০২:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রিপাবলিকান জিতলে প্রতি আমেরিকানকে নগদ অর্থ দেবেন ট্রাম্প হিমবাহ ধসে নেপালের বন্যা দক্ষিণ এশিয়াকে নতুন সতর্কতা দিল ফিলিপাইনের পালাওয়ানে ফেরিতে আগুনে নিহত ৫ নিখোঁজ ৮৭ বাংলাদেশের খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রাখাইন ভাষা পাঠ্যক্রম চালু তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে নির্ধারণ হবে এজেন্ডা হাসিনার মেয়ে সাইমা ওয়াজেদের হু আঞ্চলিক প্রধান পদত্যাগ বাংলাদেশে হাম মহামারিতে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়াল হাজার সৌদি হামলার পর ইরানকে হুতিদের থামাতে সতর্ক করল পাকিস্তান ট্রাম্পের নতুন বার্তা: মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই শেষ হবে ইরান যুদ্ধ?

২৫ বছর পরও ৯/১১-এর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে আমেরিকা

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার দিন। নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের জোড়া ভবন, প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর ও পেনসিলভানিয়ায় হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। সেই ঘটনার ২৫ বছর পরও এর ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। বরং বহু মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবার ও ভবিষ্যতের ওপর সেই দিনের প্রভাব আজও স্পষ্ট।

হামলার পর উদ্ধার ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে অংশ নেওয়া দেড় লাখের বেশি মানুষ এখনো নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। একই সঙ্গে নিহতদের সন্তানদের অনেকেই তাঁদের বাবা-মায়ের পথ অনুসরণ করে অগ্নিনির্বাপণ, সামরিক, চিকিৎসা কিংবা জনসেবার পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

বাবার স্মৃতি বুকে নিয়ে অগ্নিনির্বাপক ছেলে

স্কট লারসেনের বয়স তখন মাত্র চার বছর। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপে প্রাণ হারান তাঁর বাবা, নিউইয়র্কের একজন অগ্নিনির্বাপক। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৫ বছর।

বাবার মৃত্যুর ২৫ বছর পর সেই ছেলেই বাবার পেশা বেছে নিয়েছেন। স্কট লারসেন যোগ দিয়েছেন নিউইয়র্কের অগ্নিনির্বাপক বাহিনীতে এবং বাবার কর্মস্থল কুইন্সের উডসাইডের একই অগ্নিনির্বাপক কেন্দ্রে দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

সেই কর্মস্থলে বাবার স্মৃতি প্রতিদিনই তাঁকে ঘিরে থাকে। স্মৃতিফলকে খোদাই করা আছে বাবার নাম। অগ্নিনির্বাপক গাড়িতেও রয়েছে তাঁর নাম ও স্মৃতি। কর্মীদের বিশ্রামকক্ষ ও রান্নাঘরে টাঙানো আছে তাঁর ছবি।

লারসেন বলেন, বাবার কথা প্রতিদিনই তাঁর মনে পড়ে। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন তিনি কর্মস্থলে এসে বাবার ছবি বা স্মৃতির দিকে তাকাননি।

20-year-old scars and trauma: Remembering the Bangladeshi-Americans who  died in 9/11 | The Business Standard

লারসেনের ছোট ভাইও একই পথে হাঁটছেন। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার মাত্র দুই দিন পর তাঁর জন্ম হয়েছিল। তিনিও অগ্নিনির্বাপক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং আগামী বছর বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আশা করছেন।

শুধু লারসেন নন, ৯/১১ হামলায় নিহত নিউইয়র্কের অগ্নিনির্বাপকদের ৫৮ সন্তান পরবর্তী সময়ে একই বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের কাছে এটি শুধু একটি চাকরি নয়, বরং বাবা-মায়ের অসমাপ্ত দায়িত্ব ও স্মৃতি ধরে রাখার এক ধরনের প্রতিশ্রুতি।

