গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মাধ্যমে শেখ হাসিনার একান্ত প্রচেষ্টায় তৈরি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে অনেক পজিটিভ পোস্ট দেখা যাচ্ছে। যারা শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলে তারা নিশ্চুপ আছে। কারণ বর্তমান পৃথিবীর জ্বালানি বাস্তবতায় তাদের নিশ্চুপ থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। তাছাড়া তাদের নিশ্চুপতার আরও একটি কারণ, মুহাম্মদ ইউনূস অবৈধ পথে ক্ষমতা দখল করার পরে এই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে একটি মিডিয়া ট্রায়াল দেবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে সেটা নাকচ করে দেবার পরে ইউনূস গং থেমে যায়।
এমনকি এখন অনেকে নানান প্রচার মাধ্যমে বলছেন, শেখ হাসিনার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা ছিল, তিনি বাংলাদেশকে একটি সাসটেইনেবল বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পথে নিয়ে গেছেন। এমনকি অনেকে এখন বুঝতে পারছেন, শেখ হাসিনা শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না, তিনি প্রকৃত অর্থে যাকে ক্রাইসিস ম্যানেজার বলে সেটাই ছিলেন।
আসলে এটা সত্য যে পৃথিবীতে প্রতি মাসে বা প্রতি বছরে কেউ না কেউ রাষ্ট্রনায়ক হন, এবং তিনি অবশ্যই রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু এর পাশাপাশি এও সত্য, সব রাষ্ট্রনায়ক ক্রাইসিস ম্যানেজার নন। কেউ কেউ মাত্র ক্রাইসিস ম্যানেজার। এর পাশাপাশি এটাও সাধারণ মানুষ বা অধিকাংশ মানুষ বোঝার সুযোগ পান না—একজন ক্রাইসিস ম্যানেজার দেশকে কী দিয়ে যান। বরং নানান ষড়যন্ত্রের ফলে তাকে দুর্নাম যেমন কুড়াতে হয়, তেমনি নানান বাধার মধ্যে পড়তে হয়।

তবে তারপরেও ক্রাইসিস ম্যানেজারকে ইতিহাস তার সঠিক অবস্থানই দেয়। যেমন আমেরিকার মহামন্দার সময় রুজভেল্ট তার যুগান্তকারী অর্থনৈতিক নীতি “নিউ ডিল” এর মাধ্যমে আমেরিকার অর্থনীতি রক্ষা করেছিলেন, পৃথিবীকেও পথ দেখিয়েছিলেন। ইতিহাস তাঁকে রাষ্ট্রনায়ক শুধু নয়, তার সঙ্গে ক্রাইসিস ম্যানেজার বলুক আর অন্য কোন সম্মানের অভিধায় ডাকুক—তাকে মনে রাখবেই।
তেমনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের জয়ের মূল নায়ক চার্চিল। ওই যুগান্তকারী যুদ্ধ বিজয়ের পরেও যুদ্ধোত্তর নির্বাচনে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। দেশের সাধারণ মানুষ তাঁর অবদানের মূল্য দেয়নি ভোটের মাধ্যমে। তারপরেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত গ্রেট ব্রিটেনকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী করা ও ব্রিটেনের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখলে ক্রাইসিস ম্যানেজার কেমন এবং তাকে কী করতে হয় পৃথিবীতে তার এক আইকনিক উদাহরণ চার্চিল।
ঠিক তেমনি ১৯৭১ সালের দরিদ্র ভারতের ওপর এক কোটি শরণার্থীর চাপ সহ্য করে মাত্র পাঁচ মাসের খাদ্য সম্বল সঙ্গে নিয়ে একদিকে আমেরিকার জনগণ ও সিনেটকে সঙ্গে রেখে- অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পাশে রেখে মাত্র নয় মাসের ঝড়ো অথচ শান্ত কূটনীতি ও সাড়ে বারো দিনের যুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাজিত করে বাংলাদেশ সৃষ্টির মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী প্রমাণ করেছিলেন, ক্রাইসিস ম্যানেজারের প্রতিমূর্তি কী।

