ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাড়তে থাকা কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে শনিবার তিনবারের আইপিএল চ্যাম্পিয়ন কলকাতা নাইট রাইডার্স তাদের ২০২৬ মৌসুমের দল থেকে বাংলাদেশের ফাস্ট বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দিয়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজিটি জানিয়েছে, ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের নির্দেশেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত মাসে অনুষ্ঠিত খেলোয়াড় নিলামে চেন্নাই সুপার কিংস ও দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গে তীব্র দরকষাকষির পর ৩০ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নিয়েছিল কেকেআর। ওই নিলামে তিনিই ছিলেন একমাত্র বাংলাদেশি খেলোয়াড় যিনি বিক্রি হন।

ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে বোর্ড কলকাতা নাইট রাইডার্সকে তাদের দল থেকে বাংলাদেশের মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তিনি আরও জানান, আইপিএল নিয়ম অনুযায়ী কেকেআর বিকল্প খেলোয়াড় নিতে পারবে।
কয়েক ঘণ্টা পর কেকেআর নিশ্চিত করে যে, মুস্তাফিজুরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আইপিএলের আটটি আসরে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ, মুম্বই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, চেন্নাই সুপার কিংস ও দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে খেলে তিনি ৬৫ ম্যাচে ৬০ উইকেট নিয়েছেন।
ফ্র্যাঞ্চাইজিটি এক বিবৃতিতে জানায়, ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী সব ধরনের প্রক্রিয়া ও আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। আইপিএল বিধি মেনে বোর্ড কেকেআরকে বিকল্প খেলোয়াড় নেওয়ার অনুমতি দেবে এবং পরবর্তী বিস্তারিত পরে জানানো হবে। মুস্তাফিজুরকে ছেড়ে দেওয়ার ফলে আইপিএল ২০২৬ আসরে কোনো বাংলাদেশি খেলোয়াড় থাকছেন না।

এদিকে সিলেটে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল শনিবার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বোঝার জন্য একটি জরুরি বৈঠক ডাকেন। সংবাদটি প্রকাশের সময় বৈঠক চলছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে লাগাতার শত্রুতার অভিযোগ তুলেছে, অন্যদিকে ঢাকা অভিযোগ করেছে, নয়াদিল্লি একটি ভুয়া বর্ণনা ছড়াচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে কট্টর ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যার প্রতিবাদে হওয়া বিক্ষোভে ভারতবিরোধী সুর জোরালো হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। এতে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। দুই দেশই একে অপরের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই কেকেআরে বাংলাদেশি খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিয়ে কিছু মহল থেকে শাহরুখ খানের বিরুদ্ধে সমালোচনা ওঠে। সমালোচকদের একাংশ দাবি করে, তিনি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করেছেন।

মুস্তাফিজুরকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী ও বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা নরেন্দ্র কশ্যপ বলেন, ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড দেশের মানুষের অনুভূতি বুঝেছে এবং বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে সরিয়ে দিয়েছে।
তবে কংগ্রেস নেতা শশী থারুর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, যদি সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি খেলোয়াড় লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতেন, তাহলে কী হতো? এখানে আমরা কাকে শাস্তি দিচ্ছি—একটি দেশ, একজন ব্যক্তি নাকি তার ধর্মকে? খেলাধুলাকে এভাবে রাজনীতিকরণ করলে পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
বছরের পর বছর ধরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব আইপিএলে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ২০০৮ সালের মুম্বই হামলার পর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়। এদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড শুক্রবার জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরে তিন ম্যাচের একদিনের সিরিজ ও একটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে ভারতকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড দলকে বাংলাদেশ সফরের অনুমতি দেবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পিটিআইয়ের তথ্য সহায়তায় প্রস্তুত
সমশুভ্র লাহা 



