ধ্বংসস্তূপের নিচে শুরু হয়েছিল আরেক লড়াই

৯/১১-এর দিন ভবন ধসে পড়ার পর উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি। বরং শুরু হয়েছিল আরেক দীর্ঘ লড়াই। নিউইয়র্কের ধ্বংসস্তূপে পুলিশ, অগ্নিনির্বাপক, বিদ্যুৎকর্মী, নির্মাণশ্রমিকসহ হাজারো মানুষ উদ্ধার ও পরিচ্ছন্নতার কাজে নেমেছিলেন।

ধ্বংসস্তূপের বিশাল স্তূপটি প্রায় পাঁচতলা ভবনের সমান উঁচু ছিল। জীবিতদের সন্ধান এবং পরে নিহতদের মরদেহের অংশ খুঁজে বের করার কাজ চলেছিল মাসের পর মাস। বাতাসে তখনও ভাসছিল বিপজ্জনক ধুলা ও বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ।

চিকিৎসক মাইকেল ক্রেন সেই উদ্ধারকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। কর্মীদের ধুলা থেকে রক্ষা করতে মুখোশ ও শ্বাসরোধী সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ধুলার কারণে সেগুলো দ্রুত বন্ধ হয়ে যেত। অনেক কর্মী বাধ্য হয়ে সেগুলো সরিয়ে রাখতেন।

একদিন এক তরুণ গুরুতর কাশি নিয়ে ক্রেনের কাছে আসেন। ধ্বংসস্তূপে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছিল। ক্রেন তাঁকে কয়েক দিন বিশ্রাম নিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

কিন্তু তরুণটি রাজি হননি। কারণ তাঁর পরিবারের একজন সদস্য তখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিলেন।

সেই মুহূর্তটি ক্রেনের কাছে পুরো ঘটনাটির অর্থই বদলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, ৯/১১ শুধু একটি জাতীয় বিপর্যয় ছিল না; অসংখ্য উদ্ধারকর্মীর কাছে এটি ছিল একেবারে ব্যক্তিগত ক্ষতি ও শোকের ঘটনা।

২৫ বছর পরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন উদ্ধারকর্মীরা

৯/১১-সংশ্লিষ্ট রোগে আক্রান্ত উদ্ধারকর্মী ও হামলার এলাকায় বসবাস, কাজ কিংবা পড়াশোনা করা মানুষদের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি বিশেষ স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

গত ৩০ জুন পর্যন্ত ওই কর্মসূচির আওতায় দেড় লাখের বেশি উদ্ধারকর্মী ও বেঁচে যাওয়া মানুষ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এ সময় পর্যন্ত ৯/১১-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার প্রায় ৮৫ হাজার অনুমোদিত নথি তৈরি হয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে বিষাক্ত ধুলা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ বা গিলে ফেলার সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে।

ওই কর্মসূচির আওতায় থাকা ৯ হাজারের বেশি মানুষ ৯/১১-এর পর মারা গেছেন। তবে তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে হামলার সরাসরি সম্পর্ক কতটা ছিল, তা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

Reflecting on the lessons of 9/11, 23 years later

চিকিৎসক ক্রেন এখনো সেই উদ্ধারকর্মীদের কথা মনে করেন গভীর আবেগে। তাঁর ভাষায়, বছরের পর বছর তাঁদের পাশে থাকতে থাকতে তাঁদের সঙ্গে এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও তাঁদের দৃঢ়তা, রসবোধ ও মানসিক শক্তি তাঁকে আজও বিস্মিত করে।

হামলার আগে যে সংকেত বুঝতে পারেননি এক কর্মী

৯/১১-এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরেকটি বেদনাদায়ক গল্প মাইকেল টুহির।

তিনি তখন বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। হামলার দিন যে বিমানে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করা হয়েছিল, সেই বিমানের দুই ছিনতাইকারীকে তিনি মেইন অঙ্গরাজ্যের একটি বিমানবন্দরে যাত্রার আনুষ্ঠানিকতায় সহায়তা করেছিলেন।

মোহাম্মদ আত্তা ও আবদুল আজিজ আল-ওমারি তাঁদের বিমানের উড্ডয়নের মাত্র আধা ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন।