বাংলাদেশে ২০০৯ সালে ২৪’শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হাতে নিয়ে মাত্র সাড়ে পনেরো বছরে দেশকে অনেক ক্ষেত্রে সাসটেইনেবল বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠার দ্বারগোড়ায় শেখ হাসিনা যেভাবে পৌঁছে দিয়েছিলেন, যার প্রমাণ আজ একের পর এক মিলছে—তাতে ইতিহাস তাকে শুধু স্টেটসম্যান নয়, একজন ক্রাইসিস ম্যানেজারের সম্মানে বসালেও মব সন্ত্রাসী ও মেটিকুলাস ডিজাইনে করা আরবান গেরিলা ওয়ার ফেরার ওয়ালাদের খুব কিছু বলার তথ্য হাতে নেই।
যেমন শেখ হাসিনা তখন ১৫ কোটির ওপরে জনসংখ্যার একটি দেশে মাত্র ২৪’শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তার আগের সাত বছর যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা কোন বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারেননি। এ সময়ে শেখ হাসিনার সেই বহু নিন্দিত কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের পথে যাওয়া ছাড়া দেশের কোন বিকল্প ছিল না। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে গিয়ে কয়েকজন মালিক সফল হননি ঠিকই। তারা ব্যাংক ডিফল্টার। কিন্তু সরকার বছরে সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছিলো ঠিকই কিন্তু তিন বছর কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ তৈরির ফলে শিল্প ও কৃষি থেকে দেশের মোট উৎপাদনে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি যোগ হয়েছিল। আজ যারা পার্লামেন্টে আছেন, তারা ওই সময়ের বাজেটেরই সাপ্লিমেন্টারি অংশ হিসেবে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান দিয়ে তৈরি গবেষণা পেপার থেকে তথ্য ও উপাত্তসহ সেটা জানতে পারবেন।
আর নির্বাচনের পরে ক্ষমতায় বসে কিছুদিনের মধ্যেই শেখ হাসিনা রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির কাজে হাত দেন। যেহেতু কেন্দ্রটির মূল অর্থদাতা ভারত ছিল, তাই এটার বিরোধিতায় একটা সোনায় সোহাগা যোগ হয়। একদিকে ভারতবিরোধী সুড়সুড়ি, অন্যদিকে তারা সামনে আনে পরিবেশের ক্ষতি। অর্থাৎ দেশের বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ক্ষতি। এমনকি একজন বিজ্ঞ বিচারপতিও এই আন্দোলনকারীদের অনেকটা পক্ষে একটা অবজারভেশন দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে একটি ব্যক্তিগত আলোচনায় তাঁর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করি খুলনার ফয়লাতে যেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে সেখান থেকে সুন্দরবন কত দূর তিনি কি জানেন? তিনি সৎ মানুষ অকপটে বলেছিলেন, তিনি কখনও সুন্দরবন যাননি। আমি জানতে চেয়েছিলাম তিনি তো জার্মানিতে গেছেন বহুবার, তিনি কি দেখেছেন, কোন প্রযুক্তিতে এখন কয়লা বিদ্যুৎ তৈরি হয়। যে বাতাসটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসে সেটা যে সম্পূর্ণ কার্বনমুক্ত তা নিশ্চয়ই তিনি জানেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি বিজ্ঞানের ছাত্র নন, এ বিষয়ে তাঁর ধারণা নেই।

