০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

সাভারের ইটভাটা চালু থাকায় ঝুঁকিতে ঢাকার বাতাস

ঢাকার উত্তরের প্রবেশপথ ও সামগ্রিক বায়ু মান রক্ষার লক্ষ্যে সরকার সাভার উপজেলাকে ‘অবক্ষয়িত বায়ু অঞ্চল’ ঘোষণা করলেও সেখানে ইটভাটার কার্যক্রম থামছে না। প্রকাশ্যেই চলছে ইট পোড়ানো ও উৎপাদন, যা রাজধানীর বায়ুদূষণ আরও ভয়াবহ করে তুলছে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

অবক্ষয়িত বায়ু অঞ্চল ঘোষণার পটভূমি
২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সাভার উপজেলাকে অবক্ষয়িত বায়ু অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী এই ঘোষণার ফলে সাভারে সব ধরনের ইট পোড়ানো ও ইট উৎপাদন কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ ছিল সাভারের ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণার কারণে ঢাকার বায়ু মানের দ্রুত অবনতি, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব।

বাস্তবে নিষেধাজ্ঞার দুর্বল প্রয়োগ
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারি প্রজ্ঞাপনকে অনেক ইটভাটা মালিক কাগুজে নির্দেশ হিসেবেই দেখছেন। গত বছরের শেষ দিকে কয়েকটি ভাটার চিমনি ভেঙে দেওয়া হলেও পরে সেগুলোর বড় অংশ আবার নির্মাণ করে কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

রাজধানীর দূষণ বাড়াচ্ছে সাভার-ধামরাইয়ের ইটভাটা | | বাংলাদেশ প্রতিদিন

সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সাভারে মোট ৮৬টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৫৯টি অনুমোদিত এবং ২৭টি অনুমোদনহীন। আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন তুরাগ নদীর তীরে ইট পোড়ানো এখনো ব্যাপকভাবে চলছে।

আশুলিয়া ও আশপাশের ভাটার চিত্র
আশুলিয়া ব্রিকস ও এমসিবি ব্রিকস নামের ভাটাগুলো চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক পরিদর্শনে দেখা যায়, আশুলিয়া ব্রিকসে শত শত শ্রমিক কাঁচা ইট তৈরি, পরিবহন ও সাজানোর কাজে ব্যস্ত। একই সঙ্গে চুল্লি থেকে পোড়া ইট বের করার কাজও চলছিল।

ভাটার ব্যবস্থাপক ও শ্রমিকদের বক্তব্য
আশুলিয়া ব্রিকসের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মধু মিয়া জানান, সরকার তাদের কাজ করেছে এবং তারা নিজেদের কাজ করছেন। শ্রম ও অন্যান্য খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাটা বন্ধ করলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়া সম্ভব নয় বলেই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তার দাবি, বিষয়টি বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানানো হয়েছে এবং সেখান থেকে আশ্বাসও পেয়েছেন।

এমসিবি ব্রিকসে মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। শ্রমিকরা প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। তবে এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা মৌসুমি চুক্তিতে কাজ করেন। মাঝে মাঝে কর্মকর্তারা এলেও অর্থ লেনদেন হলে তারা ব্যবস্থা না নিয়েই চলে যান, এভাবেই ভাটার কাজ চলতে থাকে।

পরিবেশ দূষণের অন্যতম উৎস ইটভাটা

হাইকোর্টের আদেশের আশ্রয়
সাভারের গেন্ডা ও সাধাপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কিছু ভাটার সামনে বড় সাইনবোর্ড টাঙানো আছে, যেখানে হাইকোর্টের আদেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভাটা মালিকদের দাবি, তারা রিট আবেদন করে আদালত থেকে কার্যক্রম চালানোর অনুমতি পেয়েছেন, যদিও অনেকেরই পরিবেশগত ছাড়পত্র বা বৈধ লাইসেন্স নেই।

আমিনবাজার ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় রনি ব্রিকসসহ কয়েকটি ভাটা এখনো চালু রয়েছে। এক ভাটার মালিক মোহাম্মদ মুনসুর আলী স্বীকার করেন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের চাপ এড়াতে তিনি হাইকোর্টে চার মাসের অনুমতি চেয়ে রিট করেছিলেন এবং আদালত অনুমতি দেওয়ায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন।

নতুন ইটভাটা অনুমোদন দেবে না সরকার, বন্ধ হবে অবৈধ সাড়ে ৩ হাজার

পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্থান
ঢাকা অঞ্চলের পরিবেশ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, অবক্ষয়িত বায়ু অঞ্চল ঘোষণার পর থেকেই সাভারের ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং যেসব ভাটা এখনো চালু রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আবারও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রিটের মাধ্যমে অনুমতি নেওয়া ভাটাগুলোর বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নাগরিক স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি
পরিবেশবিদদের মতে, সাভারে ইট উৎপাদন অব্যাহত থাকা শুধু নিয়মভঙ্গ নয়, এটি ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। বায়ুদূষণের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