টুহি তাঁদের কাগজের টিকিট পরীক্ষা করেছিলেন। টিকিট কয়েক সপ্তাহ আগে কেনা হয়েছিল এবং মূল্য পরিশোধ করা হয়েছিল ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে। তাঁরা প্রথম শ্রেণির যাত্রী ছিলেন। ফলে তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের আচরণে সন্দেহ করার মতো স্পষ্ট কোনো কারণ তিনি পাননি।

তবুও আত্তাকে দেখে তাঁর মনে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তখনকার নিয়মে কোনো ব্যক্তির চেহারা বা পরিচয়ের ভিত্তিতে সন্দেহ করা আইনগতভাবে সমস্যাজনক ছিল।

পরে ৯/১১ হামলার তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। তৈরি হয় নতুন নিরাপত্তা কাঠামো, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয় এবং একের পর এক নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়।

কিন্তু সেই শরতের ভোরে টুহি জানতেন না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ব বদলে যেতে চলেছে।

9/11 victim identified 25 years later with new forensic technique

এখন ৮০ বছর বয়সী টুহি অবসরে। তিনি বলেন, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি হয়তো তাঁকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু তিনি সেটি অনুসরণ করেননি। আজও তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—সেদিন তিনি ভিন্ন কিছু করলে কি ইতিহাস বদলানো সম্ভব হতো?

তিনি জানেন, নিশ্চিতভাবে এর উত্তর কখনো পাওয়া যাবে না। তবে ২৫ বছর পরও সেই প্রশ্ন তাঁর মনে রয়ে গেছে।

শুধু একটি দিন নয়, একটি দীর্ঘ উত্তরাধিকার

৯/১১ হামলা শুধু প্রায় ৩ হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি; এটি বদলে দিয়েছে অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এসব সংঘাতেও পরবর্তী দুই দশকে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণ গেছে।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি ও যুদ্ধের হিসাবের বাইরে ৯/১১-এর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব দেখা যায় ব্যক্তিগত জীবনে।

কেউ বাবার পেশা বেছে নিয়েছেন, কেউ হারানো স্বজনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন। কেউ দীর্ঘদিন ধরে বিষাক্ত ধুলার কারণে অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছেন। আবার কেউ জীবনের শেষ বয়সেও ভাবছেন—সেদিন যদি একটি সিদ্ধান্ত অন্যরকম হতো, তাহলে কি কিছু বদলানো যেত?

২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তাই ৯/১১ আমেরিকার কাছে শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়। এটি এখনো হাজারো পরিবারের ব্যক্তিগত শোক, লাখো মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং একটি দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিকে বদলে দেওয়া এক দীর্ঘ ছায়া।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

রিপাবলিকান জিতলে প্রতি আমেরিকানকে নগদ অর্থ দেবেন ট্রাম্প

২৫ বছর পরও ৯/১১-এর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে আমেরিকা

১১:২৪:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার দিন। নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের জোড়া ভবন, প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর ও পেনসিলভানিয়ায় হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। সেই ঘটনার ২৫ বছর পরও এর ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। বরং বহু মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবার ও ভবিষ্যতের ওপর সেই দিনের প্রভাব আজও স্পষ্ট।

হামলার পর উদ্ধার ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে অংশ নেওয়া দেড় লাখের বেশি মানুষ এখনো নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। একই সঙ্গে নিহতদের সন্তানদের অনেকেই তাঁদের বাবা-মায়ের পথ অনুসরণ করে অগ্নিনির্বাপণ, সামরিক, চিকিৎসা কিংবা জনসেবার পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

বাবার স্মৃতি বুকে নিয়ে অগ্নিনির্বাপক ছেলে

স্কট লারসেনের বয়স তখন মাত্র চার বছর। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপে প্রাণ হারান তাঁর বাবা, নিউইয়র্কের একজন অগ্নিনির্বাপক। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৫ বছর।

বাবার মৃত্যুর ২৫ বছর পর সেই ছেলেই বাবার পেশা বেছে নিয়েছেন। স্কট লারসেন যোগ দিয়েছেন নিউইয়র্কের অগ্নিনির্বাপক বাহিনীতে এবং বাবার কর্মস্থল কুইন্সের উডসাইডের একই অগ্নিনির্বাপক কেন্দ্রে দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