তখন তাকে বলেছিলাম, আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭৫ এর পনেরো আগস্টে নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে আপনার অনুভূতি কী হয়েছিল? বলেছিলেন, তিনি তখন বিদেশে ছিলেন, তারপরেও দুই দিন বাস্তবে তিনি কিছু খেতে পারেননি। তিনি এতটাই মর্মাহত হন। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আপনি নিশ্চয়ই স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন, স্থপতি মাযহারুল ইসলাম, সম্পাদক নুরুল ইসলাম ভান্ডারিকে চেনেন। রবিউল হুসাইন তখনও বেঁচে ছিলেন। এদের কাছে শুনলে আপনি জানতে পারতেন, তেল গ্যাস আন্দোলনের নেতা ওই ব্রিলিয়ান্ট স্থপতি বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পরে মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন।
তাছাড়া পত্রিকার দায়িত্বে থাকা একজন হিসেবে দেখেছি, এই তেল, গ্যাস ও বন্দর রক্ষা করা কমিটির আন্দোলনের রিপোর্ট করার জন্য অফিসেও কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল বামধারার রিপোর্টার খুব বেশি আগ্রহী ছিল। আগ্রহগুলো সন্দেহের উদ্রেক ঘটাত। এবং এদের অনেককে শেয়ার কেলেঙ্কারির যে রিপোর্ট তৈরি হয় তা ঘিরে যে কেলেঙ্কারি জড়িত, যেখানে শেখ হাসিনার নিযুক্ত যে গভর্নরও জড়িত (ভবিষ্যতে অনেকেই সেটা জানতে পারবে) তাদের সঙ্গে ওই সব রিপোর্টাররা বেশ তৎপর ছিল। তারা ব্যবহৃত হয়েছিল কিনা সেটা বলতে পারব না। ব্যবহৃত হবার সম্ভাবনা বেশি। কারণ, তখন তাদের বয়স অনেক কম ছিল।
যাহোক, এসব এখন অতীত। মব ভায়োলেন্সের জনক ও তাঁর ভায়োলেন্সের কুশীলবদের আখ্যায়িত “ফ্যাসিস্ট” শেখ হাসিনাকে এখন রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম আপলোডের পরে ক্রাইসিস ম্যানেজার ও দূরদর্শী বলছে সামাজিক মাধ্যমে, এমনকি অনেক তরুণ সাংবাদিকও। বিপরীতে অন্যরা চুপ।
যদিও এই লেখায় লেখার ইচ্ছে নেই। তবে একটু বলা যায়—দেশের মানুষ আজ না হোক কাল ভাববে, একজন ফ্যাসিস্ট কীভাবে জনঘনত্বপূর্ণ দেশে কোভিড-১৯ ম্যানেজমেন্ট করেছিল—যেখানে টিকা উৎপাদনকারী, অক্সিজেন সিলিন্ডার রফতানিকারক দেশ ভারতের গঙ্গার চরে ডেড বডির মিছিলের রিপোর্ট নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, রয়টার্সের মাধ্যমে গোটা পৃথিবী জেনেছে। অথচ টিকা ও অক্সিজেন সিলিন্ডার আমদানিকারক দেশ বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত কোভিড ম্যানেজমেন্টে সফল বলতে বাধ্য হয় বিশ্ব সংস্থাগুলো।

আর ভারত তাদের দেশের সংকটের কারণে চুক্তি অনুযায়ী টিকা সরবরাহ না করতে পারলেও শেখ হাসিনা যথাসময়ে অন্য দেশ থেকে টিকা আনতে সমর্থ হয়েছিলেন।
এ লেখার দৈর্ঘ্য আর বাড়াতে চাই না। কেবল একটি প্রশ্ন এ মুহূর্তে মনে আসছে, গত দেড় মাস ঢাকার রাজপথে যেভাবে গাড়ি ও বাস কম জ্বালানি সংকটের কারণে, আর মেট্রোতে মানুষের ভিড়ে ঠাসা—এ নিয়ে কি কারও কিছু বলার আছে?
সর্বশেষ বলি, বাঙালির অতীতে খুব বড় কিছু নেই—ডেপুটি বাবু, দারোগা সাহেব, কেরানি, ছোট দোকানদার, কৃষক আর নৌকার মাঝি—এই মোটামুটি বাঙালির অতীত। তাই মেগা প্রজেক্ট নিয়ে যে যা বলেছে, বাঙালি সেটা খেয়েছে। কারণ, ধন ও ধনীর প্রতি এ ধরনের জাতির একটা আক্রোশ থাকে। তবে মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল—রাষ্ট্র সম্পর্কে অশিক্ষিত এনজিও করে খাওয়া লোক ও মাস্টাররা যদি দুই বছর দেশটাকে তছনছ না করত—তাহলে আজ এ জ্বালানি সংকটের সময় এশিয়ায় জাপান, চায়নার পরেই হয়তো বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে থাকত। বর্তমানে যে সরকারই থাকুক না কেন তাকে এ সংকটে পড়তে হতো না, কেবল একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ক্রাইসিস ম্যানেজার থাকলেই হতো।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 



