সাভারের ইটভাটা চালু থাকায় ঝুঁকিতে ঢাকার বাতাস

০২:২০:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

ঢাকার উত্তরের প্রবেশপথ ও সামগ্রিক বায়ু মান রক্ষার লক্ষ্যে সরকার সাভার উপজেলাকে ‘অবক্ষয়িত বায়ু অঞ্চল’ ঘোষণা করলেও সেখানে ইটভাটার কার্যক্রম থামছে না। প্রকাশ্যেই চলছে ইট পোড়ানো ও উৎপাদন, যা রাজধানীর বায়ুদূষণ আরও ভয়াবহ করে তুলছে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

অবক্ষয়িত বায়ু অঞ্চল ঘোষণার পটভূমি
২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সাভার উপজেলাকে অবক্ষয়িত বায়ু অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী এই ঘোষণার ফলে সাভারে সব ধরনের ইট পোড়ানো ও ইট উৎপাদন কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ ছিল সাভারের ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণার কারণে ঢাকার বায়ু মানের দ্রুত অবনতি, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব।

বাস্তবে নিষেধাজ্ঞার দুর্বল প্রয়োগ
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারি প্রজ্ঞাপনকে অনেক ইটভাটা মালিক কাগুজে নির্দেশ হিসেবেই দেখছেন। গত বছরের শেষ দিকে কয়েকটি ভাটার চিমনি ভেঙে দেওয়া হলেও পরে সেগুলোর বড় অংশ আবার নির্মাণ করে কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

রাজধানীর দূষণ বাড়াচ্ছে সাভার-ধামরাইয়ের ইটভাটা | | বাংলাদেশ প্রতিদিন

সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সাভারে মোট ৮৬টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৫৯টি অনুমোদিত এবং ২৭টি অনুমোদনহীন। আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন তুরাগ নদীর তীরে ইট পোড়ানো এখনো ব্যাপকভাবে চলছে।

আশুলিয়া ও আশপাশের ভাটার চিত্র
আশুলিয়া ব্রিকস ও এমসিবি ব্রিকস নামের ভাটাগুলো চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক পরিদর্শনে দেখা যায়, আশুলিয়া ব্রিকসে শত শত শ্রমিক কাঁচা ইট তৈরি, পরিবহন ও সাজানোর কাজে ব্যস্ত। একই সঙ্গে চুল্লি থেকে পোড়া ইট বের করার কাজও চলছিল।

ভাটার ব্যবস্থাপক ও শ্রমিকদের বক্তব্য
আশুলিয়া ব্রিকসের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মধু মিয়া জানান, সরকার তাদের কাজ করেছে এবং তারা নিজেদের কাজ করছেন। শ্রম ও অন্যান্য খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাটা বন্ধ করলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়া সম্ভব নয় বলেই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তার দাবি, বিষয়টি বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানানো হয়েছে এবং সেখান থেকে আশ্বাসও পেয়েছেন।

এমসিবি ব্রিকসে মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। শ্রমিকরা প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। তবে এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা মৌসুমি চুক্তিতে কাজ করেন। মাঝে মাঝে কর্মকর্তারা এলেও অর্থ লেনদেন হলে তারা ব্যবস্থা না নিয়েই চলে যান, এভাবেই ভাটার কাজ চলতে থাকে।

পরিবেশ দূষণের অন্যতম উৎস ইটভাটা

হাইকোর্টের আদেশের আশ্রয়
সাভারের গেন্ডা ও সাধাপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কিছু ভাটার সামনে বড় সাইনবোর্ড টাঙানো আছে, যেখানে হাইকোর্টের আদেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভাটা মালিকদের দাবি, তারা রিট আবেদন করে আদালত থেকে কার্যক্রম চালানোর অনুমতি পেয়েছেন, যদিও অনেকেরই পরিবেশগত ছাড়পত্র বা বৈধ লাইসেন্স নেই।

আমিনবাজার ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় রনি ব্রিকসসহ কয়েকটি ভাটা এখনো চালু রয়েছে। এক ভাটার মালিক মোহাম্মদ মুনসুর আলী স্বীকার করেন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের চাপ এড়াতে তিনি হাইকোর্টে চার মাসের অনুমতি চেয়ে রিট করেছিলেন এবং আদালত অনুমতি দেওয়ায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন।

নতুন ইটভাটা অনুমোদন দেবে না সরকার, বন্ধ হবে অবৈধ সাড়ে ৩ হাজার

পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্থান
ঢাকা অঞ্চলের পরিবেশ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, অবক্ষয়িত বায়ু অঞ্চল ঘোষণার পর থেকেই সাভারের ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং যেসব ভাটা এখনো চালু রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আবারও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রিটের মাধ্যমে অনুমতি নেওয়া ভাটাগুলোর বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নাগরিক স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি
পরিবেশবিদদের মতে, সাভারে ইট উৎপাদন অব্যাহত থাকা শুধু নিয়মভঙ্গ নয়, এটি ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। বায়ুদূষণের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।