সেই কর্মস্থলে বাবার স্মৃতি প্রতিদিনই তাঁকে ঘিরে থাকে। স্মৃতিফলকে খোদাই করা আছে বাবার নাম। অগ্নিনির্বাপক গাড়িতেও রয়েছে তাঁর নাম ও স্মৃতি। কর্মীদের বিশ্রামকক্ষ ও রান্নাঘরে টাঙানো আছে তাঁর ছবি।

লারসেন বলেন, বাবার কথা প্রতিদিনই তাঁর মনে পড়ে। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন তিনি কর্মস্থলে এসে বাবার ছবি বা স্মৃতির দিকে তাকাননি।

20-year-old scars and trauma: Remembering the Bangladeshi-Americans who  died in 9/11 | The Business Standard

লারসেনের ছোট ভাইও একই পথে হাঁটছেন। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার মাত্র দুই দিন পর তাঁর জন্ম হয়েছিল। তিনিও অগ্নিনির্বাপক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং আগামী বছর বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আশা করছেন।

শুধু লারসেন নন, ৯/১১ হামলায় নিহত নিউইয়র্কের অগ্নিনির্বাপকদের ৫৮ সন্তান পরবর্তী সময়ে একই বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের কাছে এটি শুধু একটি চাকরি নয়, বরং বাবা-মায়ের অসমাপ্ত দায়িত্ব ও স্মৃতি ধরে রাখার এক ধরনের প্রতিশ্রুতি।

ধ্বংসস্তূপের নিচে শুরু হয়েছিল আরেক লড়াই

৯/১১-এর দিন ভবন ধসে পড়ার পর উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি। বরং শুরু হয়েছিল আরেক দীর্ঘ লড়াই। নিউইয়র্কের ধ্বংসস্তূপে পুলিশ, অগ্নিনির্বাপক, বিদ্যুৎকর্মী, নির্মাণশ্রমিকসহ হাজারো মানুষ উদ্ধার ও পরিচ্ছন্নতার কাজে নেমেছিলেন।

ধ্বংসস্তূপের বিশাল স্তূপটি প্রায় পাঁচতলা ভবনের সমান উঁচু ছিল। জীবিতদের সন্ধান এবং পরে নিহতদের মরদেহের অংশ খুঁজে বের করার কাজ চলেছিল মাসের পর মাস। বাতাসে তখনও ভাসছিল বিপজ্জনক ধুলা ও বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ।

চিকিৎসক মাইকেল ক্রেন সেই উদ্ধারকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। কর্মীদের ধুলা থেকে রক্ষা করতে মুখোশ ও শ্বাসরোধী সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ধুলার কারণে সেগুলো দ্রুত বন্ধ হয়ে যেত। অনেক কর্মী বাধ্য হয়ে সেগুলো সরিয়ে রাখতেন।

একদিন এক তরুণ গুরুতর কাশি নিয়ে ক্রেনের কাছে আসেন। ধ্বংসস্তূপে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছিল। ক্রেন তাঁকে কয়েক দিন বিশ্রাম নিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

কিন্তু তরুণটি রাজি হননি। কারণ তাঁর পরিবারের একজন সদস্য তখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিলেন।

সেই মুহূর্তটি ক্রেনের কাছে পুরো ঘটনাটির অর্থই বদলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, ৯/১১ শুধু একটি জাতীয় বিপর্যয় ছিল না; অসংখ্য উদ্ধারকর্মীর কাছে এটি ছিল একেবারে ব্যক্তিগত ক্ষতি ও শোকের ঘটনা।

২৫ বছর পরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন উদ্ধারকর্মীরা

৯/১১-সংশ্লিষ্ট রোগে আক্রান্ত উদ্ধারকর্মী ও হামলার এলাকায় বসবাস, কাজ কিংবা পড়াশোনা করা মানুষদের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি বিশেষ স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

গত ৩০ জুন পর্যন্ত ওই কর্মসূচির আওতায় দেড় লাখের বেশি উদ্ধারকর্মী ও বেঁচে যাওয়া মানুষ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এ সময় পর্যন্ত ৯/১১-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার প্রায় ৮৫ হাজার অনুমোদিত নথি তৈরি হয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে বিষাক্ত ধুলা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ বা গিলে ফেলার সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে।

