বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এটি আর শুধু উদ্ভাবনের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, প্রভাব ও ভবিষ্যৎ অবস্থানের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করলেও, চীন বহু আগেই প্রযুক্তিকে জাতীয় শক্তির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে।
চীনের এক শীর্ষ গবেষকের মন্তব্য—যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাকে উদ্ভাবনের পরিবর্তে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে—শুনতে সমালোচনার মতো মনে হলেও, এতে একটি বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। কারণ, এই দৃষ্টিভঙ্গি চীনের কাছে নতুন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরেই তারা প্রযুক্তিকে সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রিক শক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাম্প্রতিক নীতিতে স্পষ্ট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে আগে যেখানে নৈতিকতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা ছিল, এখন সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে সরকার ও প্রযুক্তি খাতের সম্পর্কেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন শুধু বাজারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়; তারা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের কৌশলগত কাঠামোর অংশ হয়ে উঠছে। এর ফলে তারা উন্নত প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পাচ্ছে—কে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে এবং কোন শর্তে তা নির্ধারণ করার দায়িত্বও তাদের ওপর পড়ছে। এতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সংকুচিত হচ্ছে এবং নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য প্রবেশের পথ কঠিন হয়ে উঠছে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর আরও গভীর। প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে গেলে তাদের কৌশলগত বিকল্পও সংকুচিত হবে। একই সঙ্গে তারা বাধ্য হবে নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে, যা তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
চীনের ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে তারা প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগোতে পারে মূলত অনৈতিক উপায়ে। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিবিদ, প্রোগ্রামার ও কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের অবস্থান প্রমাণ করেছে। পশ্চিমা বাজারে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং তাদের অধিগ্রহণের ঘটনাও সেই সক্ষমতার প্রমাণ বহন করে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই প্রায় একই ধরনের নীতি অনুসরণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন কৌশলগত প্রযুক্তিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে, তেমনি চীনও বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি প্রবাহের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। এমনকি বিদেশি আইনের প্রয়োগ প্রতিরোধে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এখন আর একক কোনো খাতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশ্ব ক্রমেই একটি বিভক্ত প্রযুক্তি ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে প্রতিটি দেশ নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত, এই প্রতিযোগিতার ফলাফল নির্ভর করবে কে কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে নিজের কৌশলকে বাস্তবায়ন করতে পারে তার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রযুক্তি এখন আর শুধু অগ্রগতির প্রতীক নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের অন্যতম প্রধান উপাদান।
ব্র্যাড গ্লোসারম্যান 


















