক্রিনের নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক। বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে এমন ধারণা তৈরি হয় যেন সানস্ক্রিন নিজেই একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি। কিন্তু এই বিতর্কের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—আসল বিপদ কোথায়? সানস্ক্রিনে, নাকি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিতে?
জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনায় ঝুঁকির মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সম্ভাব্য বা তাত্ত্বিক উদ্বেগকে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ক্ষতির সমতুল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ত্বকের ক্যানসার বিশ্বের বহু দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও সবচেয়ে সাধারণ ক্যানসারের মধ্যে অন্যতম। দীর্ঘদিনের গবেষণা, ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্য তথ্য স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির অতিরিক্ত সংস্পর্শ ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এ কারণে সানস্ক্রিন ব্যবহার, ছায়ায় থাকা এবং সুরক্ষামূলক পোশাক পরা—এই তিনটি ব্যবস্থা বহু দশক ধরে কার্যকর প্রতিরোধ কৌশল হিসেবে স্বীকৃত।
তবু সানস্ক্রিনকে ঘিরে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হওয়ায় কিছু মানুষ এটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত নানা বিকল্প পদ্ধতি—যেমন প্রাণিজ চর্বি বা নারকেল তেল—অনেকে সানস্ক্রিনের বদলি হিসেবে গ্রহণ করছেন। অথচ এসব বিকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ফলে মানুষ এমন কিছু ত্যাগ করছে যার উপকারিতা সুপ্রতিষ্ঠিত, আর গ্রহণ করছে এমন কিছু যার সুরক্ষার ভিত্তি দুর্বল।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা দরকার। কোনো রাসায়নিক উপাদান শরীরে শনাক্ত হওয়া মানেই তা ক্ষতিকর—এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। আধুনিক পরীক্ষাগার প্রযুক্তি এতটাই সংবেদনশীল যে অত্যন্ত ক্ষুদ্র মাত্রার উপাদানও শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু উপস্থিতি আর ক্ষতির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। কোনো পদার্থ রক্তে পাওয়া গেছে বলেই তা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরও বিস্তৃত প্রমাণ প্রয়োজন।

সানস্ক্রিন নিয়ে আলোচনায় আরেকটি সমস্যা হলো, অনেক সময় মূল্যায়নের মানদণ্ডকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তা সর্বজনস্বীকৃত বৈজ্ঞানিক সত্য। বাস্তবে বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের পদ্ধতিতে পণ্য মূল্যায়ন করে থাকে, কিন্তু সেই মানদণ্ড সবসময় চিকিৎসাবিজ্ঞান, ক্যানসার গবেষণা বা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সম্মত মানদণ্ডের সঙ্গে এক নয়। ফলে কোনো র্যাঙ্কিং বা স্কোরকে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতি নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই। ত্বকের ক্যানসার, মেলানোমা, ত্বকের রঙের পরিবর্তন এবং অকাল বার্ধক্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক বহু গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ এখানে ঝুঁকি কল্পনানির্ভর নয়; এটি বাস্তব, পরিমাপযোগ্য এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রমাণিত।
এসপিএফ বা সান প্রোটেকশন ফ্যাক্টর নিয়েও প্রায়ই বিতর্ক হয়। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় উচ্চ এসপিএফ সবসময় দ্বিগুণ সুরক্ষা দেয় না—এ কথা সত্য। কিন্তু বাস্তব জীবনের ব্যবহার ল্যাবরেটরির মতো নিখুঁত নয়। অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন, শরীরের কিছু অংশ বাদ পড়ে যায়, কিংবা নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় ব্যবহার করেন না। এই বাস্তবতায় উচ্চ এসপিএফ অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুরক্ষার সুযোগ তৈরি করে।
সানস্ক্রিন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং নতুন উপাদান অনুমোদনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই করা যেতে পারে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য সেই আলোচনা দরকার। কিন্তু বর্তমান সানস্ক্রিনগুলো পুরোনো বলে অকার্যকর বা অনিরাপদ—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য সমর্থন করে না।
স্বাস্থ্যবিষয়ক সংবাদ ও জনসচেতনতা প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। আকর্ষণীয় শিরোনাম মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু যদি সেই বার্তা মানুষের মধ্যে অযৌক্তিক ভয় তৈরি করে এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তবে তার সামাজিক মূল্য অনেক বেশি। জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে উত্তেজনাপূর্ণ ভাষার চেয়ে প্রমাণনির্ভর তথ্যের গুরুত্ব সবসময় বেশি।
সানস্ক্রিন নিখুঁত কি না, সেটি মূল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, মানুষ কি এমন একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে যা বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত? বর্তমান তথ্যপ্রমাণ বলছে, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে বাঁচতে সানস্ক্রিন এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলোর একটি। তাই জনস্বাস্থ্য আলোচনায় ভয়ের নয়, বিজ্ঞানের নেতৃত্ব দেওয়াই জরুরি।
মিস্টি এলেরিয়ান ও অ্যাডাম ফ্রিডম্যান 



