ওই কর্মসূচির আওতায় থাকা ৯ হাজারের বেশি মানুষ ৯/১১-এর পর মারা গেছেন। তবে তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে হামলার সরাসরি সম্পর্ক কতটা ছিল, তা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

Reflecting on the lessons of 9/11, 23 years later

চিকিৎসক ক্রেন এখনো সেই উদ্ধারকর্মীদের কথা মনে করেন গভীর আবেগে। তাঁর ভাষায়, বছরের পর বছর তাঁদের পাশে থাকতে থাকতে তাঁদের সঙ্গে এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও তাঁদের দৃঢ়তা, রসবোধ ও মানসিক শক্তি তাঁকে আজও বিস্মিত করে।

হামলার আগে যে সংকেত বুঝতে পারেননি এক কর্মী

৯/১১-এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরেকটি বেদনাদায়ক গল্প মাইকেল টুহির।

তিনি তখন বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। হামলার দিন যে বিমানে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করা হয়েছিল, সেই বিমানের দুই ছিনতাইকারীকে তিনি মেইন অঙ্গরাজ্যের একটি বিমানবন্দরে যাত্রার আনুষ্ঠানিকতায় সহায়তা করেছিলেন।

মোহাম্মদ আত্তা ও আবদুল আজিজ আল-ওমারি তাঁদের বিমানের উড্ডয়নের মাত্র আধা ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন।

টুহি তাঁদের কাগজের টিকিট পরীক্ষা করেছিলেন। টিকিট কয়েক সপ্তাহ আগে কেনা হয়েছিল এবং মূল্য পরিশোধ করা হয়েছিল ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে। তাঁরা প্রথম শ্রেণির যাত্রী ছিলেন। ফলে তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের আচরণে সন্দেহ করার মতো স্পষ্ট কোনো কারণ তিনি পাননি।

তবুও আত্তাকে দেখে তাঁর মনে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তখনকার নিয়মে কোনো ব্যক্তির চেহারা বা পরিচয়ের ভিত্তিতে সন্দেহ করা আইনগতভাবে সমস্যাজনক ছিল।

পরে ৯/১১ হামলার তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। তৈরি হয় নতুন নিরাপত্তা কাঠামো, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয় এবং একের পর এক নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়।

কিন্তু সেই শরতের ভোরে টুহি জানতেন না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ব বদলে যেতে চলেছে।

9/11 victim identified 25 years later with new forensic technique

এখন ৮০ বছর বয়সী টুহি অবসরে। তিনি বলেন, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি হয়তো তাঁকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু তিনি সেটি অনুসরণ করেননি। আজও তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—সেদিন তিনি ভিন্ন কিছু করলে কি ইতিহাস বদলানো সম্ভব হতো?

তিনি জানেন, নিশ্চিতভাবে এর উত্তর কখনো পাওয়া যাবে না। তবে ২৫ বছর পরও সেই প্রশ্ন তাঁর মনে রয়ে গেছে।

শুধু একটি দিন নয়, একটি দীর্ঘ উত্তরাধিকার

৯/১১ হামলা শুধু প্রায় ৩ হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি; এটি বদলে দিয়েছে অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এসব সংঘাতেও পরবর্তী দুই দশকে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণ গেছে।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি ও যুদ্ধের হিসাবের বাইরে ৯/১১-এর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব দেখা যায় ব্যক্তিগত জীবনে।

কেউ বাবার পেশা বেছে নিয়েছেন, কেউ হারানো স্বজনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন। কেউ দীর্ঘদিন ধরে বিষাক্ত ধুলার কারণে অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছেন। আবার কেউ জীবনের শেষ বয়সেও ভাবছেন—সেদিন যদি একটি সিদ্ধান্ত অন্যরকম হতো, তাহলে কি কিছু বদলানো যেত?

২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তাই ৯/১১ আমেরিকার কাছে শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়। এটি এখনো হাজারো পরিবারের ব্যক্তিগত শোক, লাখো মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং একটি দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিকে বদলে দেওয়া এক দীর্ঘ ছায়া।